রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) নির্বাচনের প্রচার শেষ হয়েছে গতকাল রবিবার মধ্যরাত থেকে। আগামীকাল মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ হবে। সব কেন্দ্রেই ভোট নেওয়া হবে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম)। উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা থাকলেও মেয়র পদে প্রধান দুই প্রার্থী সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখছেন না।
নির্বাচন কমিশন সূত্রমতে, রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী ৯ জন, ১১টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে প্রার্থী ৬৮ জন এবং ৩৩টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে প্রার্থী ১৮৩ জন। প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে প্রতিশ্রুতি আর পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে মিছিল, উঠোন বৈঠক ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে কর্মসূচি প্রচার পর্ব শেষ করেছেন। এখন অপেক্ষা কে হবেন তৃতীয় বারের নগরপিতা এবং ৩৩ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর।
ইতিমধ্যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। আনুষ্ঠানিকভাবে ২০ দিনের উৎসবের মধ্যে প্রচার-প্রচারণার মাঝে ছিল অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। ইভিএমে ভোটগ্রহণ নিয়ে শঙ্কা না থাকলেও পেছনের কারিগর ও গ্রামের বয়স্ক ভোটারদের আপত্তি ও সমালোচনা ছিল। মূলত মেয়র পদে জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যেই ভোটযুদ্ধ হবে আর আগের দাপুটে কাউন্সিলরদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অস্তিত্বের লড়াই।
রিটার্নিং অফিসার ও নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব আব্দুল বাতেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আশা করি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সব ঠিকঠাক থাকলে কাল সকাল থেকে ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীদের কোনো রকম ভয়ভীতি ছাড়া ভোটদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন।’
সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হবে। ইতিমধ্যে তিন হাজারেরও বেশি ইভিএম চলে এসেছে। ১ হাজার ৩৪৯টি ভোটকক্ষে একটি করে সিসি ক্যামেরা এবং ২৩০টি কেন্দ্রের প্রতিটিতে ২টি করে সিসি ক্যামেরাসহ মোট ১ হাজার ৮০০ সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখতে গতকাল রবিবার থেকে ৫ দিনের জন্য ৩৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ১৬ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে থাকবেন। নির্বাচন আচরণবিধি প্রতিপালনের জন্য ২৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত চারদিন প্রতিটি ওয়ার্ডে থাকবেন একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তারা সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী নির্বাচনী অপরাধ রোধ, বিজিবির স্ট্রাইকিং ফোর্সের সঙ্গে দায়িত্ব পালন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবেন। বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটরা সংক্ষিপ্ত বিচারকাজ করবেন। তারা ভোটের এলাকায় থাকবেন ২৫ ডিসেম্বর থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
অপরদিকে, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগ তৈরি, নির্বাচনী এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ রাখা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ন্ত্রণে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক (বিজিবি), আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক এবং রংপুর জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের উপ-সচিব মোহাম্মদ রাশেদ হোসেন চৌধুরী।
সূত্র মতে, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে পুলিশ, আনসার ও ভিডিপির পাশাপাশি মাঠে থাকবে ১১ প্লাটুন বিজিবি। প্রতি ২টি সাধারণ ওয়ার্ডে একটি করে র্যাবের টিম থাকবে বলেও জানা গেছে। গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে ৪ জন অস্ত্রসহ পুলিশ, ২ জন অস্ত্রসহ আনসার ও ১০ জন লাঠিসহ আনসার/ভিডিপি সদস্য মোতায়েন থাকবেন।
নৌকার পক্ষে গণজোয়ার উঠেছে, বিপুল ভোটে জয় সুনিশ্চিত বলে প্রচারের শেষ দিন জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের মনোনীত মেয়র প্রার্থী হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া। তিনি গতকাল রবিবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নগরীর কেরানীপাড়া চৌরাস্তা মোড়, হনুমানতলা, কুকরুলসনহ বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগের সময় সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘রংপুর যে নৌকার ঘাঁটি তা প্রমাণ হবে এ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে।’
জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী ও সদ্য সাবেক মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা গতকাল রংপুর মহানগরীর স্টেশন রোড, জীবন বীমা মোড়, সেন্ট্রাল রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেন। এ-সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ভোট নিয়ে তার কোনো শঙ্কা নেই। তবে নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপি করতে আসা যেকোনো অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করতে জাতীয় পার্টি প্রস্তুত থাকবে। তার মেয়াদে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা-ের বর্ণনা দেন তিনি।
একইভাবে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী লুৎফর রহমান মিলনসহ অন্য মেয়র প্রার্থীরাও প্রচার চালিয়ে গেছেন। নির্বাচন বর্জন করায় বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে।
সরেজমিনে নির্বাচনী এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, মেয়র প্রার্থীদের চেয়ে কিছু কিছু ওয়ার্ডের দাপুটে কাউন্সিলরা অস্তিত্বের লড়াইয়ে পড়েছেন। ভোটাররা তাদের গত বছরের আমলনামা দেখে এবার ভোট দেবেন। বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর জিরো থেকে গাড়ি-বাড়ি করে কোটিপতি বনে গেছেন। তাদের নানান বিতর্কিত কর্মকা-ে ভোটাররা এবার ভোটের মাধ্যমে জবাব দেওয়ার কথা বলছেন।
গত ১০ বছরে নগরীর মূল শহরের কিছু উন্নয়ন হলেও বর্ধিত এলাকাগুলোর রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা, নেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থাপনা। সিটি এলাকার বেশিরভাগ গ্রামীণ জনপদ এখনো আগের মতোই রয়েছে গেছে। এ কারণে যাকে দিয়ে উন্নয়ন ও সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত হওয়া যাবে তাকেই কাউন্সিলর নির্বাচিত করবেন ভোটাররা।
