জাইর বলসোনারো। ব্রাজিলের সদ্য সাবেক এই প্রেসিডেন্ট তার তীব্র ডানপন্থি চিন্তা, একগুঁয়ে আচরণের জন্য ল্যাতিন আমেরিকার ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ হিসেবে পরিচিত। কেবল নামে নয়, সাম্প্রতিক নির্বাচনে লুলা দা সিলভার জয় মেনে না নেওয়া এবং সমর্থকদের উত্তেজিত করার বেলাতেও তিনি যেন হুবহু ট্রাম্প! এবার বলসোনারো সমর্থকরাও দেখাল ট্রাম্প-সমর্থকদের মতোই সহিংস রূপ। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে প্রায় দুই বছর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুসারীদের নজিরবিহীন নৈরাজ্যের পুনর্মঞ্চায়ন ঘটল ব্রাজিলে। বলসোনারোর কট্টর সমর্থকরা তাণ্ডব চালাল ব্রাসিলিয়ায় প্রেসিডেস্ট প্রাসাদ, কংগ্রেস আর সুপ্রিম কোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়। রয়টার্স লিখেছে, নির্বাচনের পর থেকে দু’মাস ধরে যে টানটান উত্তেজনা চলছিল ব্রাজিলে; তারই বিস্ফোরণ ঘটে গত রবিবার।
হাজার হাজার বলসোনারো সমর্থক প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে তাণ্ডব চালায়। সম্প্রচারিত ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারী সুপ্রিম কোর্ট ও কংগ্রেস ভবনে প্রবেশ করছে, ভবনের ছাদে উঠে সেøাগান দিচ্ছে, আসবাবপত্র ভাঙছে। তিন থেকে পাঁচ হাজার মানুষ এই বিশৃঙ্খলায় অংশ নেয় বলে স্থানীয় গণমাধ্যমের ধারণা। পুলিশের সঙ্গে তারা সংঘাতেও জড়ায়। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তিন ভবন থেকে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। গ্রেপ্তার করা হয় অন্তত চারশজনকে। সেখানে হতাহতের কোনো তাৎক্ষণিক খবর পাওয়া যায়নি, তবে হামলাকারীরা সবখানে ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন রেখে গেছে। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের ভাঙা আসবাবপত্র আর কংগ্রেসের সামনের অংশের কাচ তাণ্ডবের সাক্ষী। সুপ্রিম কোর্টের রুমগুলোও তছনছ করা হয়েছে। ভাঙচুর করা অফিস সরঞ্জামে ভীষণ বিশৃঙ্খল চেহারা এখন ভবনগুলোর অন্দরে।
গত ৩০ অক্টোবরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটে বামপন্থি লুলা দা সিলভার কাছে হেরে যান বলসোনারো। ১৩ ডিসেম্বর ব্রাজিলের নির্বাচনী কর্র্তৃপক্ষ লুলার জয় অনুমোদন দেওয়ার দিনই বলসোনারো সমর্থকরা রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় পুলিশ সদরদপ্তর দখলে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল। এমনকি ট্রাক রেখে মহাসড়কে প্রতিবন্ধকতাও সৃষ্টি করেছিল। নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিংয়ে জালিয়াতির অভিযোগ করেছিলেন বলসোনারো। সেই সূত্র ধরে তিনি সামরিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে বলেছিলেন। রবিবারের সহিংস বিক্ষোভে তার অনেক সমর্থকও সেনা হস্তক্ষেপের আহ্বান জানানো ব্যানার নিয়ে হাজির হয়।
ব্রাসিলে যখন তাণ্ডব চলছে, প্রেসিডেন্ট লুলা তখন সরকারি সফরে সাও পাওলোতে। সেখানে এক সংবাদ সম্মেলনে সহিংসতাকারীদের ধর্মান্ধ, ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন , ‘তারা আজ যা করেছে, এই দেশের ইতিহাসে এমন জঘন্য ঘটনা আর কখনো ঘটেনি।’ এ ঘটনায় জড়িত প্রত্যেককে খুঁজে বের করে শাস্তির মুখোমুখি করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট লুলা। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত রাজধানী ব্রাসিলিয়ার আইনশৃঙ্খলা সামলানোর দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের হাতেই থাকবে। নির্বাচন নিয়ে ‘মিথ্যা অভিযোগ’ তুলে সমর্থকদের সহিংসতার পথে উসকে দেওয়ার জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট বলসোনারোকে দায়ী করেছেন তিনি।
এদিকে নিজের সমর্থকরা যখন উগ্রতার চরমে তখন বলসোনারো আছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায়। নির্বাচনে লুলার কাছে হার তিনি এখনো মেনে নেননি। ব্রাসিলিয়ার ওই তাণ্ডব নিয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টা নীরব থাকেন বলসোনারো। পরে তিনি টুইট করে লুলার অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ গণতন্ত্রেরই অংশ। তবে সরকারি স্থাপনায় হামলা এবং ক্ষতিসাধন করা হলে সেটা সীমা ছাড়িয়ে যায়।’ রয়টার্স লিখেছে, ব্রাসিলিয়ার এই সহিংসতা বলসোনারোর সামনে আইনি ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। যেমন ক্যাপিটল হিলে দাঙ্গার ঘটনায় বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন ট্রাম্প।
ব্রাসিলিয়ায় সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একে ‘গণতন্ত্র এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার হস্তান্তর প্রক্রিয়ার ওপর আক্রমণ’ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেছেন, ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তাণ্ডবের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। একই সঙ্গে দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভার প্রতিও শক্ত সমর্থন জানিয়েছে মস্কো। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ব্রাজিলের বর্তমান সরকারের প্রতি এ সমর্থন জানান। ল্যাতিন আমেরিকার নেতারা দ্রুততার সঙ্গে ঘটনার নিন্দা জানান। টুইটে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেদ্রো টুইট করেছেন, ‘ফ্যাসিবাদ যখন অভ্যুত্থান করতে চাইছে, তখন আমার সমস্ত সংহতি লুলা ও ব্রাজিলের জনগণের সঙ্গে।’ চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাবরিয়েল বরিক বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের ওপর এই কাপুরুষোচিত ও জঘন্য হামলার মুখে লুলার সরকারের প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি।’
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেনের জয়ের পর মার্কিন কংগ্রেসে এর অনুমোদন ঠেকাতে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল ভবনে হামলা চালিয়েছিল ট্রাম্পের সমর্থকরা। ওই হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত হলেও হামলাকারীদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়।
