বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় আসর ফিফা বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। এমন মেগা আসরের আয়োজক হওয়ার পর থেকে কাতার নানাভাবে পশ্চিমাসহ বিভিন্ন দেশের সমালোচনায় পড়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত বিশাল এই আয়োজন সঠিকভাবে শেষ করায় ও আন্তরিকতার কারণে বিশ্ববাসীর মন ছুঁয়েছে আল থানিদের দেশ। দেশটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিশ্বকাপ চলাকালে আগত অতিথিদের সামনে ইসলামের শিক্ষা ও পরিচিতি তুলে ধরতে কাজ করবে তারা। সেই সিদ্ধান্তের সফল বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষ করল বিশ্ববাসী। এ কারণে পুরো বিশ্বকাপের সময়ে কাতারে কোনো সহিংসতা ও অপরাধের ঘটনা সামনে আসেনি। এছাড়া ইভটিজিং ও হয়রানির অভিযোগ জানাননি কোনো নারী। এত বড় একটি আয়োজন নীতির মধ্যে থেকে এমনভাবে সফল করার জন্য ধন্যবাদ পাচ্ছে কাতার। ফুটবল বিশ্বকাপের গ্যালারিতে বসে অ্যালকোহল ছাড়া খেলা দেখা সম্ভব এটি কয়েকদিন আগেও অকল্পনীয় ছিল ভক্তদের কাছে। এছাড়া বিকিনি, অশ্লীলতা ছাড়াও যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইভেন্ট আয়োজন করা যায় তা ছিল ধারণার বাইরে। সেই অসম্ভব কাজটি শেষ পর্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করেছে কাতার বরং কাতারে ফুটবল দেখতে আসা লাখ লাখ দর্শক দেখে গেলেন ইসলামের সৌন্দর্য।
বিশ্বকাপ কাতারে বসা নিয়ে অনেকের আপত্তি ছিল। সেই আপত্তি কয়েকগুণ বেড়ে যায়, যখন আসর শুরুর মাত্র কিছুদিন আগে কাতার স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, সেখানে অবৈধ সঙ্গী নিয়ে থাকা যাবে না। পরা যাবে না খোলামেলা পোশাক। এ নিয়ে বেজায় চটে পশ্চিমা বিশ্ব। তবে তাদের নীতিতে অনড় থেকেছে কাতার। শেষ পর্যন্ত এসব নিয়ম মেনেই বিশ্বকাপ দেখতে এসেছেন লাখো দর্শক।
২০১০ সালে নিশ্চিত হয় ২০২২ সালের বিশ্বকাপের আসর বসবে কাতারে। তারপরই গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিকল্পনা করে। রাস্তার দেয়ালে দেয়ালে লিখে দেয় ইসলামের বাণী, মহানবীর বিভিন্ন কথা। আসরজুড়ে হাজারো স্বেচ্ছাসেবক দর্শকদের হিজাবের মর্ম বুঝায়। তাদের হিজাব পরিয়ে উপলব্ধি করানোর চেষ্টা করে। মসজিদে মসজিদে হাজার হাজার তরুণ ফুটবল দর্শকদের ইসলাম সম্পর্কে ধারণা দেয়। বিশ্বকাপের ভক্তদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে মসজিদগুলো। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রচুর লোক মসজিদগুলোতে সময় কাটান ও ইসলাম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। মসজিদে বেশিরভাগ দর্শনার্থীকে পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়। এছাড়া মুয়াজ্জিনের আজান, কাতারি স্থাপত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে অনেকে আগ্রহী ছিলেন। মসজিদের দরজায় ৩০টিরও বেশি ভাষায় ইসলাম সম্পর্কে বৈদ্যুতিক বোর্ডগুলো দর্শকদের তাদের ফোনে দেখার অনুমতি দেওয়ার জন্য স্থাপন করা হয়। যারা চান তাদের দেওয়া হয় বিভিন্ন ভাষায় ইসলাম পরিচিতিমূলক পুস্তিকা। কাতারের ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০২২ বিশ্বকাপের সময় ইসলাম এবং এর শিক্ষাগুলো প্রচার করার জন্য একটি প্যাভিলিয়ন চালু করে। কাতার নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, প্রায় দু’হাজার বিদেশি কাতারে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
শুধু সরকারিভাবে নয়, ব্যক্তি উদ্যোগেও হয়েছে ইসলামের প্রচার-প্রচারণা। স্টেডিয়ামের সামনে খেলার আগে বিনামূল্যে খেজুর, কেক, বিস্কুট এবং কফি বিতরণ করে গ্রাহকদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হতো একটি কার্ড। যে কার্ডের বারকোড স্ক্যান করলেই কোরআন ও হাদিসের বাণী।
ইসলাম এবং মুসলিমবিরোধী ব্যাপক প্রচারণা ছিল কাতার বিশ্বকাপ ঘিরে। কিন্তু ফিফার সহায়তায় কাতার প্রমাণ করেছে একটি মুসলিম দেশ কতটা নিরাপদ। তারাও পারে অসাধারণ আয়োজনে বিশ্বকাপ শেষ করতে। আইনের সঠিক প্রয়োগ থাকলে কীভাবে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত নিরাপদ থাকে। এ প্রসঙ্গে ভারতীয় এক সাংবাদিক ফেইসবুকে লিখেছেন, প্রায় রাতের খেলা শেষে বাসায় ফিরতে ফিরতে ফজরের আজান দিয়ে দিত। তখনো দেখা যেত একা একা মহিলারা কাজ শেষ করে রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাসায় ফিরছে। নেই কোনো ভয়-ডর। কারণ প্রশাসন এখানে এতটাই কড়া যে পার পাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। রাস্তায় রাস্তায় সিসিটিভি লাগানো। কোনো ঘটনা সিসিটিভিতে ধরা না পড়লে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে শনাক্ত করার ব্যবস্থা আছে।
কাতারের এমন উদ্যোগে এতদিন যারা ইসলাম, মুসলমান এবং আরবদের বিষয়ে বিরূপ ধারণা পোষণ করতেন; তারা ভালো একটি বার্তা নিয়ে দেশে ফিরে গেছেন। যা ইসলামের নীরব প্রচারণাই হয়েছে বলা চলে।
তেত্রিশ বছর বয়সী ব্রাজিলভক্ত তাতিয়ানা লোপেজের কাতারে এসে সব ভুল ভাঙে। লোপেজ বলেন, ‘এখানকার পুরুষরা খুব বিনয়ী। যদিও আমি কলম্বিয়াতে যতটা দেখতে অভ্যস্ত, তারচেয়ে পাবলিক প্লেসে (মহিলাদের তুলনায়) বেশি পুরুষদের দেখা অদ্ভুত, তারা সবাই খুব সম্মান করেছে।’ অনেক পশ্চিমা দর্শক কাতারে নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। তবে দোহায় পা রাখার পরই তাদের সেই শঙ্কা কেটে যায়। যেমন আমেরিকান তরুণী আন্দ্রেয়া এম আল জাজিরাকে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও অনেকটা বেশি নিরাপদ কাতার।
কাতার বিশ্বকাপ দেখিয়েছে, ইসলামিক দেশগুলো একে অপরের প্রতি সহনশীলতার ছায়ায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাস করতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি ইসলামিক দেশে বিশ্বকাপের আয়োজন প্রমাণ করে, ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিডিয়ার ব্যাপক প্রচারণার বিপরীতে ইসলাম একটি দয়াশীল এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ধর্ম। ইসলাম কোনো ধরনের সহিংসতা ও সন্ত্রাসকে বরদাশত করে না বরং যারা ইসলামের নামে এ ধরনের অপরাধ করে তারা ইসলাম বোঝে না এবং তারা ইসলামি বিশ্বের প্রতিনিধি নয়। প্রকৃত ইসলাম হলো এমন এক ধরনের ইসলাম যা ধর্ম ও জাতি নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিকের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর জোর দেয়।
কাতার বিশ্বকাপ দেখিয়েছে, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ইহুদিবাদী শাসক গোষ্ঠীর প্রতি একটি ঘৃণ্য অবস্থান বিরাজ করছে। এই বিশ্বমঞ্চ থেকে তারা প্রত্যাশা করেছিল সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পর্যায়ে আরব জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক স্বাভাবিকীকরণকে ত্বরান্বিত এবং প্রসারিত করার বিরল সুযোগ পাবে। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টো ঘটনা ঘটে। ইহুদিবাদীদের হিসেব-নিকেশ পাল্টে দিয়ে কাতার বিশ্বকাপ হয়ে উঠল ইহুদিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে ঘৃণা এবং নির্যাতিত ও প্রতিরোধকামী ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থনের এক বিশাল ক্ষেত্র। বিশ্বকাপে দর্শকরা যেভাবে দোহায় ইহুদিবাদী সাংবাদিকদের প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ফিলিস্তিনি পতাকা তুলে স্টেডিয়ামের ভেতরে ফিলিস্তিন দীর্ঘজীবী হোক ও ইসরায়েল নিপাত যাক বলে সেøাগান দিয়েছে তা ইহুদিবাদী দখলদারদের বিরুদ্ধে ইসলামি দেশগুলোর বিদ্বেষেরই বহিঃপ্রকাশ।
কাতার বিশ্বকাপে সামাজিক মাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফুটে উঠেছিল। তা হলো বিশ্বে ফুটবল তারকাদের মধ্যে পরিবারের গুরুত্ব। যেখানে পশ্চিমা বিশে^ পরিবারকে মূল্যহীন ভাবা হয়, সেখানে ফুটবল তারকারা তাদের পরিবারের সঙ্গে বিশ্বকাপের জয় উদযাপন করেছেন। বিশ্বকাপে তৃতীয় হওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে এই সাফল্য উদযাপন করেছেন ক্রোয়েশিয়ার তারকা ফুটবলার লুকা মদ্রিচ। চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে এই সাফল্য উদযাপন করেছেন আর্জেন্টাইন সুপারস্টার লিওনেল মেসি।
এছাড়া মরক্কোর জাতীয় দল কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে যাওয়ার পরে দলের মিডফিল্ডার সেফিয়ান বাউফল তার মাকে জড়িয়ে ধরে উদযাপন করেছিলেন। এর আগে আরেক ম্যাচে জয় পেয়ে মরক্কোর খেলোয়াড় আশরাফ হাকিমি গ্যালারিতে থাকা মাকে জড়িয়ে ধরেন। তখন কীর্তিমান ছেলের কপালে আবেগমিশ্রিত চুমু এঁকে দেন রত্মগর্ভা মা সাঈদা মৌ। আশরাফ হাকিমি এবং তার মায়ের এমন ভালোবাসার দৃশ্য মোহিত করেছে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীকে। এই আচরণগুলো দেখায় যে পরিবারও এই বিশ্বমঞ্চের একটি অংশ এবং ফুটবল বিশ্বের বড় তারকাদের সাফল্যের কারণ।
