আর্সেনিক এলাকায় শিশুদেহে উচ্চমাত্রায় ডায়রিয়ার জীবাণু

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২২, ০৫:৫৭ এএম

বাংলাদেশে আর্সেনিকের প্রাদুর্ভাবযুক্ত এলাকার শিশুদের দেহে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী উচ্চমাত্রার ডায়রিয়া জীবাণু ই-কোলাই পেয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। গবেষণায় বলা হয়েছে, ই-কোলাই একটি ব্যাকটেরিয়া যা ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ।

দেশের চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ ও মতলব উপজেলার ১০০টি পরিবারের (প্রত্যেক উপজেলায় ৫০টি) মা ও শিশুদের মল এবং খাবার পানির নমুনা পরীক্ষা করে এমন তথ্য পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গতকাল বৃহস্পতিবার আইসিডিডিআর,বি এই গবেষণা প্রকাশ করে। গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিষয়ক সাময়িকী প্লস প্যাথোজেন্সে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, হাজীগঞ্জের মানুষ অগভীর নলকূপের পানি পান করে। এখানকার পানিতে আর্সেনিকের উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, মতলবের পরিবারের সদস্যরা আর্সেনিকমুক্ত গভীর নলকূপের পানি পান করে।

হাজীগঞ্জের প্রতি লিটার পানিতে ৪৮১ মাইক্রোগ্রাম আর্সেনিক। অথচ খাবার পানিতে আর্সেনিকের সর্বোচ্চ সীমা হওয়া উচিত ১০ মাইক্রোগ্রাম। তবে মতলবের পানিতে আর্সেনিকের ঘনত্ব ছিল শূন্য মাইক্রোগ্রাম।

অবশ্য দুটি এলাকার ৮৪ শতাংশ পানি ও মলের নমুনায় ই-কোলাই পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মতলবের (২২ শতাংশ) পানির তুলনায় হাজীগঞ্জে (৪৮%) পানিতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ই-কোলাই বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে, হাজীগঞ্জের ৯৪ শতাংশ ও মতলবের ৭৬ শতাংশ শিশুর দেহে ব্যাকটেরিয়াটির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে কোনো এলাকার মায়েদের মধ্যে ই-কোলাই পাওয়া যায়নি।

এছাড়া হাজীগঞ্জের পানি ও মলে ই-কোলাই-এর উচ্চতর অনুপাত পেনিসিলিন, সেফালোস্পোরিন এবং ক্লোরামফেনিকলসহ একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ছিল।

গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছে, বাংলাদেশে আর্সেনিকের প্রাদুর্ভাবযুক্ত এলাকার শিশুদের দেহে আর্সেনিকের উপস্থিতি এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের মধ্যকার সম্পর্ক জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। ফলে আর্সেনিকের প্রভাব ও বিস্তার কমানোর  প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে গবেষণার প্রধান গবেষক আইসিডিডিআর,বি-র অ্যাডজাঙ্কট সায়েন্টিস্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতু পরিবেশে অ্যান্টিবায়োটিকের চেয়ে বেশি স্থিতিশীল। এসব ধাতু দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাকটেরিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। যার ফলাফল হিসেবে মানুষের মধ্যে অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স গড়ে উঠছে। এর ফলে কখনো অ্যান্টিবায়োটিক নেয়নি তবে আর্সেনিকের মতো ধাতুর সংস্পর্শে এসেছে এমন মানুষ এবং বিভিন্ন প্রাণীর দেহে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী বিভিন্ন অণুজীব সহজেই তাদের বসতি গড়ে তুলতে পারে।

এই গবেষক সতর্ক করে দিয়ে বলেন, পরিবেশে যাতে ভারী ধাতুর প্রভাবে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখার পাশাপাশি ওষুধ ও কৃষিতে অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল ব্যবহারে দায়িত্বশীল হতে হবে। আইসিডিডিআর,বি-র অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট মোহাম্মদ বদরুল আমিন বলেন, বর্তমান গবেষণার ফলাফল বিবেচনা করে দেশের বিভিন্ন পরিবেশে সিসা, পারদ ও লোহার মতো অন্যান্য ভারী ধাতুর প্রভাব সম্পর্কে আরও অনুসন্ধান করার এখনই সঠিক সময়।

গবেষণাটির আরেক গবেষক প্রভাত তালুকদার বলেন, ‘আমরা দেখেছি যে আর্সেনিক-প্রতিরোধী ই-কোলাই একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক, বিশেষ করে তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিনের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রতিরোধী। এই ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক সাধারণত ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত