টুলটুলের তুলতুল

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:৪৯ পিএম

টুলটুল গিয়েছিল ওর খালার বাসায়। খালার একটা বেড়াল আছে। নাম মিনি। টুলটুলের খালার নাম মিনু। নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে তিনি তার প্রিয় বেড়ালের নাম রেখেছেন।

মিনি তিনটা বাচ্চা দিয়েছে। বাচ্চা তিনটা দেখতে খুব সুন্দর। তার মধ্যে দুটা মেয়ে। আর একটা ছেলে। ছেলে বাচ্চাটার সাদা-কালোর মিশেল গায়ের রং। মোটা লেজ। লেজের বেশির ভাগটাই কালো।

টুলটুল বলল, ‘খালামণি, আমি একটা বেড়াল বাচ্চা নিতে চাই।’

খালা খুশি হয়ে বললেন, ‘নেবে? আচ্ছা নাও।’

‘আমি এই ছেলে বাচ্চাটা নেব।’

‘যেটা খুশি নাও।’

টুলটুল বেড়াল বাচ্চাটা নিয়ে বাসায় ফিরল। মা কিন্তু খুশি হলেন না। তিনি বেড়াল বাচ্চাকে এক ধরনের সমস্যা মনে করলেন। অবশ্য বেড়াল বাচ্চাটা কিছু সমস্যাও করতে লাগল। এটা-ওটার মধ্যে মুখ দেয়। লাফ-ঝাঁপ করে। টেবিল থেকে গ্লাস-বাটি ইত্যাদি ফেলে দেয়। বিছানায় উঠে শুয়ে থাকে। শুচিবাইগ্রস্ত মা সেটা পছন্দ করেন না। টুলটুলকে বলেন, ‘তুমি ঝামেলা বাধাতে এটা নিয়ে এসেছো। অশান্ত, অভদ্র একটা বেড়াল।’

টুলটুল ভাবতে বসল। ওকে শান্তশিষ্ট করতে হবে। ভদ্র বানাতে হবে। ও যাতে এটা-ওটার মধ্যে মুখ না দেয় সে ব্যবস্থা নিতে হবে। ও যাতে মার বিছানায় না ঘুমায় সে ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রথমেই ওর একটা নাম দেওয়া দরকার। মার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলে লাভ নেই। মা এ ব্যাপারে সাহায্য করবেন না। টুলটুল গেল বাবার কাছে। বলল, ‘বাবা, আমার বেড়াল বাচ্চাটার একটা নাম দিতে পারবে?’

বাবা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাড়া মাথা ঘামান না। বেড়াল বাচ্চার নাম তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাবা বললেন, ‘লেখাপড়া তো চাঙে উঠে যাবে দেখছি।’

‘কার লেখাপড়া বাবা? বেড়ালের?’

‘বেড়াল আর কী লেখাপড়া করবে? ওর সামনে কি এ প্লাসের মুলা ঝোলানো আছে?’

‘তাহলে কার বাবা?’

‘বেড়ালের মালিকের।’

‘বাবা, প্লিজ...।’

‘মিনি রেখে দাও।’

‘খালামণির বেড়ালের নাম তো মিনি।’

‘তাতে কী? সে তো আর এ বাসায় আসছে না। আমাদের গ্রামে সাতজন বাচ্চু ছিল। তাতে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে?’

‘আমার বেড়ালটা ছেলে। ছেলেদের নাম দরকার।’

‘তাহলে রনি, জনি, কুদ্দুস, মোকসেদ, আক্কাস এ রকম কিছু রেখে দাও।’

মোকসেদ আর আক্কাস টুলটুলদের এলাকার নামকরা মাস্তান। মাস্তানের নামে প্রিয় বেড়ালের নাম রাখবে? টুলটুল মুখ বাঁকা করল। বলল, ‘ধ্যাত্তরি! এসব কি বেড়ালের নাম মানায়?’

‘বেড়ালের নামের আবার এত মানানোর কী আছে? ও তো আর কোনো দিন মন্ত্রী-এমপি হবে না। লুটপাট, ঘুষ-দুর্নীতির মতো মহোৎসব ঘটাবে না। আজীবন বেড়ালই থাকবে।’  বাবা রেগে যাচ্ছেন। বাবা রেগে গেলে প্রথমে রাগ ঝাড়েন মন্ত্রী-এমপিদের ওপর। বাবার মতো হলো, মন্ত্রী-এমপিরাই দেশের বারোটা বাজাচ্ছেন।

টুলটুল বলল, ‘ওকে এতটা অবহেলা করা ঠিক না বাবা। জানো তো, রাশিয়ার ফুটবল বিশ্বকাপে একিলিস নামের এক ছেলে বেড়াল ভবিষ্যদ্বাণী করেছে প্রতি ম্যাচে।’

বাবার মুখ লাল হয়ে উঠল। চোখ বড় ও গোল হয়ে গেল। নাকের ডগা ফুলে গেল। চোখের ভেতর মণি ঘুরতে লাগল। এসব হলো অতিশয় রাগের লক্ষণ। তার মানে বাবা অতিশয় রেগে গেছেন। বললেন, ‘তুই তোর বেড়াল নিয়ে রাশিয়ায় চলে যা। সেখানে তোর বেড়াল বলবে, মেসি কয়টা পেনাল্টি মিস করবে, নেইমার কয়বার মাঠে আছাড় খাবে। যা, এখন আমার কাছ থেকে দূরে যা। নইলে...!’

টুলটুল দ্রুত বাবার সামনে থেকে সরে এলো।

শেষে টুলটুল নিজেই নাম ঠিক করল। বেড়ালটার তুলতুলে নরম শরীর। নরম পায়ের পাতা। মিহি কণ্ঠ। সব মিলিয়ে ওর নাম তুলতুল হলেই ভালো হয়। টুলটুলের নামের সঙ্গে মিলও হবে। যেমন খালামণি তার বেড়ালের নাম রেখেছেন নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে।

টুলটুল ওর খালামণিকে ফোন করে জানাল। খালামণি বললেন, ‘তুই তো জিনিয়াসরে বাবা! এত সুন্দর নাম বের করেছিস! তোর নামের সঙ্গে চমৎকার মিলেছে।’

টুলটুল তুলতুলের খাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট বাটি বানাল। নিজের ঘরের এক কোনায় তুলতুলের জন্য নরম বিছানা পেতে দিল। সে বিছানায় বাইরের কেউ না জেনে বসতে পারে। তাই বিছানার পাশে দেয়ালে একটা কাগজ লাগিয়ে তাতে লিখে দিলক্যাট’স বেড। এতে বাবা আপত্তি তুললেন। বললেন, ‘ইংরেজি লেখার কী হলো? ইংরেজিতে লিখলে কি বেড়াল বাঘ হয়ে যাবে? ‘বিলাইয়ের বিছানা’ লিখলেই বরং সুন্দর হতো।

তুলতুল দিনে দিনে সভ্য হয়ে উঠতে লাগল। এটা-ওটায় মুখ দেয় না। নিজের বাটিতে খাবার দিলে খায়। নিজের বিছানায় ঘুমায়। লাফ-ঝাঁপ তেমন করে না। তবে কাঠি, কাগজ এসব পেলে তা নিয়ে খেলা করে। এমনভাবে সেসবের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যেন সেগুলো ইঁদুর। মা তুলতুলের ওপর অনেকটা নরম হয়ে এসেছেন। বলেন, ‘মনে হচ্ছে, বেড়ালটা শিকারে খুব দক্ষ হবে।’

দেড় বছর কেটে গেছে। টুলটুল নতুন ক্লাসে উঠেছে। আর তুলতুলও সেই ছোট্ট বেড়াল ছানাটি নেই। সে পরিপূর্ণ বেড়াল হয়ে উঠেছে। বেশ মোটা-সোটা। স্বভাবে শান্তশিষ্ট। কিন্তু ইঁদুরদের কাছে তার ভিন্ন রূপ। ইঁদুরদের কাছে সে রীতিমতো রয়েল বেঙ্গল টাইগার। কীভাবে যে ঘাড়ের ওপর হামলে পড়ে ইঁদুররা তা টেরই পায় না। মুহূর্তে ঘাড় মটকে দেয়। তুলতুলের ভয়ে বাসায় কোনো ইঁদুর নেই। টুলটুলদের বাসার ধারে-কাছেও ইঁদুর আসতে সাহস পায় না। বাচ্চা ইঁদুরগুলো না জেনে মাঝে মাঝে আসতে চায়। ওদের মা-বাবা বলে, ‘খবরদার! ওই বাড়ির দিকে পা বাড়াতে যেও না। নির্ঘাত মরবে। ওই তুলতুল না ফুলতুল, ওটা যেন বেড়াল না। দৈত্য-দানব। সাক্ষাৎ যম।’

মা এখন তুলতুলের ওপর খুব খুশি। তুলতুলকে ভালো খেতে দেন। ওর তারিফও করেন। এক দিন তুলতুল বেশ কয়েকটা বাচ্চা নিয়ে এলো। সঙ্গে একটা বড়সড় মেয়ে বেড়াল। মা দেখে হেসে ফেললেন। সবাইকে ডেকে বললেন, ‘দেখো, দেখো, টুলটুলের বেড়াল ওর বাচ্চাদের এনেছে, তোমাদের দেখাবে বলে।’ টুলটুল বলল, ‘মা ওরা কি এখানে থাকবে?’ মা বললেন, ‘না। ছেলে বেড়াল বাচ্চা রাখে না। তবে থাকলেও ক্ষতি নেই। থাক, আরও কয়েকটা বেড়াল হোক। তোমার আর কি, তুমি তো খুশিই হবে।’ টুলটুলের মনে হলো, তুলতুলের বাচ্চাগুলো যদি এ বাড়িতেই থাকে তাহলে টুলটুলের থেকে ওর মা-ই বেশি খুশি হবে। হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে বেড়ালকে মা আর অভদ্র, অশান্ত প্রাণী বলে মনে করে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত