রমজানকে কেন্দ্র করে আগ্রাসী ব্যবসা নয়

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২৩, ১২:৪৮ এএম

পবিত্র রমজান সামনে রেখে প্রতি বছর অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মজুদদারের আবির্ভাব ঘটে। তাদের কারসাজিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, নকল, ভেজাল ও মানহীন পণ্যের দৌরাত্ম্যে নাগরিক জীবন অতিষ্ঠ, মানুষের স্বাভাবিক জীবন-জীবিকার অধিকার মারাত্মকভাবে হুমকির সম্মুখীন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী সহজলভ্য ও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা সরকারের দায়িত্ব এবং ভোক্তা শ্রেণির অধিকার। কিন্তু আমাদের দেশের বাজার ব্যবস্থাপনা মজুদদার লুটেরাদের হাতে কুক্ষিগত। বিশেষত রমজান ও ধর্মীয় উৎসবগুলোতে বাজার ব্যবস্থাপনায় শোচনীয় অবস্থা বিরাজ করে। তখন কিছুসংখ্যক ব্যবসায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্য মজুদ করে রাখে। এতে অস্বাভাবিকভাবে পণ্যের মূল্য হু হু করে বাড়তে থাকে। ভোক্তা শ্রেণি প্রয়োজনের তাগিদে চড়া মূল্যে পণ্যসামগ্রী কিনতে বাধ্য হয়। ফলে এ সুযোগে অতি মুনাফাখোর অসাধু ব্যবসায়ীরা সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। আর সাধারণ মানুষ চড়া মূল্যে পণ্য কিনে নিঃস্ব থেকে আরও নিঃস্ব হয়। কথিত আছে, এসব ব্যবসায়ী বলে থাকেন, রমজানের এক মাস ব্যবসা করব, সারা বছর আরামে কাটাব। রমজান মাস মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি বিশেষ নেয়ামত। এটি সংযম ও নাজাতের মাস, পাপমুক্তির মাস হলেও এসব মৌসুমি ব্যবসায়ীর দৌরাত্ম্যের কারণে জনজীবন হয়ে ওঠে অসহনীয় ও যন্ত্রণাদায়ক। এমন অবস্থার অবসান কাম্য। এ জন্য নাগরিক হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেই আমরা প্রায়ই সরকারকে দোষারোপ করি। এটা ঠিক যে, যথাযথ মনিটরিংয়ের দুর্বলতার সুযোগে আর দ্রব্যমূল্য মনিটরিংয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তাব্যক্তিদের খামখেয়ালিপনার কারণে কিছু মুনাফাখোর ও অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের অস্থিতিশীল হয়। আবার যখনই কোনো পণ্যের দাম বাড়ে তখনই সাধারণ জনগণ সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়েন, দাম বাড়ার গুজবে নিজেরাই ওই পণ্যের মজুদে তৎপর হয়ে ওঠেন।

ফেসবুকে এক বন্ধু আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘সামনে রোজা আসছে। রোজার আগমনে অন্যান্য মুসলিম দুনিয়া শান্ত হয়ে আসছে। মানুষের মাঝে একটা ভাবগম্ভীর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে শুরু হবে কেনাকাটার মচ্ছব। যার দুই কেজি পেঁয়াজ দরকার সে কিনবে বিশ কেজি। যার এক কেজি চিনি দরকার সে কিনবে ১০ কেজি। এমন করে খাবার মজুদ করা শুরু হবে যেন সারা বছর না খেয়েছিল। রোজার পরও আর কোনো দিন খাবার খাব না। দুনিয়ার সব খাবার এই ৩০ দিনেই খেয়ে শেষ করতে হবে। এই সুযোগে পবিত্র রমজানের ব্যানার টাঙ্গিয়ে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে ব্যবসায়ীরাও অপবিত্র কাজ করা শুরু করে দেবে। আমাদের মোড়ে মোড়ে এত এত মসজিদ, মাঠে মাঠে এত ওয়াজ, অলিগলিতে এত মাজার হওয়ার পরও পরিবর্তন হচ্ছে না কেন? ধর্মের দোষ দিচ্ছি না, মসজিদেরও না, মাজারেরও না। শুধু আত্মসমালোচনা করছি।’

নকল ও ভেজাল খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করা রমজানের সময় একটি ভয়ংকর সংকট। মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের তারিখ পরিবর্তন করে বিক্রি করার প্রবণতা ব্যাপক বেড়ে গেছে। যারা ঘরে বসে কেনাকাটা করতে চান, তাদের টার্গেট করে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অনলাইনে ফাঁদ পেতে বসেছেন। অনলাইনে কেনাকাটার জন্য ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার ও টিভি-পত্রিকাও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। গুদামের পচা খাদ্যশস্য, দোকানের ছেঁড়াফাটা কাপড়, ভেজাল তেল-ঘি, নকল জুস, হোটেল-রেস্তোরাঁর বাসি-পচা খাবার ইত্যাদি এখন অনলাইনে ভোক্তাকে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। এটাও নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।

আরেকটি কথা, নিম্ন আয়ের মানুষের কথা ভেবে টিসিবিকে পাড়ায়-পাড়ায় নিত্যপণ্য সরবরাহ বাড়াতে হবে। উপজেলা ও গ্রামপর্যায়ে যেন নিত্যপণ্যের অভাবে হাহাকার সৃষ্টি না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে সরবরাহ চেইন ঠিক রাখতে তৎপর হতে হবে। এক কথায় রোজাদারদের সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় সব করতে হবে। মানুষ যাতে নির্বিঘেœ রোজাসহ অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগি সুন্দরভাবে পালন করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত