রমজানের প্রস্তুতির নানা দিক

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৩, ১২:৩৯ এএম

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজব মাসের শুরু থেকেই রমজানের প্রস্তুতি নিতেন এবং সাহাবাদেরও এর নির্দেশ দিতেন। পূর্ববর্তী আলেমদের জীবনে পাওয়া যায়, তারা বছরের প্রথম ছয় মাস রমজানের প্রস্তুতি নিতেন, আর বাকি ছয় মাস আমল কবুলের দোয়া করতেন। রমজান আসন্ন। রমজানের প্রস্তুতি সম্পর্কে আজকের আলোচনা।

ব্যক্তিগত প্রস্তুতি

সতর্ক হওয়া : শাবানের আগে ও পরে দুটি মহিমান্বিত মাস (রজব ও রমজান) থাকায় অনেক সময় শাবানের ব্যাপারে ঔদাসীন্য দেখা যায়। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘শাবান মাস সম্পর্কে মানুষ উদাসীন।’ তাই শাবান মাসের আমলসমূহের ব্যাপারে অবহেলা না করে আরও বেশি সজাগ ও যতœবান হওয়া উচিত।

তওবা ও ইস্তেগফার : রমজান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও জান্নাত লাভের মাস। রমজান আসার আগে সব ধরনের গোনাহ থেকে পবিত্র হওয়া জরুরি। কারণ গোনাহের আধিক্য আমলের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে। ইমাম ফুজাইল (রহ.) বলেন, ‘যদি তুমি দিনে রোজা রাখতে ও রাতে কিয়াম (নামাজ) করতে না পারো তবে ধরে নাও বন্দি; তোমার গোনাহ তোমাকে আবদ্ধ করে রেখেছে।’ বিশেষত বান্দার হক (মানুষের অধিকার) সম্পর্কিত কোনো বিষয় থাকলে রমজান আসার আগেই তা মিটিয়ে ফেলা জরুরি।

দোয়া করা : ক্ষণস্থায়ী এই জীবনের প্রদীপ যেকোনো সময় নিভে যেতে পারে, তাই রমজানপ্রাপ্তির জন্য বেশি বেশি দোয়া করা। বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) রজব মাস এলে এই দোয়া পড়তেন ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবান ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।’ অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি রজব ও শাবান মাসে আমাদের (জীবনে) বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।

কাজের ব্যস্ততা কমানো : রমজান এলেই বিভিন্ন পেশার মানুষ তাদের কাজকর্মে প্রচুর ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এমনকি এই ব্যস্ততার দরুন অনেক সময় বিভিন্ন ফরজও ছুটে যায়। তাই এখন থেকেই কাজের রুটিন করে ব্যস্ততা কমিয়ে আনা জরুরি। ইমাম আমর ইবনুল কাইস (রহ.) শাবান মাস শুরু হলে দোকান-ব্যবসা বন্ধ করে কোরআন মজিদ তেলাওয়াতে মগ্ন হতেন।

রমজানের মাসয়ালা সম্পর্কিত ইলম অর্জন : কোনো কাজের মর্যাদা ও লাভ জানা থাকলে সেই কাজের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। এজন্য নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থ থেকে রমজানের বিভিন্ন আমলের ফজিলত বারবার পাঠ করা উচিত। পাশাপাশি রোজা, তারাবি, সাহরি, ইফতার ও জাকাত-সদকাসহ অন্যান্য বিষয়ের প্রয়োজনীয় আহকাম ও মাসায়েল জানা আবশ্যক। এজন্য এখন থেকেই অভিজ্ঞ আলেম-মুফতির তত্ত্বাবধানে ‘রমজানের মাসয়ালা’ শিক্ষা শুরু করা যেতে পারে।

পারিবারিক প্রস্তুতি

রমজানের গুরুত্ব শেখানো : হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের অধীনস্থদের ব্যাপারে (কেয়ামতের দিন ) জিজ্ঞাসিত হবে।’ পরিবারের কর্তাব্যক্তি পরিবারের সদস্যদের আর্থিক-সামাজিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় অগ্রগতিরও দায়িত্বশীল। তাই পরিবারের ছোট-বড় সবাইকে রমজানের আগেই এর গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় মাসয়ালা শেখানো আবশ্যক। পাশাপাশি আমলের তদারকি করা ও সাংসারিক ব্যস্ততায় যেন কোনো আমলে ঘাটতি না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা।

কাজা রোজা আদায় : শরিয়ত অনুমোদিত কোনো সমস্যার কারণে রমজান মাসে রোজা ভাঙার অনুমতি রয়েছে। শরিয়ত অনুমোদিত ওজর (সমস্যা) বলতে মারাত্মক অসুস্থতা, মাসিক ঋতুস্রাব, প্রসবকালীন স্রাব ও সফরজনিত কারণকে বোঝানো হয়েছে। অনেককে এই কাজা রোজা আদায় করতে অলসতা দেখায়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রমজান মাসে আমার যে রোজাগুলো ছুটে যেত পরবর্তী শাবান মাসের মধ্যেই আমি তা কাজা করে ফেলতাম।’সহিহ বোখারি

তাই যাদের রোজা কাজা রয়েছে রমজান আসার আর্গেই সেগুলো আদায় করে নেওয়া উচিত।

সাংসারিক রুটিন ও কর্মবণ্টন : রমজান মাসে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও সমানভাবে ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল হওয়া উচিত। মহিলা সাহাবি, তাবেয়িদের জীবনীতে এমনি দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে সাংসারিক ব্যস্ততার দরুন অনেক নারীই পর্যাপ্ত ইবাদতের সময় বের করতে পারেন না। এমনকি অনেকের তারাবির বিশ রাকাত বা কোরআনের খতমও পূর্ণ হয় না। তাই এখন থেকেই দৈনন্দিন রুটিন বানিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা ও কর্মবণ্টনের মাধ্যমে কাজ সহজ করে নেওয়া দরকার। এর সঙ্গে রমজানের প্রয়োজনীয় কেনাকাটাও আগেভাগে সেরে ফেলা উচিত, যাতে এ জন্য কোনো পবিত্র রজনী নষ্ট না হয়।

বাসাবাড়ির কাজের লোক ও কর্মক্ষেত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রেও একই কথা। দায়িত্বের চাপে যেন তাদের রোজার কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে যতœবান থাকা প্রয়োজন।

সামাজিক প্রস্তুতি

রমজানকে স্বাগত জানিয়ে নানা আয়োজন হয় আমাদের দেশে। রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনগুলো পোস্টার-লিফলেট ছাপায়। দ্রব্যমূল্য কমানো, অশ্লীলতারোধসহ বিভিন্ন দাবি ও পয়গাম থাকে সেসব পোস্টারে...!

অনেকে বুকে সাদা পোশাকে ‘স্বাগতম মাহে রমজান’ লিখে রাস্তায় র‌্যালি বের করে। কখনো এসব র‌্যালি ব্যস্ত নগরীর প্রচণ্ড জ্যামে অতিষ্ঠ জনগণের ভোগান্তি আরও কিছুক্ষণ বাড়িয়ে দেয়। আসলে কী উপায়ে রমজানকে স্বাগত জানানো উচিত আমাদের?

দাওয়াতি কর্মসূচি : মুসলিমপ্রধান দেশ হলেও দুঃখজনক সত্য, দেশের অনেক মানুষ রমজানের রোজা রাখে না। এতে কিশোর-যুবকের পাশাপাশি শারীরিক শ্রম দিয়ে খেটে-খাওয়া মানুষদের (রিকশাওয়ালা, দিনমজুর ও হেলপার) সংখ্যাই বেশি। দ্বীন বিষয়ে অজ্ঞতা ও কাজের অজুহাতে তারা রোজা রাখেন না। এসব মানুষের কাছে গিয়ে রোজা-নামাজের গুরুত্ব শেখানো আবশ্যকীয় কর্তব্য। দাওয়াতের সর্বজনীন কর্মসূচির মাধ্যমে এখন থেকেই তা শুরু করা উচিত।

সামাজিক কর্মসূচি : বরকত ও প্রাচুর্যের মাস রমজানকে একশ্রেণির ব্যবসায়ী মহল বিভীষিকাময় করে তোলে। তাদের মাত্রাতিরিক্ত মুনাফালোভের শিকার সাধারণ রোজাদার মুসলমান। অন্যদিকে রাস্তার মোড়ে বা বস্তির কোনায় দিনের বেলা যারা কাপড় টানিয়ে হোটেল চালানোর প্রস্তুতি শুরু হয় শবেবরাতের পর থেকেই। রমজানকে স্বাগত জানিয়ে এক দিনের র‌্যালি-মিছিলের পরিবর্তে এখন থেকেই এসব অনৈতিকতা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনসহ সবশ্রেণির দ্বীনদার মুসলমানদের এতে অংশগ্রহণ থাকা উচিত।

শেষ কথা

হাদিসে এসেছে, ‘বছরের নির্দিষ্ট কিছুদিন তোমাদের জন্য তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে বিশেষ উপহার রয়েছে। তাই সেই উপহার গ্রহণে তোমরা সচেষ্ট হও।’ ইমাম আবু বকর বালখি (রহ.) বলেন, ‘রজব হলো বীজ রোপণ, শাবান হলো সেচ দেওয়া ও রমজান হলো ফসল কাটার মাস। তাই যে রজবে বীজ রোপণ করেনি, শাবানে সেচ দেয়নি সে কীভাবে রমজানে ফসল কাটবে? আল্লাহতায়ালা সবাইকে বিষয়গুলো অনুধাবনের তৌফিক দান করুন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত