নতুন বই হাতে পাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে ভুল ও পরিবর্তন নিয়ে নানা পর্যায়ে তুমুল আলোচনা চলছে। এসব নিছকই ভুল, না উদ্দেশ্যমূলক, সে প্রশ্নও উঠেছে। এ অবস্থায় গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে এসে পাঠ্যবইয়ে ভুল সংশোধন ও দায়ীদের ধরতে দুটি তদন্ত কমিটি করার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। আগামী সপ্তাহের শুরুতেই এ কমিটির সদস্যদের ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো হবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘একটি কমিটি হবে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে, যারা ভুল সংশোধনের ব্যাপারে কাজ করবেন। শুধু বিষয় বিশেষজ্ঞ না, ধর্ম, স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য এমন নানা বিষয়ে যে বিশেষজ্ঞরা আছেন তাদের নিয়ে আমরা এ কমিটি করব। আমরা একটা লিঙ্ক দিয়ে দেব, দেশ-বিদেশ থেকে আমাদের এই বই নিয়ে যেকোনো মতামত আমাদের জানালে এ কমিটির মাধ্যমে কোথাও কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধন করা হবে।’
দীপু মনি বলেন, ‘অন্য কমিটি হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে। তারা মূলত এ ঘটনার পেছনে কারও ইচ্ছাকৃত ভুল বা অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছিল কি না তা অনুসন্ধান করবে।’ দ্বিতীয় কমিটিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অন্য মন্ত্রণালয়, এমনকি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকেও সদস্য থাকতে পারেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এ বছরের বইয়ের পা-ুলিপি চূড়ান্ত করার আগে যেসব ছবি বাদ দিয়েছিলাম, সেগুলোও থেকে গেছে। অতএব সরষের মধ্যেও কোনো ভূত আছে কি না তা আমরা খুঁজে দেখব। এনসিটিবির ভেতরেও যদি কেউ থেকে থাকে যে কেউ ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে এ ভুলগুলো করেছে তাদেরও খোঁজা হবে। বই ছাপানোর বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ যে এখানে ভুল করার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কোথাও কারও গাফিলতি বা ইচ্ছাকৃতভাবে নেতিবাচক কোনো দিকে নেওয়ার অভিপ্রায় থেকে থাকলে তা খুঁজে বের করবে আমাদের দ্বিতীয় কমিটি।’
মন্ত্রী বলেন, ‘বইগুলো প্রণয়নের সঙ্গে আমরা যারা যুক্ত ছিলাম তারা বইয়ের কোথাও যেন ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, পেশা, লিঙ্গ বিদ্বেষ-বৈষম্য না থাকে তার জন্য সতর্কতা অবলম্বনের চেষ্টা করেছি। বইয়ে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা আছে। সংবেদনশীল কোনো বিষয় থাকলে আমরা নিশ্চয়ই নজর দেব। আওয়ামী লীগ কখনোই ধর্মবিরোধী বা বিদ্বেষী কিছু কখনো করেনি। কাজেই অনেক অভিযোগ আসতে পারে, অভিযোগের সত্যতা থাকলে তা সংশোধন করা হবে। কিন্তু এসব কথা বলে কেউ যদি মৌলবাদ ছড়ায়, তাহলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।’
দীপু মনি আরও বলেন, ‘এক বছরে এ পাঠ্যবই একেবারে সঠিক করে ফেলা দুরূহ কাজ। এ বছর আমরা বইগুলো পরীক্ষামূলক হিসেবে দিয়েছি। আমাদের পাইলটিং চলছে। সারা বছর আমরা সবার কাছ থেকে মতামত নেব এবং সেখানে পরামর্শ অনুযায়ী পরিমার্জন-পরিশীলনের সুযোগ থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘আমি নানা মাধ্যম থেকে পাঠ্যবইয়ের ভুল নিয়ে আলোচনা শুনছি। গণমাধ্যম, রাজনীতির মাঠ, সামাজিক মাধ্যম, সব জায়গা থেকেই আমরা বইয়ের ভুলগুলো নিয়ে আলোচনা শুনছি। আমরা আগেও বলেছি, আমাদের এই বইগুলো নতুন শিক্ষাক্রমে পরীক্ষামূলকভাবে আমরা প্রণয়ন করেছি। আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে মতামত পাচ্ছি। মানুষের মধ্যে বইগুলো নিয়ে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, সেটিকে আমরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি।’ তিনি বলেন, ‘ভুল, ভুলই। ভুল হলে আমি তা স্বীকার করে নেওয়ার পক্ষে। বেশ কয়েক বছর আগে প্রণয়ন করা বইয়ের ভুলগুলো আগে আলোচনা না হলেও এখন যে আলোচনা হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী সংশোধন হচ্ছে তা আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। আমি আশা করব পাঠ্যপুস্তককে ঘিরে কোথাও যেন কোনো অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করা না হয়।’
সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মো. জাকির হোসেন, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. কামাল হোসেন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব সোলেমান খান এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ফরিদ আহাম্মদ।
