সন্ত্রাসী, ফেনসিডিল এবং আগারগাঁওয়ের নির্জন টিলা

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৩, ১০:১৬ পিএম

২০০০ সাল। শুরুর দিকের কথা। তখন নিয়মিতভাবে এটিএন বাংলায় প্রচারিত হচ্ছে অপরাধ বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘মুখ ও মুখোশ’। সেই হিসেবে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের প্রথম ক্রাইম অনুষ্ঠান। গ্রন্থনা, উপস্থাপনা এবং পরিচালনার দায়িত্বে ছিলাম আমি। পাক্ষিক হিসেবে অনুষ্ঠানটি নিয়মিত প্রচারিত হতো। এ ক্ষেত্রে সেই সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রয়াত মো. নাসিম ভাইয়ের একান্ত সহযোগিতা মনে রাখার মতো। আর এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমানের আন্তরিক সহযোগিতা ও সমর্থনে মুক্তভাবে কাজ করতে পেরেছি। একদিকে জনকণ্ঠের বিনোদন পাতার দায়িত্ব, বিটিভিতে সংবাদ পাঠ এবং অন্যদিকে তখন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) সাধারণ সম্পাদক। এর বাইরে আবার এটিএন বাংলার অনুষ্ঠান। স্বাভাবিকভাবেই দিন-রাত পরিশ্রম করতে হতো। মোটেও সময় পেতাম না। যে কারণে ‘মুখ ও মুখোশ’ অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হতো পাক্ষিক হিসেবে।

অনুষ্ঠানের বিষয় নির্বাচনের পর, এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানাতাম। সমস্যা হতো না। কিন্তু ‘ফেনসিডিল’ পর্ব নিয়ে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা শুনে, সেই সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন

এত ফেনসিডিল পাইবা কই?

জি, পাব। আস্তানা জেনেছি। শুনেছি, সেখানে প্রায় ৪০-৫০ হাজার বোতল মজুদ আছে।

কোথায়, বলো?

ক্ষমা করবেন, ভাই। এটা বলতে পারব না। ওদের কথা দিয়েছি। না হলে, আমাকে মেরে ফেলবে।

কিচ্ছু হবে না, আমাকে বলো।

প্লিজ, ভাই।

একপর্যায়ে নাসিম ভাইকে বলতে বাধ্য হলাম। কিন্তু সব না। শুধু বললাম ফার্মগেট, আগারগাঁও, তালতলা, শেওড়াপাড়া, কাজিপাড়া, মিরপুর-১০, মাজার রোড আর গাবতলীর মধ্যে এটা আছে। সোর্স দিয়ে বের করেন।

তিনি হাসলেন। বললেন তুমি তো, ঢাকা শহরের ৪ ভাগের ১ ভাগ বললা। এইটা আমিও জানি। স্পেসিফিক জায়গাটা বলো।

হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলাম। তিনি হাসলেন। বললেন আচ্ছা, তোমার কাজ করো। সিকিউরিটি নিয়ে চিন্তা করো না।

ভাই, সেদিন সিকিউরিটি লাগবে না। পরে আপনার সিকিউরিটির লোক, সব বলে দেবে।

তিনি হাসলেন। বললেন, ঠিক আছে। কোনো সমস্যা হলে তুমি ‘বেনু’কে (এপিএস) বলো।

আমাদের বাসা, পশ্চিম শেওড়াপাড়া। শ^শুরবাড়ি পূর্ব শেওড়াপাড়ার ইব্রাহিমপুর। সেখানে কালা জাহাঙ্গীর, আব্বাসের আস্তানা। মিরপুর ১০ থেকে ১৪ নম্বর হয়ে, কচুক্ষেত পর্যন্ত ওদের নিয়ন্ত্রণ। আবার পশ্চিম শেওড়াপাড়া শামীম, প্রকাশ-বিকাশ, জুলু, বাকীর নিয়ন্ত্রণে। যেহেতু আমাদের বাসা পশ্চিমে, ফলে জুলু আর বাকীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলি। মূলত উদ্দেশ্য ছিল, অন্ধকার জগতের তথ্য নেওয়া। ওরাও সহযোগিতা করত। পরবর্তী সময়ে, আগারগাঁওয়ের আরেক সন্ত্রাসীর গুলিতে মারা যায় শামীম।

যাই হোক। তখন শুধু শেওড়াপাড়া না, পুরো ঢাকা শহরেই সন্ত্রাসীর রাজত্ব। পুলিশ কর্তৃপক্ষ যদিও শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা করেছে, কিন্তু উল্লেখ করার মতো কেউ তখনো গ্রেপ্তার হননি। এমনি এক পরিস্থিতিতে, ফেনসিডিল পর্ব শুটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিলাম। নিজস্ব সোর্সের তথ্য মতো, জুলু এবং বাকীর শরণাপন্ন হই। সব বলি। ওরা একবাক্যে বলে না, পারবা না। বিস্তারিত বোঝাই তাদের। এক সময় বাকী সম্মত হয়। কিছুক্ষণ পর, জুলুও সম্মতি দেয় শর্তসাপেক্ষে। পরদিন দুপুরে, স্পটে নিয়ে যাবে আমাকে। তবে ক্যামেরায় ওদের কাউকে আনা যাবে না। একই সঙ্গে স্পটের সুনির্দিষ্ট নামও বলা যাবে না। ওদের প্রস্তাবে, রাজি হলাম।

পরদিন বেলা ৩-৩০টার দিকে, ইউনিটসহ আগারগাঁও মোড়ে মাইক্রোবাস নিয়ে বসে আছি। একটু পরই, বেজে উঠল অপরিচিত একটি ফোন। তখন একটেল মোবাইল ব্যবহার করতাম। ইনকামিং কলে, টাকা কাটত। আবার কলার আইডির জন্য, আলাদা টাকা! কিন্তু মোবাইলে কলার আইডি ছিল না।

ফোনে ‘হ্যালো’ বলতেই, গায়েবি আওয়াজ!

গাড়ি সামনে আনেন। বিএনপি বস্তির সামনে। (তখন বাংলাদেশ বেতারের পাশে বস্তি ছিল। নাম ছিল বিএনপি বস্তি। বর্তমানে সেখানে রাস্তা হয়েছে। বিভিন্ন অফিস-হাসপাতাল আছে।)

কোথায় যাব?

সামনে আগান। বেতার অফিসের পাশের বস্তিতে নামেন। আমরা আপনাদের নিয়া যামু।

লাইন কেটে গেল। আমরাও গাড়ি সামনে নিলাম। থামলাম, তাদের কথামতো।

কিছুক্ষণ পর, ৭-৮ জন ষন্ডা টাইপের তরুণ আমাকে উদ্দেশ করে বললেন হাঁটতে থাকেন। কোনো কথা বলবেন না।

ওরা আমাদের এক রকম স্কট করে, জঙ্গল পেরিয়ে একটি টিলার ওপর নিয়ে গেল। আগারগাঁওয়ে এমন নির্জন জায়গা রয়েছে, কল্পনাও করিনি। সমতল থেকে বেশ উঁচু জায়গা। মাঝখানে, ছোট্ট খাল। সেই খাল, ঝোপঝাড় পেরিয়ে, ইউনিট নিয়ে টিলার ওপরে উঠলাম। দেখলাম, আরও ২০-২৫ জন ছেলে সশস্ত্র অবস্থায়। ওরা যেন চোখ দিয়ে, আমাদের গিলে খাচ্ছে! ইউনিটের প্রধান ক্যামেরাম্যান মিলু ভাই (সম্ভবত এখন এএফপিতে) ফিসফিসিয়ে বললেন ভাই, তওবা পড়েন। কিছু একটা হইতে পারে। আমিও পড়তাছি!

ভেতরে ভেতরে ভয় পেলাম। বেড়ে গেল হার্টবিট! জোর করে মুখে হাসি এনে ফিসফিসিয়ে বললাম আরে, কিছুই হবে না। আমি ওদের চিনি। এ ছাড়া আমাদের নিরাপত্তার সমস্যা নেই। আসলে, এটি সত্য না। তবু তাকে আশ^স্ত করলাম। মিনিট দশেক পর, একটি ঘর থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী জুলু বের হয়ে এলো। আমার উদ্দেশে বলল চা খাবা?

না। কাজ আছে। আমাদের শুটিংয়ের ব্যবস্থা করলেই হবে। এরপর জনকণ্ঠে যাব। হার্টবিট তখন, চরম পর্যায়ে। জীবনে এমন ভয় কখনো পাইনি।

জুলু, বিশাল দেহী একজনকে ইশারা করলেন। তিনি আমাদের উদ্দেশে বললেন আসেন।

লোকটি পরপর ৩টি টিনের ঘরের তালা খুলে দিলেন। সেটা গুদাম ঘরের মতো। একের পর এক, বড় বড় কার্টুন। পরে জানা গেল, প্রতি কার্টুনে ৫০০ বোতল! এ রকম প্রায় ৩০০ কার্টুন প্রতি ঘরে। এর মানে ৩ ঘরে আছে- ৪,৫০,০০০ বোতল ফেনসিডিল! তখন প্রতি বোতলের দাম, সম্ভবত ৭০-৮০ টাকা। বোঝা গেল, এখান থেকেই আগারগাঁও-মিরপুরে ফেনসিডিল সাপ্লাই হচ্ছে।

শুটিং শুরু হলো। ক্যামেরা প্যান হচ্ছে। সারি সারি কার্টুন। একটার মুখ খোলা। কাজ শেষে জুলুকে বললাম একজনকে দাও, কথা বলার জন্য? তার মুখ দেখাব না। পেছন দিয়ে সে কথা বলবে। আমি তার সামনে থাকব। একটু চিন্তা করে, বাকীর অনুরোধে জুলু রাজি হলো। আমরা শুটিং শেষ করে, জুলু-বাকীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম।

যাওয়ার সময় জুলু বলল দেইখো, ভেজাল জানি না হয়?

না, হবে না। নিশ্চিত থাকো। তোমাদের নাম বা জায়গার নাম বলা হবে না।

অনুষ্ঠান প্রচার হলো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডেকে পাঠালেন। সে আরেক ঘটনা। পরবর্তী সময়ে, সরকার পরিবর্তন হলো। একদিন পত্রিকা মারফত জানা গেল প্রথমে শীর্ষ সন্ত্রাসী জুলু ক্রসফায়ারে এবং পরে বাকীও অন্য সন্ত্রাসীর গুলিতে মারা গেছে।

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত