রমজান মাস অগণিত নেকি অর্জনের মাস। তাই এ মাসে নেকি অর্জনের কোনো পন্থাই হাতছাড়া করা উচিত নয়। কারণ রোজা মানুষকে প্রকৃত মানুষ হতে অনুপ্রাণিত করে এবং কার্যকরভাবে সহায়তা করে। এবার এমন একসময় রমজান এসেছে, যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। নিম্নবিত্ত পরিবার তো বটেই, অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারও ন্যূনতম পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ সাহরি খেয়ে রোজা পালন করতে পারছে না। এমন দুঃসময়ে, দরিদ্র ও অভাবী রোজাদারের পাশে দাঁড়ানোই হবে রমজানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। এমনিতেই রমজানে মানুষের সেবা করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এটা একটা সুযোগ। এ সুযোগকে কাজে লাগানো আমাদের কর্তব্য।
যাদের সামর্থ্য আছে, আশপাশের অভাবী কিংবা কষ্টে থাকা পরিবারগুলোর দিকে একটু খেয়াল রাখুন। দু-এক কেজি গরুর গোশত, একটা বড় মাছ, কিছু খেজুর কিংবা কয়েকটা মুরগি কিনে তাদের বাসায় উপহার পাঠান। এ সময় এর চেয়ে সুন্দর উপহার আর হয় না। নগদ অর্থদানের চেয়ে অনেক সময় এমন উপহারে মানুষ বেশি খুশি হয়। তাতে আপনার কিছু পয়সা খরচ হবে বটে, কিন্তু অপার্থিব এক মানসিক প্রশান্তিতে ভরে উঠবে হৃদয়-মন। কারণ, নিজের খাবারের একাংশ অনাহারীর মুখে বিলিয়ে দেওয়ার মাঝে যে অলৌকিক সুখ, সেই সুখ বন্ধ দরজায় একলা ভোগের মাধ্যমে কখনোই অর্জিত হয় না।
চেষ্টা করুন, সাধ্যানুযায়ী প্রকৃত দরিদ্র-অভাবী রোজাদারের পাশে দাঁড়ানোর; তাদের ঘরে পুষ্টিকর সাহরি ও ইফতার সরবরাহে ভূমিকা রাখার। কেননা, সবাইকে নিয়ে ভালো থাকাই প্রকৃত মুসলিমের বৈশিষ্ট্য। আর কখনো হতদরিদ্রকে দান করার চেয়ে হাত পাততে না পারা মধ্যবিত্তের ঘরে খাবার উপহার পাঠানো বেশি উত্তম।
দান-সদকার মাধ্যমে মহান আল্লাহ রিজিকে বরকত দেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ সুদকে মিটিয়ে দেন এবং সদকাকে বাড়িয়ে দেন।’ সুরা বাকারা : ২৭৬
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা নিজেদের ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের উপমা একটি বীজের মতো, যা সাতটি শিষ উৎপাদন করে, প্রত্যেক শিষে ১০০ শস্যদানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেন। আর আল্লাহ সর্বব্যাপী প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ সুরা বাকারা : ২৬১
দান-সদকা প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হালাল কামাই থেকে একটি খেজুর পরিমাণ সদকা করবে, (আল্লাহ তা কবুল করবেন) এবং আল্লাহ শুধু পবিত্র মাল কবুল করেন আর আল্লাহ তার ডান হাত দিয়ে তা কবুল করেন। এরপর আল্লাহ দাতার কল্যাণার্থে তা প্রতিপালন করেন যেমন তোমাদের কেউ অশ্বশাবক প্রতিপালন করে থাকে, অবশেষে সেই সদকা পাহাড় বরাবর হয়ে যায়।’ সহিহ বোখারি : ১৪১০
আরেকটি কথা, রমজানের শিক্ষা ধৈর্য ও সংযম। তাই একে অপরের প্রতি সম্প্রীতি, সমবেদনা ও সহমর্মিতা বজায় রাখা। এটাও রমজানের মহান শিক্ষা। রমজানের শেষ বিকেলে নানা কারণে মানুষের মন-মেজাজ একটু বিক্ষিপ্ত থাকে। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে নিম্নশ্রেণির মানুষের ওপর। এদিকে খেয়াল রাখা। রোজা অবস্থায় কোনোভাবেই অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করা যাবে না। যত কঠিনই হোক, পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে সংযম ও ধৈর্যের মাধ্যমে। সংযম রক্ষা করে চলাই পবিত্র রমজানের শিক্ষা।
মনে রাখতে হবে, ইসলাম শুধু অনুষ্ঠানসর্বস্ব ধর্ম নয়, এর মূল বাণী হচ্ছে মানবতার উৎকর্ষ। সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্য আর মানুষসহ সব সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসা।
লেখক : খতিব, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ
