হাইকোর্টের রায়

ভর্তিতে শিক্ষার্থী বিবাহিত কি না লিখতে বাধ্য নয়

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:৩৮ এএম

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সময় শিক্ষার্থীর বৈবাহিক অবস্থা জানতে চাওয়া অসাংবিধানিক ঘোষণা করে রায় দিয়েছে উচ্চ আদালত। শিক্ষার্থীকে তার বৈবাহিক অবস্থা লিখতে বাধ্য করা যাবে না বলে নির্দেশনা এসেছে হাইকোর্টের রায়ে। এ নিয়ে পাঁচ বছর আগে দেওয়া রুল যথাযথ ঘোষণা করে গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের তথ্য মতে, ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে ‘মেয়েটি এখন কী করবে?’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজশাহীতে ২০১৩ সালের জুনে ধর্ষণের শিকার হন দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। ধর্ষকের সঙ্গে মেয়েটিকে বিয়ে দিতে গ্রামের লোকজন চাপ দেন। এ নিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে সালিশ হলেও অভিযুক্ত ঘটনা অস্বীকার করে। অন্যদিকে প্রতিপক্ষের হুমকিতে প্রথম দিকে মামলা করতে পারছিলেন না ভুক্তভোগী। একপর্যায়ে সন্তান সম্ভবা হলে তাকে ভর্তি করা করা হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি)। ধর্ষণের মামলার পর পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে। ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণ হয় অভিযুক্ত ধর্ষকই ওই অনাগত সন্তানের বাবা। মামলার বিচার শুরু হলে আদালত ভুক্তভোগীকে ‘মহিলা সহায়তা কর্মসূচি’র রাজশাহী বিভাগীয় আবাসন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। সেখানে থাকা অবস্থায় মেয়েটির এসএসসি পরীক্ষা শুরু হলে পরীক্ষা চলাকালে ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি পুত্র সন্তান হয় তার।

আবাসনকেন্দ্রে থাকাবস্থায় এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ ৪.১৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় ওই শিক্ষার্থী। এরপর বাড়িতে গিয়ে ২০১৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ ৩.১৭ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। ২০১৭ সালের ৩০ মে ধর্ষণ মামলার বিচারের রায়ে আসামির যাবজ্জীবন কারাদ- ও ১ লাখ টাকা অর্থদ- হয়। একই সঙ্গে বিচারিক আদালতের রায়ে সন্তানের দায়ভার নিতে বলা হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এইচএসসি পাসের পর রাজশাহী সরকারি নার্সিং কলেজে ভর্তি হতে চান ওই শিক্ষার্থী। কিন্তু সন্তান হওয়ার কারণে বিবাহিত না হলেও তাকে বিবাহিত নারীর কাতারে ফেলা হয়েছে। তিনি নার্সিং কলেজের ফরমই পূরণ করতে পারবেন না। বিয়ে না করলেও তার সন্তান রয়েছে। তাকে এখন বিবাহিত নারী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। অথবা ফরমে তাকে স্বামী পরিত্যক্তা লিখতে হবে। কিন্তু মেয়েটি এর কোনোটিতেই পড়েন না। কলেজ কর্তৃপক্ষ জানায়, নিয়ম অনুযায়ী ভর্তি পরীক্ষার ফরমে ওই শিক্ষার্থীকে অবিবাহিত কিংবা স্বামী পরিত্যক্তা লিখতে হবে। তা ছাড়া সন্তান হওয়ার বিষয়টি পরীক্ষায় ধরা পড়বে। যেজন্য তাকে স্বামী পরিত্যক্তা লিখতে হবে ফরমে।

এই প্রতিবেদনটি যুক্ত করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন আইনজীবী ফারিয়া ফেরদৌস। শুনানি নিয়ে ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর রুল দেয় হাইকোর্ট। রুলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে বৈবাহিক অবস্থা জানতে চাওয়া কেন  অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না এবং এ বিষয়ে একটি অর্থপূর্ণ নীতিমালা করতে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না জানতে চায় হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অবিলম্বে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে নার্সিং কলেজে ভর্তি করতে নির্দেশ দেয় আদালত। চূড়ান্ত শুনানি শেষে গতকাল এ রায় হলো।

আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী অনিক আর হক ও আইনুন নাহার সিদ্দিকা। অ্যাডভোকেট আইনুন নাহার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীর ফরমে এ বিষয়টি ছিল বৈষম্যমূলক ও অসাংবিধানিক। হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে এই বৈষম্য ঘুচবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত