আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় ত্রিবার্ষিক সম্মেলনের বাকি মাত্র দুদিন। ২৪ ডিসেম্বর দলের সবচেয়ে বড় আয়োজন বর্ণাঢ্য করে তুলতে বিভিন্ন কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে। কিন্তু পদপ্রত্যাশী নেতা ও কর্মী সবার ভেতরে উৎসাহ-উদ্দীপনার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। সম্মেলন ঘিরে বাড়তি আনন্দ-উৎসবের দেখা মিলছে না। কেন্দ্রীয় কমিটির কেউ আছেন বাদ পড়ার শঙ্কায়, অন্যরা পদন্নোতির প্রত্যাশায় ও নতুনরা কমিটিতে জায়গা পাওয়ার আশায় ঘোরাঘুরি করছেন দলীয় কার্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায়। অবশ্য সব থেকে বেশি আলোচনা হচ্ছে সাধারণ সম্পাদক পদে কে আসছেন। প্রকাশ্যে কেউ আগ্রহ না দেখালেও মনে মনে অনেকেই এই পদটি প্রত্যাশা করছেন।
আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সভাপতি শেখ হাসিনার বাইরে শীর্ষ এ পদে অন্য কাউকেই ভাবতে পারেন না দলের কোনো নেতাকর্মীই। শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের কাছে সব সম্মেলনেই থাকেন বিকল্পহীন। আওয়ামী লীগ সভাপতির পদ থেকে শেখ হাসিনা সরে যেতে অসংখ্যবার ইচ্ছা পোষণ করলেও কাউন্সিল তাকে ছাড়ে না। দলটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ সাধারণ সম্পাদক নিয়ে চলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। এই পদে কে আসছেন সেটা জানার কৌতূহল থাকে সবার। এবারও এই কৌতূহলের কমতি নেই। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করে কেউ বলছে না অমুক চূড়ান্ত। সবার মুখেমুখে ঘুরছে যে, ওবায়দুল কাদের তৃতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন।
দলীয় কার্যালয়ে ভিড় আছে, প্রস্তুতি কমিটির মিটিংও চলছে নিয়মিত, শুধুমাত্র ঘাটতি আছে স্বতঃস্ফূর্ততার। ‘প্রেশার গ্রুপের’ বাসা ও ব্যক্তিগত অফিসেও ভিড় আছে। ওই গ্রুপের প্রাধান্যও আছে পদপ্রত্যাশী সবার কাছে। তাদের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়ে কেউ বাদ পড়া ঠেকাতে চান, কেউ পদোন্নতি আর অন্যরা চান কেন্দ্রীয় কমিটিতে যুক্ত হতে।
প্রতিবারের মতো এবারও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থীর ছড়াছড়ি। বলা যায়, মনে মনে সবাই প্রার্থী। ব্যক্তিগত যোগ্যতা-অযোগ্যতা হিসাব না করে প্রার্থী হতে চান। কিন্তু প্রকাশ্যে আসছেন না, ঘোষণা দেওয়ার সাহসও দেখাচ্ছেন না। গত ৭ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সফরের সময় বিভিন্ন পদে থাকা ৭-৮ জন কেন্দ্রীয় নেতার নিজেদের মধ্যে আলোচনা থেকে বোঝা গেছে শেখ হাসিনা বানালে সাধারণ সম্পাদক হতে চান তারা।
প্রকাশ্যে বলতে না পারার কারণ সম্পর্কে একাধিক প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রার্থী হিসেবে প্রকাশ্যে এসে কেউ কারও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে চান না। যেহেতু এই পদের যোগ্যতা বিবেচনা করার একমাত্র ক্ষমতা শেখ হাসিনার। সেখানে প্রকাশ্যে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীর ঘোষণা না এলেও চলে।
কেন্দ্রীয় ওই নেতারা আরও বলেন, ‘আমি চাইলাম আর সাধারণ সম্পাদক হয়ে গেলাম ব্যাপারটি তাও নয়, এখানে বিভিন্ন কানেকশন কাজ করে। নেত্রীর (শেখ হাসিনা) বিবেচনাই শেষ কথা। তাই সবগুলো কানেকশন সক্রিয় হয়ে শেখ হাসিনার কাছে বিভিন্ন কায়দায় রাজি করানো হয়। ফলে প্রকাশ্যে ঘোষণা, যোগ্যতা-দক্ষতা এগুলোর ওপর খুব নির্ভর করে না।’
এদিকে প্রকাশ্যে ঘোষণা নেই তবুও বানালে ‘আমি সাধারণ সম্পাদক হব’ এ রকম সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী দুই ডজনের মতো। কিন্তু আলোচনায় হাতেগোনা কয়েকজন। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ এগিয়ে আছেন। আছেন ড. আবদুর রাজ্জাক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে চার বারের মাহাবুবউল আলম হানিফকে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী মনে করছেন। আলোচনায় আছে হাছান মাহমুদের নামও। এছাড়া তৃতীয় বারের মতো ওবায়দুল কাদেরই আসছেন সাধারণ সম্পাদক পদে এমন আলোচনাই বেশি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কোনো কথা বলতে রাজি হননি সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী। তিনি শুধু বলেছেন, কাউন্সিল অধিবেশন ঠিক করবে কে হচ্ছেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদের অধিকারী।
মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই এখতিয়ার কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। হানিফ বলেন, এ পদে নেত্রীই সিদ্ধান্ত নেবেন।
আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলনে দলটির সব সাংগঠনিক জেলা-মহানগর শাখার কাউন্সিলর ও ডেলিগেট কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে। গতকাল বুধবার সকাল ১১টা আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানম-ির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ কার্ড বিতরণ শুরু হয়।
কাউন্সিলর ও ডেলিগেট কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের সূচনা করেন মাহবুবউল আলম হানিফ, আ ফ ম বাহউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম ও এস এম কামাল হোসেনসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। এ সময় ঢাকা মহানগরসহ অন্যান্য মহানগর ও বিভিন্ন জেলার বিপুল সংখ্যক নেতা উপস্থিত ছিলেন।
দলীয় সূত্রমতে, আওয়ামী লীগের এবারের জাতীয় সম্মেলনে সারা দেশ থেকে প্রায় ৭ হাজার কাউন্সিলর অংশ নেবেন। সম্মেলনে ডেলিগেটের সংখ্যা লক্ষাধিক হতে পারে। জেলা/মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক অথবা তাদের যৌথ স্বাক্ষরের চিঠিসহ মনোনীতরা কাউন্সিলর ও ডেলিগেট কার্ড সংগ্রহ করছেন।
গত মঙ্গলবার সম্মেলন উপলক্ষে গঠিত মঞ্চ সাজসজ্জা উপকমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সারা দেশ থেকে কাউন্সিলররা এসে উপস্থিত হবেন, সেই সংখ্যাটা প্রায় ৭ হাজার। এবারের সম্মেলনে নেতাকর্মী ও অতিথি মিলিয়ে লক্ষাধিক লোক অংশগ্রহণ করবেন। তবে কোনো বিদেশি অতিথি এবার থাকছেন না বলে আওয়ামী লীগ সূত্রে জানিয়েছে।
আগামী শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘উন্নয়ন অভিযাত্রায় দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশ প্রত্যয়’।
প্রতিবার দুদিনব্যাপী সম্মেলন হলেও এবার কৃচ্ছ্র সাধনের জন্য একদিনে সম্পন্ন হবে। প্রথম অধিবেশনের পরে খাবার ও নামাজের বিরতি হবে। তারপরেই মূল অধিবেশন, কাউন্সিল অধিবেশন হবে। সম্মেলনের মঞ্চের দৈর্ঘ ৮০ ফুট, প্রস্থ ৪৪ ফুট। সম্মেলনে প্রবেশের জন্য ৫টি গেট থাকবে। এরমধ্যে একটি ভিআইপি গেট, বাকি ৪টি কাউন্সিলরদের প্রবেশের জন্য। সকাল ৭টা থেকে কাউন্সিলর-ডেলিগেট প্রবেশের গেট খুলে দেওয়া হবে। আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নৌকা ও পদ্মা সেতুর আদলে তৈরি হচ্ছে সম্মেলনের মঞ্চ। এর মধ্যে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও অগ্রগতির চিত্র থাকবে। পেছনে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি থাকবে। সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের ছবিও থাকবে। জাতীয় চার নেতার ছবি থাকবে। সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শামসুল হক এবং মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের ছবি থাকবে।
