বদলে যাচ্ছে বিশ্বব্যবস্থা, বিশ্বে এখন যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য থেকে বেরিয়ে আসছে। বৈশ্বিক এ পরিবর্তনে প্রধান চরিত্র হয়ে উঠেছে চীন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-পশ্চিমাদের পর সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে আলোচনায় এসেছে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের দেশটি। চীনের প্রভাব এখন এত তুঙ্গে যে যুক্তরাষ্ট্রের বলয় ছেড়ে বেরিয়ে আসছে উন্নত ও উদীয়মান উন্নতির দেশগুলো। বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থায় বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই এখন প্রভাব চীনের। যার সর্বশেষ নজির ল্যাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের প্রভাবশালীদের বেইজিং সফর। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন বলছে, সফরে গিয়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডা সিলভা। গত শুক্রবার তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাব কমিয়ে চীনের যে নতুন বিশ্বব্যবস্থার পরিকল্পনা তা এগিয়ে নিতে আগ্রহী ব্রাজিল।’
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে বৈঠককালে লুলা বলেন, ‘চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের উদ্দেশ্য কেবল বাণিজ্যিক নয়। আমাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে। আমাদের আগ্রহ রয়েছে নতুন একটি ভূ-রাজনীতির জন্ম দেওয়া যাতে করে জাতিসংঘের সাহায্যে আমরা বিশ্বের শাসনব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারি।’
লুলার সফরের ওপর ভিত্তি করে চীন এবং ব্রাজিলের পক্ষ থেকে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আরও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করে চীন। যাতে করে সংস্থাটি আরও বেশি প্রতিনিধিত্বমূলক এবং আরও বেশি গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে।’ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাইডেন প্রশাসনও ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, দেশটি চায় জাতিসংঘের সংস্কার হোক। যাতে করে নিরাপত্তা পরিষদে লাতিন আমেরিকা এবং আফ্রিকা থেকেও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। ব্রাজিল দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে আসছে।
লুলার সফরের কয়েকদিন আগেই চীন সফর করে গেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো। সেই সফর থেকে ফিরে নেদারল্যান্ডসে এক অনুষ্ঠানে ম্যাক্রোঁ পরোক্ষভাবে ইউরোপের যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমিয়ে আনার কথা বলেন। ‘অন্যের ওপর’ নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপকে আরও শক্তিশালী করার ডাক দিয়েছেন তিনি। চীন সফর শেষে দেশে ফেরার সময় তিনি দু-দুটি সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের বদলে ইউরোপের ‘কৌশলগত সার্বভৌমত্ব’-এর ওপর জোর দেন। তাইওয়ান প্রশ্নেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের দৃষ্টিকোণে পার্থক্যের ইঙ্গিত দেন তিনি।
বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র আধিপত্য হারাচ্ছে এবং এরই মধ্যে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির সাবেক ট্রেজারি সেক্রেটারি লরেন্স সামারস। ব্লুমবার্গ টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সামারস এ মন্তব্য করেছেন। এ বিষয়ে সামারস বলেছেন, ‘উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি দেশের একজন আমাকে বলেছিলেন যে, চীনের কাছ থেকে আমরা উড়োজাহাজ (পরিবহন) সুবিধা পাব। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাব কেবল উপদেশ।’
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক আরও বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে চীন এবং রাশিয়ার গভীর হতে থাকা এমন একটি বিষয়ের প্রতীক যা যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এ নতুন চ্যালেঞ্জকে কীভাবে মোকাবিলা করা যায় তা ওয়াশিংটনকে বিবেচনা করতে হবে। এ ছাড়া আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের কাঠামোও দীর্ঘমেয়াদি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে। ব্রেটন উডস সিস্টেম যদি বিশ্বজুড়ে দৃঢ়ভাবে আর না দাঁড়াতে পারে তবে এর গুরুত্বও উপলব্ধি করে নতুন বিকল্প হাজির করতে হবে, যা অবশ্যই আরও বেশি চ্যালেঞ্জের।’
