মাছ চাষে বিশ্বে বাংলাদেশের আলাদা সুনাম আছে। মাছ চাষকে দ্বিতীয় মূল্যবান কৃষি সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে সরকার। দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ৫৭ শতাংশই আসে চাষ থেকে। এ খাতের উন্নয়ন ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় মৎস্য সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা আসিয়ানের কাছ থেকে নেবে বাংলাদেশ। এজন্য ‘মৎস্য চাষ ও মৎস্য খাত আসিয়ান বাংলাদেশের সহযোগিতা (টিপিপি)’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে মৎস অধিদপ্তর জানিয়েছে, উত্তম মৎস্য চাষ অনুশীলন (গ্যাপ), ক্লাস্টার একোয়া কালচার ফার্মিং বাস্তবায়ন (এএমএস) এর উদ্দেশ্য। পাশাপাশি সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনে মৎস্য খাতে নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ এশিয়ান নেশন্সের (আসিয়ান) কাছ থেকে সহযোগিতা নেবে বাংলাদেশ। আসিয়ানভুক্ত দেশ হতে হলে আগে সেক্টরাল ডেভেলপমেন্ট পার্টনার হতে হয়। এ প্রকল্পটি সেই উদ্দেশ্যেই নেওয়া।
এর মাধ্যমে মাছের রোগপ্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা শিখবে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তাছাড়া মাছসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যবিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে এ প্রকল্পে।
বাংলাদেশ এখনো আসিয়ানের সদস্য হয়নি। এ জোটের সদস্য হওয়ার জন্য বেশ কিছু শর্ত পরিপালন করতে হয়। তবে বাংলাদেশকে আইসিটি ও মৎস্য খাত উন্নয়নের জন্য শর্ত দিয়েছিল তারা। তাই আসিয়ান সচিবালয়ের সঙ্গে শুরুতে এসব ‘সেক্টরাল ডেভেলপমেন্ট পার্টনার’ হিসেবে কাজ করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সাল থেকে আসিয়ানের সদস্য হওয়ার জন্য শর্ত পরিপালনের নির্দেশনা দিয়ে আসছিলেন। এরই অংশ হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পে আঞ্চলিক সম্পর্ক উন্নয়নের কাজ করাই মূল উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প প্রস্তাবে দেখা যায়, এ প্রকল্পটি ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। সময় প্রস্তাব করা হয়েছে চলতি ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। পুরো ব্যয়ই সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে হবে। অর্থনৈতিক সংকটেও এ প্রকল্পেও মাছ চাষ শিখতে বিদেশ ভ্রমণের আবদার করেছে সংস্থাটি। এতে খরচ হবে প্রায় ৬৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ২২ শতাংশই খরচ হবে বিদেশে প্রশিক্ষণে। তবে কতজন এ প্রকল্পের আওতায় কত দিনের প্রশিক্ষণে বিদেশ যেতে চান তা উল্লেখ করা হয়নি প্রকল্প প্রস্তাবে। পরিকল্পনা কমিশনের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট না হওয়ায় তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানান, এ মুহূর্তে বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হলেও অনেক মন্ত্রণালয়ই তাদের প্রকল্পে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রাখেন।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মৎস্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মূলত আসিয়ানের সঙ্গে সেক্টরাল ডেভেলপমেন্ট পার্টনার হওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কাজ করছে। আর পরিকল্পনা কমিশন যেসব মতামত দিয়েছে তা বিবেচনা করছে মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও যৌথভাবে কাজ করবে।
এ প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে আসিয়ান সদস্য রাষ্ট্র ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে দুটি কর্মশালা, বিদেশে প্রশিক্ষণ ও প্রতিবেদন জমা।
প্রকল্প প্রস্তাবে স্টক টেকিং প্রতিবেদন প্রণয়নের জন্য ৩ পরামর্শকের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। তিন পরামর্শক ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, কমিশন যে মতামত দিয়েছে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রকল্প প্রস্তাব আবার প্রস্তুত করা হবে।
বিশ্বের মোট মৎস্য উৎপাদনের ২০ শতাংশ আসিয়ান অঞ্চলে। ২০২০ সালে এ অঞ্চলের দেশগুলো এ খাত থেকে ১১ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি আয় করেছে। বাংলাদেশে মোট জনগণের প্রোটিন চাহিদার ৬০ শতাংশ সরবরাহ হয় দেশীয় উৎপাদন থেকে।
এএমএস এবং বাংলাদেশ উভয়েরই বিশ্বের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় সামুদ্রিক ইকোসিস্টেম রয়েছে। আসিয়ান অঞ্চলে বিশ্বের ৮০০টি রিফ বিল্ডিং প্রজাতির মধ্যে ৬০০টিরও বেশি আছে। এ অঞ্চলে ১ হাজার ৬৫০টিরও বেশি মাছের প্রজাতি রেকর্ড করা হয়েছে। বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর ৬৪টি বৃহৎ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের একটি। আসিয়ান সদস্য হলে এ বৃহৎ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র কাজে লাগাতে পারবে বাংলাদেশ।
এর আগে বাংলাদেশের মৎস্য খাতে সম্ভাব্য সহযোগিতা পেতে আসিয়ান সচিবালয় ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। আসিয়ান সচিবালয় এ লক্ষ্যে আসিয়ান-বাংলাদেশ কো-অপারেশন অব এগ্রিকালচার অ্যান্ড ফিশারিজ শীর্ষক একটি খসড়া তৈরি করেছিল। এ খসড়ার ভিত্তিতেই এ প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে।
আসিয়ান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দশটি রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্থা। এটি ১৯৬৭ সালের ৮ আগস্ট ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে, ব্রুনেই, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার এবং ভিয়েতনাম সদস্যপদ লাভ করে।
