শ্রমিকদের সুবিধাদি বাড়াতে পোশাকের ন্যায্য দর জরুরি

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১১:৫৯ পিএম

তৈরি পোশাকের সরবরাহ চেইনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ শ্রমিকরা। অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। শোভন মজুরি তারা পায় না। স্বাস্থ্যগত নানান ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে তারা। এর জন্য দায়ী পশ্চিমা ব্র্যান্ড এবং ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা পোশাকের ন্যায্যমূল্য না দিলে এ দেশের কারখানা মালিকদের পক্ষে শ্রমিকদের বিভিন্ন সুবিধাদি বাড়ানো সম্ভব নয়।

তৈরি পোশাক খাতের নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত উন্নয়নবিষয়ক কর্মসূচি উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এমন মন্তব্য করেছেন সরকারের কর্মকর্তা এবং উদ্যোক্তা রপ্তানিকারকরা। পোশাক খাতের টেকসই উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে ন্যায্য দর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

নারী শ্রমিকদের পুষ্টিবিষয়ক প্রকল্পের প্রচারণাসংক্রান্ত এ অনুষ্ঠান গত সোমবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত হয়। নিট ক্যাটাগরির পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএ এ আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। তিনি বলেন, অর্থনীতির বড় খাত হিসেবে তৈরি পোশাককে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বর্তমানে এ খাতের নারী শ্রমিকদের ৪০ শতাংশ রক্তশূন্যতায় ভুগছে। এতে তাদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি কর্মজীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিকেএমইএর এ কর্মসূচির আগে যা ছিল ৬৫ শতাংশ। সে বিবেচনায় নারী শ্রমিকদের পুষ্টিবিষয়ক প্রকল্পটি একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বিকেএমইএ এ প্রকল্পে এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় শুরুর আগে এর আওতা আরও বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব তপন কান্তি ঘোষ বলেন, তৈরি পোশাকের সরবরাহ চেইনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং অবহেলিত অংশ হচ্ছে শ্রমিকরা। ব্র্যান্ড এবং ক্রেতারা এ সরবরাহ চেইনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। তাদের অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রবণতার কারণেই সরবরাহ চেইনে বৈষম্য তৈরি হয়। সাধারণ শ্রমিকরা বঞ্চিত হয়। তারা পোশাকের ন্যায্যমূল্য না দিলে এ দেশের কারখানা মালিকদের পক্ষে শ্রমিকদের বিভিন্ন সুবিধাদি বাড়ানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ন্যায্য দরের প্রসঙ্গ তুললেই তারা প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতির ধোয়া তোলে।

ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. ব্রেন্ড স্পেইনার বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রাণই হচ্ছে এ দেশের শ্রমিকরা। শ্রমিকদের ৬০ শতাংশ নারীর অর্ধেকেরও বয়স ২০-২৫ বছরের মধ্যে পুষ্টি ঘাটতি রয়েছে। অথচ জীবনের জন্য স্বাস্থ্যই প্রথম কথা। ইইউ বাংলাদেশের শ্রমিকদের সুস্থ দেখতে চায়। এ গুরুত্ব বিবেচনায় প্রকল্পে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

কানাডাভিত্তিক নিউট্রেশন ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান নির্বাহী জোয়েল স্পাইসার বলেন, শ্রমিকরা সুস্থ থাকলে তারা খুশি মনে কাজ করে। কারখানায় অনুপস্থিতির ঘটনা কম হয়। ফলে কারখানার মালিক কর্তৃপক্ষও সন্তুষ্ট থাকে। শ্রমিকদের অনুপস্থিতিতে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। টেকইস উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জন হতে পারে না। তবে নিট কারখানায় পরিচালিত কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমিকদের অপুষ্টি কমে এসেছে। এ সুফলের কারণেই দ্বিতীয় পর্যায়ে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, অপুষ্টির শ্রমিকদের কম উৎপাদনশীলতার সমস্যা রয়েছে শিল্পে। তাদের পুষ্টিসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সরকার, উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, শ্রমিকদের সুবিধাদি বাড়াতে ক্রেতা ব্র্যান্ডগুলোর কোনো সহানুভূতির প্রয়োজন নেই। তারা পোশাকের ন্যায্য দর দিলেই কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের পুষ্টিসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাড়াতে পারেন।

বিকেএমইএর সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জাতীয় পুষ্টি সেবা বিভাগের লাইন ডিরেক্টর ড. আবদুল মান্নান, বিকেএমইএর সহসভাপতি মনসুর আহমেদ। এ সময় বিভিন্ন কারখানার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

নিট খাতের নারী শ্রমিকদের রক্তস্বল্পতা দূর করা ও স্বাস্থ্য সচেতনতায় ২০১৯ সাল থেকে ন্যাশনাল নিউট্রিশন সার্ভিস (এনএনএস) ও নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনালের (এনআই) সঙ্গে যৌথভাবে নিউট্রিশন অব ওয়ার্কিং উইমেন প্রকল্প পরিচালনা করছে বিকেএমইএ। সভায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানো সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত