রাজস্ব ফাঁকি দিতে অনেকে রিটার্নে মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকে। তাই রিটার্নের তথ্য দেখে করদাতার আয়-ব্যয়ের বা সম্পদের প্রকৃত হিসাব পাওয়া যায় না। এ দেশে রিটার্নে দেওয়া তথ্য অনুসারে কোটিপতির সংখ্যা ২০ হাজারেরও কম। অথচ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে দেশে কোটিপতির সংখ্যা এর চেয়ে অনেকগুণ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে কোটিপতি হিসাবধারীর সংখ্যা এক লাখের কাছাকাছি।
এনবিআরের কার্যক্রম সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় না আসায় এবং লোকবলের স্বল্পতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে অনেক সময় রাজস্ব-ফাঁকিবাজদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।
রিটার্নের তথ্য : ১৬ কোটি মানুষের এ দেশে ৮২ লাখের বেশি কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিয়েছে ২২ লাখ, এর আগের করবর্ষে দিয়েছিল ১৫.৫ লাখ। প্রতি করবর্ষে নিয়মিত সময়ের মধ্যে গড়ে ২০ লাখ করদাতা রিটার্ন দাখিল করে। প্রতি বছরই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রিটার্ন জমার সময় দুই-এক মাস বাড়ানো হলে রিটার্ন জমার সংখ্যাও কিছু বাড়ে।
এনবিআরের সদস্য (আয়কর নীতি) সামস উদ্দিন আহমেদ বলেন, চলতি করবর্ষে এক মাস সময় বাড়ানোয় রিটার্ন জমার সংখ্যা বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।
গত ১১ করবর্ষে (২০১১-২২) নিয়মিত সময়ে এনবিআরে জমা দেওয়া রিটার্নের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা যায়, প্রতি করবর্ষে ২ কোটি টাকা ও তার বেশি সম্পদের মালিক সংখ্যা এলাকা ও পেশাভেদে প্রায় একই থাকে। ২ কোটি টাকা ও তার বেশি সম্পদের মালিকদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকায় এবং সবচেয়ে কম রংপুরে। ঢাকার পরে চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ। এ পরিমাণ সম্পদের মালিকদের মধ্যে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ী। রাজধানীতে দুই কোটি টাকা ও তার বেশি সম্পদের মালিকরা সবচেয়ে বেশিসংখ্যায় থাকে ধানম-ি, গুলশান, উত্তরা, জিগাতলা, কলাবাগান ও পান্থপথ এলাকায়।
২০১১ সালের সম্পদবিবরণী অনুযায়ী ২ কোটি টাকা ও তার বেশি সম্পদ আছে এমন করদাতার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৩০৩, ২০১২ সালে ৪ হাজার ৮৬৫, ২০১৩ সালে ৫ হাজার ১৪৫, ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর পর্যন্ত ৫ হাজার ৩২৯ ও ২০১৫ সালের ২ নভেম্বর পর্যন্ত ৬ হাজার ৭৬১ জন ছিল। ২০২০ করবর্ষে এ সংখ্যা বেড়ে ১৪ হাজারের কিছু বেশি হয়। গত এবং চলতি করবর্ষে রিটার্নের তথ্যানুসারে এ সংখ্যা আরও বেড়েছে। তবে ২৫ হাজারের কম।
কোটিপতির ব্যাংক হিসাব : রিটার্ন থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলছে না বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য। ২০২২ সালের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বলা যায়, ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতকারীর সংখ্যা ১২ কোটি ৯৫ লাখ ১৪ হাজার ৫১৩। ব্যাংকগুলোতে এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ১ লাখ ৮ হাজার ৪৫৭। তিন মাস আগে ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৫৯৭। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসেই দেশে কোটিপতি বেড়েছে ৪ হাজার ৮৬০ জন।
২০২২ সালের জুন পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, ১ কোটি ১ টাকা থেকে ৫ কোটি টাকার আমানতকারীর সংখ্যা ৮৫ হাজার ৮৪১। যাদের অ্যাকাউন্টে জমা টাকার পরিমাণ ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। ৫ কোটি থেকে ১০ কোটির মধ্যে রয়েছে ১১ হাজার ৮৬৫টি হিসাব। তাদের অ্যাকাউন্টে টাকার পরিমাণ ৮৪ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া ১০ কোটি ১ টাকা থেকে ১৫ কোটির টাকার হিসাব রয়েছে ৩ হাজার ৭৬৩টি, ১৫ কোটি ১ টাকা থেকে ২০ কোটির মধ্যে ১ হাজার ৭১৯টি, ২০ কোটি ১ টাকা থেকে ২৫ কোটির মধ্যে ১ হাজার ১৫১টি, ২৫ কোটি ১ টাকা থেকে ৩০ কোটির মধ্যে হিসাব রয়েছে ৮৮৩ জনের, ৩০ কোটি ১ টাকা থেকে ৩৫ কোটি টাকার মধ্যে ৫০২টি এবং ৩৫ কোটি ১ টাকা থেকে ৪০ কোটির মধ্যে রয়েছে ৩০৭ আমানতকারীর হিসাব। ৪০ কোটি ১ টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট সংখ্যা ৬২১। আলোচিত সময়ে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা হিসাবের সংখ্যা ১ হাজার ৮০৫।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি ব্যাংক হিসাব ছিল মাত্র পাঁচটি। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭-এ। জিয়াউর রহমান সরকারের আমলে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৮-এ। এরশাদ সরকারের পতনের সময় ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতির সংখ্যা ছিল ৯৪৩। ১৯৯৬ সালের জুনে কোটিপতি ব্যাংক হিসাব বেড়ে হয় ২ হাজার ৫৯৪টি। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ১৬২-তে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতি ব্যাংক হিসাব সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৮৮৭-তে। ২০০৮ সালে হয় ১৯ হাজার ১৬৩টি। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ১৩০-এ। ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বরে কোটিপতি হিসাব সংখ্যা হয় ২৯ হাজার ৫৩৭। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে হয়েছে ৯৩ হাজার ৮৯০টি। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ ১ হাজার ৯৭৬-এ পৌঁছায়।
সার চার্জ : বেশি সম্পদ থাকার কারণে নিয়মিত করের সঙ্গে ‘সার চার্জ’ নামে অতিরিক্ত কর আদায় করা হয়। এখানেও সম্পদশালীরা সম্পদের পরিমাণ কম দেখিয়ে বা গোপন করে সার চার্জ পরিশোধে ফাঁকি দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এনবিআর সূত্র জানায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২ কোটি টাকা বা বেশি সম্পদের মালিক এমন ১০ হাজার ১৫২ জনের কাছ থেকে সরকার ২০৮ কোটি টাকা সারচার্জ পেয়েছে। আগের অর্থবছরে এ খাতে আদায় ছিল আরও কম ১০১ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে কিছু বাড়ে; প্রায় ১২ হাজার জনের কাছ থেকে আদায় হয় ২৫৪ কোটি টাকা।
রিহ্যাবের হিসাবে : রাজধানীর অভিজাত এলাকায় গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানমন্ডি, উত্তরা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, সেগুনবাগিচায় প্রতি বর্গফুট বিক্রি হয় ১০ হাজার থেকে ২০-২২ হাজার টাকায় এবং এসব এলাকার বাইরে ৪ থেকে ৮ হাজার টাকায়। এ হিসাবে ১৫০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের দাম অভিজাত এলাকাতে ১ কোটি টাকার বেশি হয়। আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাবের তথ্যানুসারে, এরই মধ্যে বেসরকারি খাতের তৈরি ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে। ২০১৩ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বাড়ির মালিকদের ওপর এনবিআর এক জরিপ চালায়। দেখা যায়, এ দুই শহরে ১ লাখ ৪ হাজার বাড়ির মালিক কর দেন না এবং ৭০ হাজারের বেশি বাড়ির মালিক ইটিএন গ্রহণই করেননি।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজস্ব-ফাঁকিবাজরা রিটার্নে বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মূল্য অধিকাংশ সময় কম দেখিয়ে থাকে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন, নজিবুর রহমান, মোশার্রফ হোসেনসহ বর্তমান চেয়ারম্যানও বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে নিয়মিত এবং হিসাবমতো কর আদায়ে উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে লোকবলের অভাবে তা শেষ পর্যন্ত কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ, লেক্সাসের মতো বিলাসবহুল গাড়ি আছে ৬০ হাজারের বেশি। মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িই আছে প্রায় ২৯ হাজার। বারভিডার (বাংলাদেশ রিকন্ডিশনড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন) তথ্যানুসারে, আমদানি শুল্কসহ এসব গাড়ির মূল্য ১ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা বা তার বেশি।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি হাবিবুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মিথ্যা ঘোষণায় বিলাসবহুল গাড়ি এনে বিক্রি করছেন। এসব গাড়ি জাল কাগজপত্রে চলছে। এসব গাড়ির তথ্য রিটার্নে উল্লেখ থাকে না। শুল্ককর হিসাবে এক টাকাও সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না। অনেক পরিবারে কোটি টাকা দামের একাধিক গাড়ি থাকলেও রিটার্নে উল্লেখ করা হয় না। এনবিআর আগের চেয়ে এখন ভালোভাবে কাজ করছে। দুই বছর ধরে এনবিআর জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে চলা শতাধিক বিলাসবহুল গাড়ি আটক করেছে।
আইনে ফাঁক : অনেকে জমি নিবন্ধনের সময়ে প্রকৃত দাম উল্লেখ না করে মৌজাভিত্তিক দাম উল্লেখ করেন, যা প্রকৃত দামের চেয়ে অনেক কম। এ দামই রিটার্নে উল্লেখ করে রাজস্ব কম পরিশোধ করে। জমির দাম প্রতি বছর বাড়লেও নিবন্ধনের সময়ে যে দাম উল্লেখ করা হয় তাই রিটার্নে উল্লেখ করেন জমির মালিক।
এনবিআরের উদ্যোগ : প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে এনবিআর কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, অনলাইনে ইটিআইএন গ্রহণ, অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল, ই-ফাইলিং, অটোমেশনের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত কার্যক্রম, অনলাইনে ভ্যাট বা মূসক আদায়সহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। উপজেলা পর্যায়ের সম্পদশালীদের খুঁজে বের করতেও এনবিআর কাজ করছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেছেন, পর্যাপ্ত জনবল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকায় বর্তমান অডিট প্রক্রিয়ার আওতায় দেশের সব করদাতাকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।