ঘন কুয়াশা আর কনকনে ঠান্ডা বাতাস উপেক্ষা করে দুই দিন ধরে ইজতেমা মাঠে সার্বক্ষণিক ইবাদত-বন্দেগিতে মগ্ন রয়েছেন দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মুসল্লি। প্রতিদিন ফজর থেকে এশা পর্যন্ত ইজতেমা ময়দানে ইমান, আমল, আখলাক ও দ্বীনের পথে মেহনতের ওপর আমবয়ান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গতকাল শনিবার বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় দিনে দেশ-বিদেশ থেকে আসা মুরব্বিরা তাবলিগের ছয় উছুলের মধ্যে দাওয়াতে দ্বীনের মেহনতের ওপর গুরুত্বারোপ করে বয়ান করেন।
আজ রবিবার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে মুসলিম বিশে^র দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হতে পারে। তাবলিগ জামাতের শীর্ষস্থানীয় মুরব্বি বাংলাদেশের কাকরাইল মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা জুবায়ের আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করবেন বলে ইজতেমা আয়োজক সূত্রে জানা গেছে।
ইজতেমা ময়দানে বিদেশি নিবাসের পূর্ব পাশে বিশেষভাবে স্থাপিত মঞ্চ থেকে এ মোনাজাত পরিচালনা করা হবে। এতে প্রায় ৩০ লাখ দেশি-বিদেশি মুসল্লি অংশ নেবেন বলে ইজতেমার আয়োজকরা ধারণা করছেন। মোনাজাতের আগে বিশেষ হেদায়াতি বয়ান করবেন ভারতের মাওলানা ইবরাহীম দেওলা। অনুবাদ করবেন মাওলানা আব্দুল মতিন। ইজতেমার মোনাজাতের আগে রবিবার বাদ ফজর বয়ান করবেন ভারতের মাওলানা আবদুর রহমান।
ইজতেমার আয়োজকরা জানান, প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাত শেষে মুসল্লিরা ইজতেমা মাঠ ছেড়ে যাওয়ার পর ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে এবং ২২ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হবে এ বছর বিশ্ব ইজতেমার সব পর্ব।
আখেরি মোনাজাত ও প্রস্তুতি : আখেরি মোনাজাতে শরিক হতে বিপুলসংখ্যক নারী টঙ্গীর আশপাশে অবস্থান নিয়েছেন। অনেকে তাদের আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে উঠেছেন। ইজতেমা ময়দান পরিপূর্ণ হয়ে হাজার হাজার মুসল্লি প্রবেশ পথের দুই পাশে ফুটপাতে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নিয়েছেন। ধুলা-বালি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তারা খাওয়া-দাওয়া ও ঘুমাচ্ছেন। আখেরি মোনাজাত পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করবেন বলে জানান।
রংপুর থকে আসা মুসল্লি ইমান উদ্দিন জানান, ২০ জনের কাফেলা নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে ইজতেমা ময়দানে আসেন, কিন্তু মূল প্যান্ডেলের ভেতরে স্থান না পেয়ে ফুটপাতে অবস্থান নিয়েছেন। মাইকের ব্যবস্থা থাকায় বয়ান শুনতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে খাওয়া, গোসল, রান্না ও রাতে ঘুমাতে সমস্যা হচ্ছে।
বয়ান : গতকাল বয়ানে বিশ্ব ইজতেমার শীর্ষ আলেমরা বলেন, দুনিয়া হচ্ছে ধোঁকার ঘর, এ দুনিয়া হচ্ছে ধোঁকার জীবন। মিছে এ দুনিয়ার আরাম-আয়েশের কথা ভুলে গিয়ে আখেরাতের কথা চিন্তা করুন। দুনিয়ার আমল ছাড়া আখেরাতে খালি হাতে যাওয়া যাবে না। সবাইকে দ্বীনের পথে সময় লাগাতে হবে। আমাদের সবার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। নিজের ইমানকে মজবুত করতে হবে। দ্বীনের দাওয়াত সর্বত্র পৌঁছে দিতে হবে।
দ্বিতীয় দিনের শুরুতে শনিবার বাদ ফজর মুসল্লিদের উদ্দেশে বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা খোরশিদুল হক। সকাল ১০টায় আলেমদের উদ্দেশে বিশেষ বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ইবরাহীম দেওলা, মাদ্রাসার ছাত্রদের উদ্দেশে বিশেষ বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা খোরশিদ, আরব জামাতের উদ্দেশে বয়ান করেন ভারতের মাওলানা আহমদ লাট, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য বয়ান করেন ভারতের মাওলানা সানোয়ার, বিদেশি জামাতের উদ্দেশ্যে ইংরেজিতে বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা ইফতার জামান। বাদ জোহর বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ফারুক। বাদ আসর বয়ান করেন ভারতের মাওলানা যুহাইরুল হাসান এবং অনুবাদ করেন মাওলানা যোবায়ের।
