একসঙ্গে সাড়ে ছয় হাজার লোকের ইফতার

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৩, ১২:০৪ এএম

স্রষ্টা মহান আল্লাহর ইবাদত ও সৃষ্টির সেবার ব্রত নিয়ে গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে সিয়াম সাধনার মাসে খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ চালু করেছিলেন ‘সবার জন্য সমান সম্মান, সমান ইফতারি’র আয়োজন। বিশ-ত্রিশজন থেকে শত মানুষের অংশগ্রহণে শুরু হয় এই ইফতারির কার্যক্রম। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতায় প্রতিষ্ঠিত আহ্ছানিয়া মিশনের সেই আয়োজন বর্তমানে দেশের বৃহত্তম ইফতার অনুষ্ঠান বলে দাবি কর্র্তৃপক্ষের।

আহ্ছানিয়া মিশনের নির্বাহী কমিটির সদস্য সচিব নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিদিন নলতার পাক রওজা শরিফের ক্যাম্পাসে সাড়ে ছয় হাজার মুসল্লির অংশগ্রহণ থাকে। এ ছাড়া রোজার সময় জুমাবার এবং শবেকদরের মতো দিনগুলোতে দশ হাজার মুসল্লির অংশগ্রহণ ছাড়িয়ে যায়। বিশেষ ব্যাপার হলো, এখানে কখনো কোনো মুসল্লির বিনা ইফতারিতে ফেরত যাওয়ার ঘটনা নেই। প্রতিদিনের ইফতারিতে খরচ হয় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা।

সাধক আলহাজ খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ (রহ.)-এর জন্মভূমি সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলা নলতা গ্রামে। ১৯৩৫ সালের ১৫ মার্চ নলতায় কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশন প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। সে সময় থেকে নলতার আশপাশের সবার বাড়িতে রমজান মাসে রান্না করা খাবার এখানে নিয়ে এসে একসঙ্গে বসে ইফতারি করতেন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে এই ইফতার মাহফিল চালু হয়।

দিন দিন বাড়তে থাকে এর পরিধি। বর্তমানে নলতা কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশনের উদ্যোগে প্রতি বছর ১০ হাজার মানুষের জন্য ইফতারির আয়োজন করা হয় প্রতিদিন। করোনায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর আবারও চালু হয়েছে ইফতার মাহফিল। পহেলা রমজান থেকে শুরু হওয়া ইফতার মাহফিল চলবে রমজান শেষ হওয়া পর্যন্ত।

নলতা কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশনের ইফতার মাহফিল আয়োজক কমিটির শফিকুল আনোয়ার রনজু জানিয়েছেন, প্রতিদিন ১০ হাজার মানুষের ইফতারির আয়োজন করা হয়। আগামীতে আরও বাড়ানো হবে বলে তারা জানান। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর থেকে ৪০-৪৫ জন বাবুর্চি ইফতারি তৈরির কাজ শুরু করেন, চলতে থাকে দুপুর পর্যন্ত।

ইফতারি তৈরিতে নিয়োজিত বাবুর্চি নলতা গ্রামের ফরহাদ হোসেন জানান, প্রতিদিন তারা ফজরের নামাজের পর থেকে রান্নার কাজ শুরু করেন। শেষ হতে বিকেল ৫টা বেজে যায়। এখানে তারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে সিংড়া, ছোলা, ফিরনি তৈরি করেন বলে জানান।

আয়োজক কমিটির কর্মকর্তা আবুল ফজল জানান, ৪৭ বিঘা জমিতে প্রতিষ্ঠিত মিশনের পশ্চিম মাঠে টিনের বিশাল ছাউনি দেওয়া হয়। টিনগুলো স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত। রোজা শেষে সেগুলো যতœ করে সংরক্ষণ করা হয়। ছাউনির কাছেই রান্নার আয়োজন। সেখানে সাত রকম খাবার পরিবেশন করা হয় প্রতিদিন প্রতিজন রোজদারের জন্য। রান্না শেষে পরিবেশনের জন্য খাবার নিয়ে যাওয়া হয় বিশাল ছাউনির নিচে। সেখানে একত্রে বসে ইফতার করেন সাড়ে ছয় হাজার মানুষ। এ ছাড়া প্রতিদিন বাড়িতে ও মসজিদে পাঠানো হয় ইফতারির এ খাবার। তবে বিশেষ দিনগুলো সাড়ে তিন হাজার মানুষের বাড়ি ও আশপাশে মসজিদে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ইফতারি। আসরের নামাজের পরপরই ইফতারি দিয়ে শুরু হয় প্লেট সাজানোর কাজ। এলাকার ছোট-বড় সব মিলিয়ে ৩০০ জন স্বেচ্ছাসেবক এসব কাজ করেন প্রতিদিন। ইফতারির প্লেটে থাকে ডিম সেদ্ধ, সিংড়া, কলা, খোরমা, ফিরনি, ছোলা ও চিড়া। এ ছাড়া প্রত্যেকের জন্য থাকে বিশুদ্ধ পানির বোতল।

নলতা কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশনের অ্যাডহক কমিটির সদস্য আবুল ফজল বলেন, ১৯৩৫ সালে অবিভক্ত বাংলা ও আসামের শিক্ষা বিভাগের সহকারী পরিচালক আলহাজ খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ্ (রহ.) নলতায় মিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে যে মহতি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন ধীরে ধীরে বেড়েছে এর ব্যাপ্তি। শুধু স্থানীয়রাই নন, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ ছুটে আসেন ইফতারি করতে।

স্থানীয় যুবক ফরিদ হোসেন বলেন, ছোটকাল থেকে আমি বাবার সঙ্গে ইফতারি করতে আসি। একসঙ্গে সবাই মিলে ইফতারি করতে খুব ভালো লাগে। এই উপজেলার সন্তান হিসেবে এই ইফতার মাহফিলের আয়োজন নিয়ে গর্ববোধ করি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত