আল্লাহতায়ালা কেয়ামতের দিনকে বিভিন্ন নামে নামকরণ করেছেন। যেন মানুষ সেটাকে স্মরণে রেখে উপদেশ গ্রহণ এবং এ বিষয়ে চিন্তা করে। এগুলোর অন্যতম হলো- বিচার দিবস, ফায়সালার দিন, হিসাবের দিন, পরিতাপের দিন, মহাসমাবেশের দিন এবং পুনরুত্থান দিবস ইত্যাদি। যখন আল্লাহতায়ালা কেয়ামত সংঘটিত করার ঘোষণা দেবেন, তখন তিনি ফেরেশতা হজরত ইসরাফিলকে শিঙ্গায় ফুঁক দিতে আদেশ করবেন, সে শিঙ্গায় ফুঁক দেবে, আর তখনই মানুষের রুহগুলো উড়ে আসবে এবং এগুলোকে স্ব স্ব শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। ‘আর যখন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, তখনই তারা কবর থেকে ছুটে আসবে তাদের রবের দিকে।’ -সুরা ইয়াসিন : ৫১
তারপর মানুষের দেহ পচে-গলে নষ্ট হওয়ার পর উদ্ভিদ যেভাবে উৎপন্ন হয় সেভাবে তাদের দেহ তৈরি হবে। মানুষেরা তাদের কবর থেকে ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় উঠবে। আর সর্বপ্রথম যাকে তার কবর থেকে উত্থিত করা হবে তিনি হলেন আমাদের নবী (সা.)। তিনি বলেছেন, ‘আমি কেয়ামতের দিনে আদম সন্তানদের নেতা হব এবং আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।’ -সহিহ মুসলিম
যার মৃত্যু হয়েছে নেক আমল কিংবা বদ আমল করা অবস্থায় তাকে কেয়ামতের দিন ওই আমলের ওপর ওঠানো হবে। যাদের শাস্তি বা প্রতিদান ত্বরান্বিত করা হয়েছে, এমন কিছু মানুষকে মৃত্যুর সময় দুনিয়ায় সে যে আমলের মধ্যে ছিল ওই আমলের অবস্থায় তাকে ওঠানো হবে। কিছু শ্রেণির মুমিনদের আল্লাহতায়ালা তার ছায়ায় আশ্রয় দেবেন যেদিন তার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না। আর কাফেররা থাকবে অপমান, লাঞ্ছনা, আতঙ্ক ও ভীতির মধ্যে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা কবর থেকে বের হবে দ্রুতবেগে, মনে হবে তারা কোনো লক্ষ্যস্থলের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অবনত নেত্রে; হীনতা তাদের আচ্ছন্ন করবে।’ -সুরা আল-মাআরিজ : ৪৩-৪৪
কেয়ামতের দিন সূর্য এত নিকটবর্তী হবে যে, তার প্রখর তাপ তাদের কষ্ট দেবে এবং তারা আমল অনুপাতে ঘর্মাক্ত হবে। ফলে তাদের কষ্ট আরও বৃদ্ধি পাবে। মানুষ অসহনীয় ও চরম দুঃখ-কষ্ট এবং পেরেশানিতে নিপতিত হবে। যখন মানুষেরা দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করবে এবং এর কষ্ট তারা সইতে পারবে না, তখন তারা রবের কাছে তাদের জন্য সুপারিশকারী অনুসন্ধান করবে। যেন তিনি তাদের মধ্যে বিচার-ফায়সালার জন্য আগমন করেন। মানুষজন হজরত আদম (আ.), হজরত নুহ (আ.), হজরত ইবরাহিম (আ.), হজরত মুসা (আ.) এবং হজরত ঈসা (আ.)-এর কাছে আসবে; কিন্তু তারা সবাই সুপারিশে অপারগতা প্রকাশ করবেন। পরে তারা নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে আসবেন, তখন তিনি বলবেন, ‘আমিই এ কাজের জন্য।’ নবী করিম (সা.) আরও বলেন, ‘তখন আমি আরশের নিচে এসে আমার রবের সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ব। এরপর আল্লাহ বলবেন, হে মুহাম্মদ! তোমার মাথা ওঠাও। তুমি যা চাও তোমাকে দেওয়া হবে। তুমি সুপারিশ করো, তোমার সুপারিশ কবুল করা হবে। এরপর আমি মাথা উঠিয়ে বলব, ‘হে আমার রব! আমার উম্মত! আমার উম্মত!’
অতঃপর রাব্বুল আলামিন তার বড়ত্ব ও মহত্ত্বের সঙ্গে আগমন করবেন এবং তার বান্দাদের মধ্যে বিচার-ফায়সালা শুরু করবেন। সব মানুষকে তার কাছে এক লাইনে সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত করা হবে। তাদের রব তাদের সঙ্গে একান্তে কথা বলবেন, তাদের আমলসমূহের বিবরণ তাদের কাছে প্রকাশ করবেন এবং তাদের পাপের স্বীকারোক্তি আদায় করবেন। রাসুলদের তাদের উম্মতের বিপক্ষে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করা হবে, ফেরেশতাদের মধ্য থেকেও সাক্ষী দেবে, জমিন তার ওপর কৃতকর্মের সাক্ষী দেবে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার কর্মের বিষয়ে কথা বলবে।
লেখক ফেরেশতাদের হাতে যেসব আমলনামা ছিল তা প্রকাশ করা হবে। যা গোপন ছিল সেদিন তা প্রকাশ পাবে। বান্দা যা আমল করেছে এবং ভুলে গেছে তাও প্রকাশ করা হবে; কেননা আল্লাহতায়ালা ভুলেন না। বরং তিনি সেগুলোর হিসাব রাখেন অতঃপর তিনি তা প্রকাশ করবেন। ফলে বান্দা তার কোনো কিছুই অস্বীকার করতে পারবে না।
আল্লাহতায়ালা দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। তিনি স্বীয় ইচ্ছা এবং ক্ষমতাবলে একই সময়ে সব সৃষ্টিজীবের হিসাব গ্রহণ করবেন। আর সর্বপ্রথম বান্দার হিসাব গ্রহণ করা হবে আল্লাহর তওহিদ ও রাসুলের অনুসরণ বিষয়ে। অতঃপর নামাজ সম্পর্কে তার হিসাব নেওয়া হবে। এগুলো যদি সঠিক হয় তাহলে তার সমস্ত আমলই ঠিক বলে বিবেচিত হবে। আর এগুলো যদি বিনষ্ট হয় তাহলে সে ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চারটি বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হওয়ার আগ পর্যন্ত বান্দা সেদিনের অবস্থান থেকে তার পদযুগল সরাতে পারবে না। ‘তার আয়ু সম্পর্কে, সে তা কীসে ক্ষয় করেছে? তার জ্ঞান-বিদ্যা সম্পর্কে, সে তাতে কী আমল করেছে? তার মাল সম্পর্কে, কী উপায়ে তা উপার্জন করেছে এবং তা কোন পথে ব্যয় করেছে? আর তার দেহ সম্পর্কে, কোন কাজে সে তা ক্ষয় করেছে?’ -তিরমিজি
মানুষ হিসাবের সম্মুখীন হবে, তাদের কর্ম অনুযায়ী আমলনামা দেওয়া হবে। মানুষের আমল পরিমাপের জন্য মিজান বা পাল্লা স্থাপন করা হবে। যার পাল্লা ভারী হবে সেই সফল হবে এবং মুক্তি পাবে। পক্ষান্তরে যার পাল্লা হালকা হবে সে ধ্বংস হবে।
কেয়ামতের ময়দানে বড় ও প্রশস্ত হাউজ থাকবে যা দ্বারা আল্লাহতায়ালা নবী করিম (সা.)-কে সম্মানিত করবেন। যে ব্যক্তি হাউজ থেকে একবার পান করবে, সে আর কখনো তার পরে পিপাসার্ত হবে না। তবে হাউজ থেকে কিছু মানুষকে বাধা দেওয়া হবে আল্লাহর দ্বীনে বিদআত সৃষ্টির জন্য যে বিষয়ে তিনি অনুমতি দেননি। যখন আল্লাহতায়ালা বান্দাদের মধ্যে বিচার-ফায়সালা সমাপ্ত করবেন, তখন তারা ময়দান ছেড়ে জান্নাত অথবা জাহান্নামের দিকে রওনা হবে। মুমিন ও মুনাফিকদের তাদের ইমান অনুপাতে তাদের সামনে ও ডানে নূর প্রদান করা হবে। জাহান্নামের ওপর পুলসিরাত স্থাপন করা হবে। যা অত্যন্ত পিচ্ছিল, ফলে কিছু পা পিছলে যাবে। মানুষেরা তার ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে তাদের আমল অনুযায়ী। ফলে মুমিন ব্যক্তি চোখের পলকের মতো, বিদ্যুতের মতো, মুক্ত বাতাসের মতো, পাখির মতো এবং উত্তম অশ্বের মতো গতিতে পার হয়ে যাবে। তার ওপর বিশালাকৃতির হুক ও পেরেক থাকবে যা মানুষদের বিদ্ধ করবে। কেউ নিরাপদে মুক্তি পাবে, কেউ ক্ষতবিক্ষত হবে আবার কেউ জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
মুমিনরা যখন পুলসিরাত পার হয়ে যাবে তখন তারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে। অতঃপর তাদের জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি ব্রিজের ওপর দাঁড় করানো হবে এবং দুনিয়াতে তাদের পরস্পরের প্রতি জুলুমের কিসাস নেওয়া হবে। অবশেষে যখন তারা পাপ-পঙ্কিলতা মুক্ত হয়ে যাবে, তখন তাদের জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।
নিঃসন্দেহে কেয়ামত আসবে। আর কেয়ামতের দিন হলো- কঠিন, কষ্টকর ও দীর্ঘদিন। সেখানে রয়েছে বিপদের পর বিপদ। এর ভয়াবহতার কারণে শিশুদের মাথার চুলও শুভ্র হয়ে যাবে। আল্লাহতায়ালা তার নবীকে এই দিনের বিষয়ে উম্মতকে সতর্ক করতে নির্দেশ দিয়েছেন। বিচক্ষণ ওই ব্যক্তি যে এর জন্য সম্বল প্রস্তুত রাখে, এর কষ্টকর অবস্থা ও ভয়াবহতার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসে ও তওবা করে।
১৭ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান
