২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর ক্রমাগত ইউক্রেনের অঞ্চল দখলে নিতে থাকা রাশিয়াকে গত বছরের মাঝামাঝিতে রুখে দিতে থাকে ইউক্রেনীয় সেনারা। তবে শীতে এবং যুদ্ধাস্ত্রের সংকটে ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রতিরোধ যুদ্ধে পিছিয়ে যায়। এখন ইউক্রেন বসন্তের পর বরফগলা কাদামাটি শক্ত হলে বড় ধরনের পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু রাশিয়া থেমে নেই বরং গেল কয়েক দিনে আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়েছে। লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র-গোলা ছুড়ে চলেছে রুশ সেনারা। ওদিকে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর বাখমুতে হচ্ছে তীব্র যুদ্ধ। এ যুদ্ধে শহরটি প্রায় দখলে নিয়ে এসেছে রাশিয়ার ভাড়াটে সেনাদের দল ওয়াগনার গ্রুপ। ওয়াগনারের আক্রমণে বাখমুতে টিকে থাকা ইউক্রেনীয় সেনারা আশ্রয় নিয়েছে মাটির নিচে পরিখা খুঁড়ে। যুদ্ধের এই যখন পরিস্থিতি তখন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, এ যুদ্ধে বিগত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ মাসে অন্তত ২০ হাজার রুশ সেনা নিহত হয়েছে। আর সবমিলিয়ে হতাহত হয়েছে অন্তত এক লাখ।
গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে এ দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র জন কারবি। তিনি বলেন, নিহত রুশ সেনাদের মধ্যে অর্ধেকই ভাড়াটে বাহিনী ওয়াগনারের; এ বাহিনীই পূর্বাঞ্চলীয় বাখমুত শহর দখলে নিতে ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউক্রেনের অন্যান্য ফ্রন্ট তুলনামূলক শান্ত থাকলেও গত বছরের শেষদিক থেকে রাশিয়া মূলত বাখমুত দখলে নিতেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। ছোট এ শহরটির সিংহভাগ অংশই এখন মস্কোর নিয়ন্ত্রণে, তবে ইউক্রেনীয় বাহিনী এখনো শহরটির পশ্চিমের সামান্য অংশ দখলে রেখেছে। ইউক্রেনের সেনা কর্মকর্তারা বলছেন, বাখমুতে তারা যত বেশিসংখ্যক রুশ সেনাকে মারা যায়, সেই চেষ্টা করার পাশাপাশি রাশিয়ার রিজার্ভে থাকা সেনার পরিমাণও কমিয়ে আনতে চাইছেন।
কারবি বলেন, ‘বাখমুতের মাধ্যমে দনবাসে রাশিয়ার সেনা অভিযানে আদতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা কোনো বাস্তব কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকার দখল নিতে পারেনি। আমাদের অনুমান, রাশিয়ার হতাহত সেনার সংখ্যা লাখখানেকের বেশি, এর মধ্যে যুদ্ধে নিহতই ছাড়িয়েছে ২০ হাজার।’
তবে তিনি এ পাঁচ মাসে ইউক্রেনের কতজন সেনা হতাহত হয়েছে, তা বলতে রাজি হননি। রুশপন্থি বিভিন্ন টেলিগ্রাম চ্যানেলে গত কয়েক মাসের যুদ্ধে এক রুশ সেনার বিপরীতে ইউক্রেনের পাঁচ থেকে সাত সেনা নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এদিকে কারবির এমন দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান বলছে, কারবি রাশিয়ার সেনা হতাহতের সংখ্যা বললেও কীভাবে এ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করেছেন তা স্পষ্ট করেননি।
ক্রেমলিনও রুশ হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ওয়াশিংটনের দাবি নাকচ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন দাবিকে ‘হাওয়া থেকে পাওয়া’ অর্থাৎ পুরোপুরি আন্দাজনির্ভর বলে অভিহিত করেছে তারা। মস্কো কারবির দাবি উড়িয়ে দিয়ে বলছে, যুদ্ধে রাশিয়ার কতজন হতাহত হলো সেই তথ্য সংগ্রহের কোনো উপায় তো ওয়াশিংটনের নেই!
ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযান শুরুর পর সর্বশেষ গত বছর সেপ্টেম্বরে নিজেদের নিহতের তথ্য প্রকাশ করেছিল রাশিয়া। সে সময় দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু জানিয়েছিলেন, অভিযান শুরুর পর থেকে তারা ৫ হাজার ৯৩৭ জন সেনাকে হারিয়েছেন। সম্প্রতি রাশিয়া থেকে জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়া রুশ অধিকারকর্মী ভিতালি ভোতানোভস্কিও রুশ সেনাদের নিহতের একটি আনুমানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে চাপের মুখে পড়েন। রাশিয়ার কয়েকটি এলাকায় নতুন কবর পর্যবেক্ষণ করে তিনি দাবি করেন, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সেনাদের মৃত্যু কয়েকগুণ বেড়েছে। সম্প্রতি যাদের কবর দেওয়া হয়েছে, তাদের প্রায় সবাই ওয়াগনার যোদ্ধা ও গণহারে সেনাবাহিনীতে নাম লেখানো নতুন সেনা।
