আল্লাহতায়ালা অনেক মানুষকে অনেক কিছু দিয়েছেন। কাউকে দিয়েছেন তীক্ষন মেধা, কাউকে দিয়েছেন বোঝার ক্ষমতা, কাউকে দিয়েছেন ধৈর্য ধরার ক্ষমতা। আল্লাহতায়ালা হজরত লোকমান হাকিমকে দিয়েছেন হেকমত বা প্রজ্ঞা।
লোকমান হাকিমের নসিহত বিভিন্ন কিতাবের পরতে পরতে পাওয়া যায়। একবার লোকমান হাকিম তার ছেলেকে নসিহত করে বলেন, ‘হে আমার ছেলে! কখনো আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না। কেননা এটা বড় জুলুম!’ আল্লাহতায়ালার কাছে এই নসিহত অনেক পছন্দ হয় এবং কালামুল্লাহ শরিফে তা তুলে ধরেছেন। উপরোক্ত নসিহত ছাড়া জীবন বদলে দেওয়ার মতো অসংখ্য নসিহত রয়েছে কিতাবে। সেখান থেকে কয়েকটি নসিহত সংকলন করা হলো
প্রথম : নামাজে দাঁড়ালে অন্তরের হেফাজত করা। আমরা যখন নামাজে দাঁড়াই তখন মনকে স্থির রাখা কষ্ট হয়ে পড়ে। আপনি একটা জিনিস হারিয়ে ফেললেন। খুঁজে পেলেন না। দেখা যায়, নামাজে দাঁড়াতেই মনে পড়ে, ‘ও আমি জিনিসটা অমুক জায়গায় রেখেছিলাম।’ শয়তান আপনার মনকে স্থির থাকতে দেয় না।
নামাজে দাঁড়ালেই মনে ভেসে উঠে সারা দিনের হিসাব। অনেকে নামাজে কাজের রুটিন তৈরি করে। যদি লেখক হয়, লেখার শিরোনাম, লেখার ধরন, লেখার ছন্দ ইত্যাদি মাথায় ঘুরপাক খায়। ডিজাইনার হলে ডিজাইন নিয়ে চিন্তা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর হলে কনটেন্টের চিন্তা মাথায় আসে। তখন ভালো ভালো আইডিয়া মাথায় আসে, যেটা অন্য সময় আসে না। মূলত সব শয়তানের ছলচাতুরী। এজন্য লোকমান হাকিম বলেন, ‘নামাজের সময় অন্তরের হেফাজত করো।’
দ্বিতীয় : খাওয়ার সময় হলকের হেফাজত করো। হলক বলা হয় খাদ্যনালিকে। অনেক সময় এমন হয়, তাড়াহুড়ো করে খেতে গিয়ে গলায় আটকে যায় অথবা ওপরে খানা উঠে নাক জ্বালাপোড়া করে। অনেক সময় মাথায় উঠে যায়। মাছ খেতে গিয়ে গলায় কাঁটা আটকে যায়।
একটু অসতর্কতা অনেক বড় বিপদ ডেকে নিয়ে আসতে পারে। এজন্য লোকমান হাকিম (রহ.) খাওয়ার সময় হলকের হেফাজত করতে বলেছেন। হলকের হেফাজত মানে আস্তে-ধীরে খাওয়া, তাড়াহুড়ো না করা।
তৃতীয় : অন্যের ঘরে চোখের হেফাজত করো। আমাদের একটা বদ-অভ্যাস হলো, কারও ঘরে গেলে চোরের মতো এদিক-ওদিক তাকানো, যে কারোর বেডরুমে চলে যাওয়া, যে কারোর ঘরে অনুমতি ছাড়া রান্নাঘর পর্যন্ত চলে যাওয়া। এই অভ্যাসটা আমাদের থেকে দূর
করা উচিত।
কারণ আপনি যে ঘরে প্রবেশ করেছেন তার পরিজনরা চায় না, আপনি তাদের বেডরুমে যান কিংবা রান্নাঘরে যান হয়তো আপনাকে মুখে বলতে পারছে না। তাদের ঘরে প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে থাকতে পারে কিংবা মা-বোন-বিবি থাকতে পারে। পরিজনদের কাপড় ঠিক না-ও থাকতে পারে। আপনার এদিক-ওদিক তাকানোতে তারা বিব্রতবোধ করতে পারে।
অনেক সময় ঘরে এমন কিছু জিনিস এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে যা আপনার চোখে পড়লে একটা বিব্রতকর অবস্থা তৈরি হতে পারে। তাই আমাদের উচিত, যে কাজের জন্য যাওয়া সে কাজ অতিদ্রুত শেষ করে ফিরে আসা। লোকমান হাকিম বললেন, অন্যের ঘরে যেন চোখের হেফাজত করে। আপনার জন্য তারাও যেন লজ্জিত না হয় আপনিও যাতে লজ্জিত না হন!
চতুর্থ : লোকালয়ে জবানের হেফাজত করো। লোকালয়ে কথা বলার সময়, ভাষণ দেওয়ার সময় জবানকে সংযত রাখার চেষ্টা করবেন। আপনার অসতর্কতায় মুখ দিয়ে বের হওয়া একটা শব্দ কিন্তু আপনার ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলতে পারে। মন্ত্রীপদ থেকে বহিষ্কৃত হতে পারেন, চাকরিচ্যুত হতে পারেন। বর্তমান মিডিয়ার যুগ, ভাইরাল হতে বেশি সময় লাগবে না।
লোকমান হাকিম (রহ.) যখন এই নসিহত করেছিলেন, তখন না ছিল মোবাইল, না ছিল মিডিয়া। তিনি এ বিষয়টি তখনই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এ ছাড়া বেশি বকবক করা নিজের মান-মর্যাদারও ক্ষুন্ন হয়।
পঞ্চম : মৃত্যুকে এক মুহূর্তের জন্য না ভোলা। মানুষ দুনিয়ার পেছনে ছোটা তখন বন্ধ করবে, যখন মৃত্যুর কথা স্মরণ থাকবে। কারণ সে জানে মৃত্যুই সমাপ্তি নয়, বরং মৃত্যুই হলো প্রবেশের মূল ফটক।
ষষ্ঠ : আল্লাহকে স্মরণ করো। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’সুরা বাকারা : ১৫২
যার অন্তরে সর্বদা আল্লাহর জিকির থাকবে, যার জিহ্বা সর্বদা আল্লাহর জিকিরে ব্যস্ত থাকবে, আল্লাহতায়ালা তাকে প্রিয় বান্দাদের কাতারে শামিল করে নেবেন। তার জন্য দুনিয়া-আখেরাত সহজ করে দেবেন।
সপ্তম : এহসান করলে সেটা একেবারের জন্য ভুলে যাও। মানুষের অভ্যাস হলো, দশ টাকা দিয়ে একশ টাকার খোঁটা দেওয়া। কেউ কারও কাছে সহজে হাত পাতে না, অভাবে পড়ে কিংবা বিপদে পড়ে মানুষ সাহায্য চায়। আর আপনি এহসান করে সবার সামনে আবার খোঁটা দিচ্ছেন। অথচ আপনার ওপর আল্লাহ কত এহসান করেছেন, সে ব্যাপারে আপনি বেখেয়ালি, অকৃতজ্ঞ!
অষ্টম : কেউ আঘাত দিলে ভুলে যাওয়া। ধরুন আপনাকে কেউ আঘাত দিল, আপনি তার প্রতিশোধ নিতে মরিয়া। আপনি ভেতরে-ভেতরে সেটা পুষে রেখেছেন, পুষে পুষে বড় করেছেন। যেই সুযোগ পাবেন, প্রতিশোধ নিয়ে নেবেন। প্রতিশোধ নিতে গিয়ে হাতাহাতি হলো, অজ্ঞতাবশত আপনার আঘাতে তার প্রাণ গেল। পরিশেষে আপনার ফাঁসি হলো। এতে কার লাভ হলো?
যদি আপনি এটাকে তখন উড়িয়ে দিতেন, আপনি এটাকে নিজের ভেতর না পুষতেন, আজ এই পরিণতি হতো না। দুটি প্রাণ, দুটি ঘর, দুটি সংসার হতো সুখের। আল্লাহতায়ালা সবাইকে বোঝার তৌফিক দিন। আমিন।