সাত মুসল্লির মৃত্যু : টঙ্গীর তুরাগতীরে বিশ্ব ইজতেমার ময়দানে সাত মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত বার্ধক্য ও শ^াসকষ্টজনিত কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি আশরাফুল ইসলাম জানান, সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুরের হেমুবুটে গ্রামের মো. নূরুল হক (৬৩), গাজীপুর মহানগরীর ভুরুলিয়া এলাকার আবু তৈয়ব ওরফে আবু তালেব (৯০), ঢাকার কেরানীগঞ্জের হাজি মোহাম্মদ হাবিবউল্ল্যাহ হবি (৬৮), খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মলমলিয়া গ্রামের মোফাজ্জল হোসেন খান (৭০), মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার মধ্য কামার গ্রামের আক্কাস আলী সিকদার (৫০), চট্টগ্রাম সদর থানার রাউজান এলাকার আব্দুল রশিদের ছেলে আব্দুল রাজ্জাক (৭০) ও নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার মাছিমপুর গ্রামের হাবিবুর রহমান হবি (৭০) মারা গেছেন।
বিদেশি মুসল্লি : গাজীপুরের টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় বিদেশি মুসল্লিদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও সেবায় এবারই প্রথম ইজতেমায় কাজ করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। এখন পর্যন্ত ৬৬ দেশের ৫ হাজার ২৮৬ জন মুসল্লি ইজতেমায় এসেছেন। গতকাল গাজীপুর শহীদ আহসান উল্লাহমাস্টার স্টেডিয়াম পুলিশ কন্ট্রোল রুমে এ তথ্য জানান ট্যুরিস্ট পুলিশের ডিআইজি মো. ইলিয়াস শরীফ।
মোবাইলে কলড্রপ, ইন্টারনেটে ধীরগতি : বিশ্ব ইজতেমায় আসা মুসল্লিরা শুক্রবার থেকেই মোবাইল নেটওয়ার্কের ভোগান্তিতে পড়েছে। সংযোগ না পাওয়া, কলড্রপ ও ধীরগতি ইন্টারনেন্টের কারণে সমস্যায় পড়ছেন। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সংবাদকর্মীরা তথ্য আদান-প্রদানে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদান-প্রদানেও সমস্যা হচ্ছে জানিয়ে খিত্তায় কর্তব্যরত এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খিত্তার অবস্থা মুহূর্তে মুহূর্তের খবর কন্ট্রোলে জানানোর কথা রয়েছে। কিন্তু আমরা মাঠের ভেতর থেকে মোটেও নেটওয়ার্ক পাচ্ছি না। ইন্টারনেটও চলে না। তাই বয়ানের তথ্য, মুসল্লিদের অসুস্থতা বিভিন্ন তথ্য মোবাইল নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে সঠিক সময়ে দেওয়া যাচ্ছে না।’
অসুস্থ হয়ে পড়ছেন মুসল্লিরা : শীতের প্রকোপে ইজতেমায় আসা মুসল্লিদের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বিভিন্ন রোগে আক্রান্তরা ফ্রি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে ভিড় করছেন।
পুলিশি তৎপরতা : গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম জানান, আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে শনিবার দুপুর থেকে নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। প্যান্ডেলের ভেতর ও বাইরে মুসল্লিবেশে রয়েছেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। এ ছাড়া ইজতেমা ময়দানের সব প্রবেশপথে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ও বিভিন্ন পয়েন্টে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। বিশ্ব ইজতেমায় মোনাজাতে অংশ নেওয়া মুসল্লিদের সুবিধার্থে শনিবার রাত ১২টার থেকে ইজতেমা মাঠসংলগ্ন ঢাকার আব্দুল্লাহপুর, আশুলিয়ার কামারপাড়া, গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস ও টঙ্গীর নিমতলী পর্যন্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। সে ক্ষেত্রে ঢাকাগামী লোকজন ও যানবাহনকে ভোগড়া বাইপাস দিয়ে তিনশো ফুট সড়ক ব্যবহার করে চলাচল করতে বলা হয়েছে। যারা ময়মনসিংহ বা গাজীপুর যাবেন, তারা বাইপাইল থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা হয়ে চলাচল করবেন।
মৌসুমি ব্যবসায়ীরা তৎপর : বিশ্ব ইজতেমা ঘিরে আশপাশের এলাকায় হাজার হাজার মৌসুমি ব্যবসায়ী তাদের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। টঙ্গীবাজার, হোন্ডা রোড, কামারপাড়া স্টেশন রোড, আবদুল্লাহপুর, সøুইসগেট এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো হাজার হাজার দোকান বসিয়েছেন সুযোগসন্ধানী মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তাদের কাছ থেকে বেশি দাম দিয়ে পণ্য কিনতে মুসল্লিরা বাধ্য হচ্ছেন।
টঙ্গীর বিশাল এলাকা পরিণত হয়েছে কাঁচাবাজারে। তবে দাম অনেক চড়া। চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। ইজতেমায় আসা মুসল্লিরা বাধ্য হয়েই বেশি দামে এসব জিনিসপত্র কিনছেন।
যৌতুকবিহীন বিয়ে : রেওয়াজ অনুযায়ী, ইজতেমার দ্বিতীয় দিনে গতকাল বিকেলে ইজতেমাস্থলে বয়ান মঞ্চের পাশে হজরত ফাতেমা (রা.) ও হযরত আলী (রা.) বিয়ের দেনমোহর অনুসারে বিনা যৌতুকের শতাধিক বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের আগে বাদ আসর হাফেজ মাওলানা জোবায়ের বিয়ের খুতবা দেন। বিয়ে শেষে উপস্থিত দম্পতিদের স্বজন ও মুসল্লিদের মধ্য খুরমা খেজুর বিতরণ করা হয়। ইজতেমার মিডিয়া সমন্বয়কারী মাওলানা জহির রায়হান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
