দানবীর সেজে গরিবের কোটি টাকা নিয়ে উধাও

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০১:৫৪ এএম

করোনার সময় ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে অসহায় মানুষদের কিছু সাহায্য করতে পারেননি কিশোরগঞ্জের ভৈরবের মামুন মিয়া (৪০)। এর জন্য এখনো অনুশোচনা হয় তার। বর্তমানে তার আর্থিক সমস্যা নেই, তাই আগের অনুশোচনা থেকে এলাকার কিছু গরিব মানুষের মাঝে বিনা মূল্যে চাল-ডাল বিতরণ করেন। পুলিশের সঙ্গে মামুন মিয়ার ভালো সম্পর্ক। পুলিশের ওপেন হাউজ ডের দিন তিনি শতাধিক মানুষ নিয়ে হাজির হন থানায়। এসব দেখে এলাকাবাসীর কাছে মামুন একজন দানবীর ও পরোপকারী হিসেবে আবির্ভূত হন। দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় এবার তিনি সরকারের কাছ থেকে সহায়তা এনে অর্ধেক দামে চাল, তেল, আলু, ডাল, চিনি বিক্রির প্রকল্প হাতে নেন। স্বরাষ্ট্র ও সমাজসেবা মন্ত্রণালয় থেকে তার কাছে অনুদান আসছে বলে নানাভাবে প্রচার করেন। এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে মামুনের বাড়িতে শত শত মানুষ ভিড় করতে শুরু করে। অর্ধেক দামে খাদ্যপণ্য দেওয়ার জন্য তিনি টোকেনের মাধ্যমে গরিব-দুস্থদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়া শুরু করেন। শুরুতে কিছু মানুষের কাছে ঘোষিত মূল্যে খাদ্যপণ্য তুলেও দেন। অধিক লাভের আশায় কেউ কেউ ১৫-২০ বস্তা চালের টাকাও অগ্রিম জমা দিয়ে যান। এভাবে এক মাসে হাজার পাঁচেক মানুষের কাছ থেকে তিনি প্রায় কোটি টাকা তোলেন। কিন্তু কে জানত অগ্রিম টাকা দিয়ে অর্ধেক দামে পণ্য পাওয়ার আশায় সবাই যখন দিন গুনছিল, মামুন তখন টাকা নিয়ে চম্পট দেওয়ার ক্ষণ গুনছিল। ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে মামুনের কোনো খোঁজ নেই। এলাকাবাসী এখন আহাজারি করছেন। ভুক্তভোগীদের কেউ হকার, কেউ রিকশাচালক, কেউ আচার বিক্রেতা, কেউবা দিনমজুর। কেউ ঋণ করে, কেউ কিস্তিতে টাকা তুলে দিয়েছেন।

স্থানীয়রা জানায়, উপজেলার কালিপুর উত্তরপাড়া ১২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি নীল মিয়ার বাড়িতে ভাড়ায় থাকতেন মামুন। তার কর্মকান্ড দেখে সবাই ভাবত তিনি পুলিশের কাছের লোক। নিজের ব্যবহৃত ভুয়া একাধিক ভিজিটিং কার্ড টোকেন হিসেবে ব্যবহার করতেন। ভৈরব পৌর শহরের পলতাকান্দা, চন্ডীবের, চানপুর, রাজনগর, আগানগর, গকুলনগরসহ আশপাশের গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ মামুনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ১০ ফেব্রুয়ারি টোকেনের তারিখ অনুযায়ী খাদ্যপণ্য আনতে গিয়ে লোকজন তার ঘর তালাবদ্ধ দেখতে পায়। সেই থেকে তিনি পলাতক।

জানা যায়, সরকারের কাছ থেকে সহায়তা এনে অর্ধেক দামে পণ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি দুটি প্যাকেজ ঘোষণা করেন। একটি প্যাকেজে ১ হাজার ২০০ টাকায় এক বস্তা (৫০ কেজি) চাল ও অন্য প্যাকেজে ৬৫০ টাকায় পাঁচ লিটার তেল ও দুই কেজি করে ডাল, চিনি ও আলু দেবেন।

সরেজমিনে মামুনের বাসায় গিয়ে ঘর তালাবদ্ধ দেখা যায়। সেখানে রতন নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘১ হাজার ২০০ টাকায় চালের বস্তা দেবেন বলে আমার কাছ থেকে ৬টি টোকেনে ৭ হাজার ২০০ টাকা নিয়েছেন মামুন। শুনেছি তিনি চাল আনতে গেছেন। কেউ কেউ বলাবলি করছে, পালিয়ে গেছেন। বেশ চিন্তায় আছি।’

ভুক্তভোগী শুঁটকি বিক্রেতা মুক্তা রানী দাস বলেন, ‘কম দামের চালের বস্তা পাওয়ার আশায় কিস্তিতে টাকা তুলে এক বস্তা চালের টাকা দিয়েছিলাম। এখন আমি কিস্তি দেব কীভাবে।’

বাসার মালিক যুবলীগ নেতা নীল মিয়া বলেন, ‘এক বছর আগে মামুন আমার কাছ থেকে জমি কেনেন। দোতলা বিল্ডিং নির্মাণকাজ চলাকালেই সেই জায়গা আমার কাছে পুনরায় বিক্রি করে দেন। পরে তিনি আমার বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবে

থাকছেন। সাত মাস আগে উপজেলার চানপুর গ্রামে বিয়ে করেন। তিনি নিজেকে কখনো সাংবাদিক, কখনো কমিউনিটি পুলিশের সদস্য পরিচয় দিতেন। ১০ ফেব্রুয়ারি সকালে কাজের মেয়ের কাছে চাবি দিয়ে চাল আনতে যাচ্ছেন বলে বের হন মামুন। এরপর আর ফেরেননি। তার মুঠোফোনও বন্ধ।’

পৌর মেয়র ইফতেখার হোসেন বেণু বলেন, ‘গত ২৯ জানুয়ারি জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল শেখ এক মতবিনিময় সভায় ভৈরবে আসেন। সেখানে মামুন দলবল নিয়ে থানা চত্বরে উপস্থিত হন। সভায় মামুনের বিষয়টি এসপির নজরে এনে প্রতারিত হওয়ার শঙ্কার কথা বলেছিলাম। কিন্তু কেউ সতর্ক হয়নি।’

এ বিষয়ে পুলিশ সুপার রাসেল শেখকে মুঠোফোনে কল দিলে তিনি টেক্সট করতে বলেন। পরে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে টেক্সট করলে তিনি উত্তর দেননি।

ভৈরব থানার ওসি মোহাম্মদ মাকছুদুল আলম বলেন, ‘বিষয়টি মৌখিকভাবে শুনেছি। তবে এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত