কুমিল্লার দেবিদ্বারে একটি এতিমখানার পরিচালনা কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে ভুয়া এতিম ছাত্র দেখিয়ে ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ট প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ ও জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি করে কমিটির অনুমোদনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের আবদুল্লাহপুরের হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হাফেজিয়া শিশু সদন কমপ্লেক্স ও এতিমখানার ওই সভাপতি মো. জুলহাস সরকারের বিরুদ্ধে এ বিষয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিসহ স্থানীয় ১৬ জন গণ্যমান্য ব্যক্তি জেলা সমাজসেবা অফিসে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। পরে জেলা সমাজসেবা বিভাগ বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করেন।
জানা যায়, নিবন্ধন প্রাপ্ত বেসরকারি এতিমখানাগুলোর শিশুদের প্রতিপালন, চিকিৎসা এবং শিক্ষা প্রদানের জন্য সরকার যে অর্থ সহায়তা করে, তা ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ট নামে পরিচিত। এ ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ট থেকে পাওয়া বিভিন্ন বরাদ্দ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে জুলহাস সরকারের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারী ও এতিমখানার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আবদুল জব্বার বলেন, ‘বর্তমান সভাপতির পদে থাকা জুলহাস সরকার জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার প্রকৃত নাম আব্দুর রউফ। তিনি জাতীয় পরিচয়পত্রের আসল নাম গোপন করে আরও ১৪ জন সাধারণ সদস্যের স্বাক্ষর জাল জালিয়াতির মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী চক্রের সহযোগিতায় কমিটিতে আসে। যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত। এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা পরিচালকের বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।’
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, জুলহাস সরকার অবৈধভাবে কমিটির সভাপতি হয়ে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন আর্থিক কেলেংকারীসহ বিভিন্ন বিতর্কিত লোকদের নিয়োগ দেন। প্রকৃত নাম গোপন করে তিনি এতিমখানার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের হিসাব নম্বর থেকে বিভিন্ন সময়ে টাকা উত্তোলন করেন। এছাড়া বাবা-মা থাকা ছাত্রদের এতিম দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমান কমিটির সদস্যরা নিজেদের সুবিধার্থে মাহমুদুল্লাহ নামে এক ব্যক্তিকে এতিমখানার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়। মাহমুদুল্লাহকে ২০১৯ সালে মাদ্রাসার ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ ও বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে কমিটির সভাপতি জুলহাস ও সদস্য কানন, আক্তার হোসেন, তাজুল ইসলাম, খাইরুল ইসলামের যোগসাজশে তাকে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের জমাকৃত অর্থ, এতিম শিশুদের ভরণপোষণের সরকারি বরাদ্দ ও এতিমখানার অবকাঠামো উন্নয়নের নামে অর্থ কালেকশন আত্মসাতের সুবিধার্থে টাকার বিনিময়ে তাকে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা অন্য একটি মাদ্রাসার সাবেক প্রিন্সিপাল মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমান সভাপতি ছোটবেলা থেকেই নানা আর্থিক দুর্নীতিতে জড়িত। সে যখন এতিমখানায় সভাপতি হয়ে আসল, তখন থেকে আমি এখানে দান সদকা করা বন্ধ করে দিয়েছি।’
এতিমখানার শিক্ষক অভিযুক্ত মাহমুদুল্লাহ বলেন, ‘আমি নিয়োগে কোনো টাকা পয়সা দেইনি। বর্তমান কমিটি মনে করেছেন আমাকে নিয়োগ দেবেন, তাই দিয়েছেন। আবার বাদ দিলে আমি চলে যাব।’ এর আগে যেসব অভিযোগে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল, সেগুলো মিথ্যা বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে কমিটির সভাপতি অভিযুক্ত জুলহাস সরকার বলেন, ‘আমাকে স্থানীয় আক্তার মেম্বার জালিয়াতি করে আব্দুর রউফ থেকে জুলহাস সরকার নামে ভোটার কার্ড নাম বানিয়েছে। আমি জালিয়াতির কোনো কাজ করিনি। এতিমখানা সুষ্ঠুভাবে চলছে।’ তবে সরকারি বরাদ্দপ্রাপ্ত ২২ এতিমের সবাই এতিম নয় বলে তিনি স্বীকার করেন।
কুমিল্লা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক জেড এম মিজানুর রহমান খান বলেন, ‘এতিমখানার আর্থিকসহ নানা অনিয়মের বিষয়টি আমাকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। দেবিদ্বারের সমাজ সেবা অফিসারকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। তদন্তে প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
