সংস্কৃতিচর্চার নিরাপদ পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব রাষ্ট্রের

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২৩, ০২:০১ এএম

রামেন্দু মজুমদার। দেশের পথিকৃৎ সাংস্কৃতিক সংগঠক। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অনেক সংগঠনই গড়ে উঠেছে তার চিন্তা থেকে। ৫০ বছর পেরিয়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতির বিকাশে বা জনরুচি তৈরিতে সাংস্কৃতিক সংগঠন কতটা ভূমিকা রাখতে পেরেছে? এই বিষয় নিয়ে থিয়েটারবিষয়ক পত্রিকা ক্ষ্যাপার সম্পাদক পাভেল রহমানের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। আলাপচারিতার কিছু অংশ দেশ রূপান্তর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

৫০ পেরিয়েছে বাংলাদেশ। সংস্কৃতির বিকাশে সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভূমিকা কতটুকু?

আজকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি যে জায়গায় দাঁড়িয়েছে, তার পেছনে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও তাদের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের একটা বড় ভূমিকা আছে। থিয়েটার, চিত্রকলা, নৃত্য, আবৃত্তি, সংগীতসহ শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে কিন্তু বড় একটা বিকাশ ঘটেছে। তবে আমরা ব্যাপকভাবে তৃণমূলপর্যায়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে ছড়িয়ে দিতে পারিনি। এটা ব্যর্থতার জায়গা। এর দায় আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর যেমন আছে, সরকারেরও দায় আছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, শিল্পকলা একাডেমি এ ক্ষেত্রে যে ভূমিকা রাখার কথা ছিল, সেটি করতে পারেনি। শিল্পকলা একাডেমি প্রসঙ্গে আমি বলব, তারা বেশি উৎসাহী হচ্ছে উৎসবে। গুণগত মানের চেয়েও সংখ্যার দিকে বেশি মনোযোগ তাদের। কে কত বেশি দেখাতে পারি, সেটাই যেন মুখ্য। কিন্তু যে উৎসব হচ্ছে তার প্রভাব জনসমাজে কী রকম হচ্ছে, তার ব্যাপারে ভাবছে না।

তৃণমূলপর্যায়ে কেন সংস্কৃতিচর্চা সংকুচিত হচ্ছে বলে মনে করেন?

তৃণমূলে সংস্কৃতিচর্চার জন্য জায়গা তৈরি করা জরুরি। অন্তত সব উপজেলায় সংস্কৃতি কেন্দ্র করা জরুরি। আমরা অবশ্য সংস্কৃতি কেন্দ্র মানে বিশাল কমপ্লেক্স ভেবে ফেলি। আমি ব্যয়বহুল কোনো জায়গা চাই না, স্বল্পব্যয়ে সব সংগঠন যেন একটা জায়গায় মিলিত হতে পারে, তেমন জায়গা দরকার। যেখানে উন্মুক্ত মঞ্চ, একটা আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন মিলনায়তন থাকবে। আমাদের পাড়ায় পাড়ায় যেমন সংগঠন-ক্লাব আছে, তাদের প্রণোদনা দেওয়া দরকার।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় তো প্রতি বছরই বিভিন্ন সংগঠনকে অনুদান দিচ্ছে।

হ্যাঁ, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় প্রতি বছর কিছু সংগঠনকে অনুদান দেয়। সেটা আসলে কাজে লাগছে না। কারণ স্থানীয় সংসদ সদস্য বা ডিসি সাহেবের রেফারেন্স নিয়ে যে কেউ এই অনুদানটি পাচ্ছে। যে প্রক্রিয়ায় অনুদান দেওয়া হচ্ছে তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না। বাস্তবে যেসব সংগঠন কাজ করছে তারা অনেকে অনুদান পাচ্ছে না। যেসব সংগঠনের অস্তিত্ব নেই, এমন অনেক সংগঠনও অনুদান পাচ্ছে। লোকশিল্পীদের আমরা খুবই অবহেলা করি। আমাদের লোকশিল্পীরা যুগ যুগ ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যেভাবে শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। তারা এমপি সাহেব, ডিসি সাহেবকে চেনে না। এজন্য এসব অনুদান থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। লোকশিল্পীদের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো দরকার। তাদের প্রণোদনা দেওয়া দরকার। শুধু আর্থিক প্রণোদনা নয়, তাদের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। বিভিন্ন জায়গায় আমরা দেখি বাউলদের ওপর হামলা হয়, তাদের ওপর আক্রমণ করা হয়। সামাজিকভাবে তাদের হেয় করা হয়। সেসব জায়গায় রাষ্ট্রকে নিরাপত্তার হাতিয়ার হয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। সেই সঙ্গে আর্থিক প্রণোদনাও দিতে হবে। তাদের উচ্চতর প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা দরকার এবং লোকশিল্পকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার উদ্যোগও নেওয়া দরকার। আমরা যদি গোটা বাংলাদেশকে নিয়ে না ভাবি, শুধু ঢাকা শহরের সংস্কৃতিচর্চা দেখে বাংলাদেশের সংস্কৃতিচর্চাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব না।

ইদানীং আমাদের জনরুচি নিয়ে এক ধরনের প্রশ্ন উঠছে। হিরো আলম যেমন এখন জাতীয় ‘আইকন’ হয়ে উঠছে। এই বিষয়গুলো কীভাবে দেখেন?

মানুষকে যদি ভালো কিছু না দেওয়া যায়, তবে মানুষ তো হিরো আলমের দিকেই ঝুঁকবে। আমাদের চলচ্চিত্র, নাটক এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পথকে নানাভাবে সংকুচিত করা হয়েছে। গ্রামে যাত্রাপালা, মেলা-বান্নিসহ নানা লোকজ অনুষ্ঠানকে বাধা দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। সিনেমা হল নেই, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নেই। বিনোদন কেন্দ্র নেই। কিন্তু মানুষ তো বিনোদন খুঁজে নেবেই। আমাদের সুস্থ বিনোদন বা সংস্কৃতির মাধ্যমগুলোর পথকে খুলে দিতে হবে। ভালো সিনেমা, নাটক, যাত্রাপালার জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তবে সেভাবেই জনরুচির বিকাশ ঘটবে।

নব্বই দশক বা তার আগে শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতিতে ‘আইকন’ ছিল। যাদের দেখে দেখে পরের প্রজন্ম ভাবতে পারত তাদের মতো হব। এখন সেই আইকন বা আদর্শিক চরিত্র নেই কেন?

আইকন হওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা-নিষ্ঠার প্রয়োজন। তরুণদের মধ্যে তাড়াহুড়ো বেশি। তারা একসঙ্গে অনেক কিছু করত চায়। একটা আদর্শকে নিয়ে দীর্ঘ চর্চা, সাধনার মধ্য দিয়ে ‘আইকন’ হওয়া যায়। শুধু পত্রিকায় ছবি ছাপা হবে, টেলিভিশনে মুখ দেখাব সেটা হলে তো হবে না। নিরলসভাবে নিজের মতাদর্শকে ধারণ করে পরিশ্রম করে যেতে হবে।

বিভিন্ন জেলা বা উপজেলা শহরে তো সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স বা মিলনায়তন আছে। কিন্তু বেশি ভাড়া হওয়ার কারণে সেগুলো ব্যবহার করছে না স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।

হ্যাঁ, এটা একটা বড় বিষয়। আমরা বিশাল কমপ্লেক্স বানাচ্ছি। কিন্তু সেখানে এত বেশি ভাড়া গুনতে হয় যে স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা সেটি ব্যবহার করতে যান না। সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনকে বুঝতে হবে শিল্পকলা কমপ্লেক্সগুলো ব্যবসা নয়। সেখান থেকে লাভ করতে হবে, এমন ধারণা পাল্টাতে হবে। এসব সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স বা মিলনায়তনের ভাড়া ভর্তুকি দিয়ে কমাতে হবে। এটা জনরুচি তৈরির ক্ষেত্রে এক ধরনের বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। ঢাকায় জাতীয় নাট্যশালায় কম টাকায় মিলনায়তন বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, কারণ সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। এভাবে সারা দেশেই সরকারি মিলনায়তনে ভর্তুকি দিয়ে ভাড়া কমাতে হবে।

কিন্তু সরকারের ভর্তুকি দেওয়া জাতীয় নাট্যশালায় তো ঢাকার অনেক নাট্যদল এক হাজার টাকায় টিকিট বিক্রি করে নাটক করছে। এতে করে কি নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে? জাতীয় নাট্যশালা কি উচ্চবিত্তের বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে?

এখনকার বাস্তবতায় নাটকের টিকিট ৫০০ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়। তবে নাটকের টিকিট এক হাজার টাকায় বিক্রি হলে সেটা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে ১০০ টাকার টিকিটও থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। যেহেতু জাতীয় নাট্যশালায় সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। কেউ যদি বেসরকারি কোনো মিলনায়তন বা বাণিজ্যিক স্পেস ভাড়া নিয়ে নাটকের প্রদর্শনী করে এবং যথাযথ নিয়ম মেনে চড়া দামে টিকিট বিক্রি করে, সেটা তারা করতে পারে। কিন্তু জাতীয় নাট্যশালায় সব শ্রেণির মানুষ এবং শিক্ষার্থীরাও যেন নাটক দেখতে পারে তার ব্যবস্থা থাকা উচিত। হ্যাঁ, এটা সত্য এখন নাট্যদলগুলোর অনেক খরচ করতে হয় প্রদর্শনীতে। এর জন্য সরকারি ভর্তুকি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু মিলনায়তনে নিম্ন আয়ের মানুষও যেন আসতে পারে তার সুযোগ থাকতে হবে। কেউ পেশাদার থিয়েটার করতে চাইলে, তাকে বাণিজ্যিক স্পেসেই যাওয়া উচিত। এতে করে পেশাদার থিয়েটার চর্চারও নতুন স্পেস তৈরি হবে। বাণিজ্যিক স্পেসে পেশাদার থিয়েটার চর্চার বিকাশেও সরকারি প্রণোদনা থাকা উচিত। জাতীয় নাট্যশালা বাণিজ্যিক স্পেস হওয়া উচিত নয়, এটা সব শ্রেণিপেশার মানুষের থাকা উচিত। এখানে কীভাবে কম টাকায় সব মানুষ একসঙ্গে বসে নাটক দেখতে পারে তার জন্য সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হবে।

জাতীয় নাট্যশালায় মিলনায়তন বরাদ্দ পেতে এখন বিভিন্ন নাট্যদলকে তদবির করতে হয় বা গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, সাংস্কৃতিক জোটের অনুগত হতে হয় বলে অভিযোগ আছে। এতে করে সংগঠন কি শিল্পচর্চার প্রতিবন্ধক হয়ে যাচ্ছে কি না?

হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রে এমনটা হচ্ছে। শুক্রবার বা ছুটির দিনগুলোতে নাট্যশালায় মিলনায়তন বরাদ্দ পেতে রীতিমতো হল বরাদ্দ কমিটির কাছে তদবির করতে হয়। এর কারণ আসলে ঢাকা শহরে মিলনায়তন সংকট। ধানমণ্ডি, উত্তরা, মিরপুরে যদি মিলনায়তন থাকত, তবে এমনটা হতো না। এখন ঢাকার সব সংগঠনই নাট্যশালা মিলনায়তন বরাদ্দ পেতে চায়। এর জন্য ঢাকায় মিলনায়তন বাড়াতে হবে।

ধানমণ্ডি, উত্তরায় মিলনায়তন হলে সেটি ব্যবহারের সক্ষমতা কি স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর আছে? পুরান ঢাকায় যেমন জহির রায়হান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র করা হয়েছে। সেটি ব্যবহার হচ্ছে না। কারণ, স্থানীয় সংগঠনগুলো সক্রিয় নয়।

হ্যাঁ, পুরান ঢাকার হলটিতে এখন তেমন কিছু হচ্ছে না। এর কারণ কিন্তু অতিরিক্ত ভাড়া এবং নাটকের সুযোগ-সুবিধার অভাব। ধানমন্ডিতে যেমন ছায়ানট মিলনায়তন আছে। কিন্তু তারা নাটকের দলকে মিলনায়তন বরাদ্দ দিতে চায় না। ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, মিরপুর, গুলশান-বনানী, বনশ্রীতে সরকারি উদ্যোগে মিলনায়তন করতে হবে এবং সেসব মিলনায়তন ভর্তুকি দিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে। তখন জাতীয় নাট্যশালার ওপর চাপ কমবে।

আপনাকে ধন্যবাদ।

তোমাকেও ধন্যবাদ। দেশ রূপান্তর পাঠকদের শুভেচ্ছা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত