‘আমাদের এই প্রিয় গ্রহ পৃথিবীটাই তো শূন্যে ভাসমান এক বিশাল কারাগার।’
ইচক দুয়েন্দের বড় গল্প ‘লালঘর’-এর প্রধান এগারো চরিত্রের নাম : ১. চিকচাক রুই, ২. পুঁই চুলভি, ৩. রজেট চিনচুই, ৪. মিয়ান টিনটুই, ৫. ফ্লিজ ফ্যাল, ৬. জিয়াফ ব্যানব্যাট, ৭. লালু পাঞ্জুমম, ৮. তিয়াস ঠিসটক, ৯. ইমুস ক্যাটস, ১০. ফিটিক চ্যাক, ১১. শ্যামল চিল।
এই এগারোজনের এক দিনের হাজতবাসের কাহিনি ইচক দুয়েন্দে তার ‘লালঘর’-এ লিখেছেন। বড়গল্প না বলে আমি অবশ্য ‘লালঘর’কে অভিহিত করব একটি ছোট উপন্যাস বলে। লালঘরে এই ১১ জনের বাইরে আরও বিশটি চরিত্র আছে। ‘লালঘর’ মার্চ-এপ্রিল ২০০৭ সালে রচিত। ওই বছরেই বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় হাতে লেখা পা-ুলিপি সংস্করণ হিসেবে ‘পেঁচা’ থেকে। এর পরের বছর ‘বাংলায়ন’ হতে ‘লালঘর’-এর প্রথম মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
বইয়ের শুরু থেকেই উদ্বেগ বা সংকট তৈরি হয় এই ১১ জনকে ঘিরে, যা বইয়ের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। তাদের হাজতে নিয়ে আসা হয়। উদ্বেগ হলো তারা মুক্তি পাবে কখন, বা আদৌ মুক্তি পাবে তো? চরিত্রগুলোর জীবনযাপনে হঠাৎ ছন্দপতনের বিষয়টা পাঠক হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন একদম প্রথম পৃষ্ঠা থেকে যখন লেখক আমাদের শুরুতেই জানান যে, ৯ ফুট বাই ৯ ফুট এক বর্গাকৃতি ঘর; যার উচ্চতা প্রায় ১২ ফুট, সেখানে আটক ১১ জন মানুষ। এই ঘরের এক কোণে একটা দরজা দিয়ে ৩ ফুট বাই ৩ ফুট ছোট্ট এক ঘরে যাওয়া যায় প্রকৃতির ডাকে।
বইয়ের ভাষার দিকটা এখানে লক্ষণীয় এ কারণে যে, এগিয়ে যেতে থাকা এই বড় গল্প বা ছোট উপন্যাসে লেখক যা যা দেখিয়েছেন হালকা স্যাটায়ার করে, একদম শুরুতে নিথর ভাব তৈরি করে পাঠককে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে দিয়ে তার পরেই গতি এনে, শেষের দিকে দার্শনিকতা মুড়ে দিয়ে তাতে বইটা নিমিষে পড়ে ফেলা যায়।
তবে বইয়ের মোট ৩১টি চরিত্রের অভিনব নাম আপনাকে কিছুটা বিপন্ন করতে পারে এবং আপনি খেই হারিয়ে ফেলতে পারেন মাঝে মাঝে। কে কোন চরিত্র বুঝে মনে রাখা কঠিন হয়। চরিত্রদের নামগুলো আমি বা আপনি কেউই আগে শুনি নাই। এজন্য ‘লালঘর’ পাঠের সময় চরিত্রদের নাম টুকে রাখতে পারেন। এইটুকু পরিশ্রম করলে, এই বইয়ের রস আস্বাদন করা আরও সহজ হতে পারে। এই বইতে ভাষার গাম্ভীর্য নেই, জটিলতা নেই। চরিত্রদের সংলাপে আপনি পাতায় পাতায় পাবেন মজা।
গল্পের সঙ্গে পাঠক একাত্ম হয়ে যায় গল্পের শুরুতেই রাত তিনটার সময়ের এমন বর্ণনা পাঠ করে, ‘জনাকীর্ণ শহরটায় দিনের কর্মব্যস্ততার শেষে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। দূরে দ্রুতগামী যানবাহনের শব্দ এখন ভীষণ প্রকট হয়ে কানে বাজছে, যা দিনে অন্যসব শব্দের ভিড়ে থাকে ম্রিয়মাণ। ঘড়ির টিক টিক ঠিক ঠিক ধ্বনি, বুকের ভেতরের ধুকপুক ধ্বনির সঙ্গে একাকার হয়ে ছলাৎ ছলাৎ করে বাজে।’
গল্পের প্রায় শেষ দিকে চরিত্রদের মিলিত অনুভূতি বর্ণনা করেন এভাবে, ‘যদি তাদের পাখা থাকত, তবে শোনা যেত তাদের পাখার ব্যর্থ ঝটপট ধ্বনি। তাদের মন চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। আসন্ন মুক্তির উদগ্র আকাক্সক্ষায় তাদের মন ছটফট করছিল। কিন্তু অজানা এক আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন তারা আনন্দ প্রকাশে ছিল সঙ্কুচিত।’
আলতো লয়ে নিথর অবয়ব দেখিয়ে মাঝে সাঝে স্বস্তির বারতা দিয়ে আরও চরিত্র এনে বইটার শেষ প্রান্তে যখন লেখক আমাদের নিয়ে যান তখন আমরা মুখোমুখি হই কারাগার নিয়ে দর্শনালোচনার। যা ভাবায়, যা দেখায় এই পৃথিবীর একটি জঘন্য বাস্তবতাকে। সেই বাস্তবতা এমন শব্দরাজি দিয়ে লেখক ফুটিয়ে তোলেন যে তা চাপ হয়ে আসে না, মৃদুভাবে গভীরতায় ঠেলে ভাবতে উৎসাহী করে পাঠককে। ‘পৃথিবীতে যে কারাগার নামে একটা জিনিস আছে, এ আমার জানাই ছিল না। বহুবার শুনেছিলাম। বর্ণনা শুনেছিলাম বহু মানুষের মুখ থেকে। বর্ণনাগুলো কি মনে রেখেছিলাম? এ রকম একটা মর্মান্তিক জিনিস পৃথিবীতে আছে, সিরিয়াসলি কি তা নিয়ে ভেবেছিলাম?
বইয়ের এক জায়গায় হাজতখানায় এক সান্ত্রির বয়ানে শুনতে পাই আমরা, ‘বুঝলেন। অর্ডার। অর্ডার হল আমি এখানে দাঁড়ায়ে থাকলাম। অর্ডার হল আমি ঘুমালাম। অর্ডার হল আমি খালাম। অর্ডার হল আমি বদলি হলাম। অর্ডার হল আপনাক ধরলাম। ... অর্ডার হইল ফাঁসি হইল। অর্ডার আসিল ফাঁসি থামিয়া গেল। অর্ডার হইল বডি চেঞ্জ হইল। ফাঁসির আসামি বাঁচিয়া গেল। আপনার বডিতে গাঞ্জা পাওয়া গেল। ... অর্ডারই সব। অর্ডারই মা-বাপ। যে-দিন অর্ডার কম হয়, যে-দিন কোন অর্ডার আসে না, মনে হয় সব ফাঁকা। খাবার বিস্বাদ। খামাকা। অর্ডার হইব। খাড়ায় দাঁড়াইব। স্যালুট দিব। বলিব, ইয়েস স্যার। কিন্তু সবই নিয়মের মধ্যে। এক চুল নড়িবার উপায় নাই। আপনারা প্রফেসর। কিন্তু এই বিষয়গুলি আপনারা বুঝেন না, আমি আশ্চর্য হইয়া যাই। যাই।’
এখানে দেখতে পাওয়া যায় এই পৃথিবীর মূল সিস্টেমটাকে যা অবলম্বন করেই এই সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখা হয় মূলত আধমরা করে। ‘লালঘর’ পড়তে আরম্ভ করে শেষ না করে উঠে আসা কঠিন। এই গল্পে রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু অবলীলায় প্রকাশিত হয়, পাঠকের মনে কোনো আতঙ্ক সৃষ্টি না করে, খেলাচ্ছলে। আমার এই লেখাটি শেষ করি গল্পের প্রধান ১১ চরিত্রের ১ জন চিকচাক রুই এর চিন্তা দিয়ে, “আইনভঙ্গ করলেই প্রায় বিনা ব্যতিক্রমে মানুষের হাতে কেন পরাতে হবে হাতকড়া? কেন করতে হবে বন্দি? এই নিয়ম তো চালু হয়েছিল ‘জোর যার মুল্লুক তার’ যখন চালু ছিল পৃথিবীতে তখন। জয়ীরা বন্দি করত পরাজিতদের। জয়ীদের দাসে পরিণত হতো পরাজিতরা। সাম্য, মৈত্রী, গণতন্ত্রে পরিচালিত একটি রাষ্ট্র কী করে তার নাগরিকদের শাস্তি দেওয়ার জন্য কারাগার রাখে? সুস্থ, সুখী মানুষেরা কখনো অপরাধ করে না। অপরাধ করে যারা অসুস্থ ও অসুখী। সেই তথাকথিত অপরাধীদের দরকার সুচিকিৎসা, শাস্তি নয়।” এই বইয়ের ঘটনাবলী দৌড়ে আগায় না বরং ধীরলয়ে কারাগারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়ে অন্যরকম এক অনুভূতিতে নিয়ে যায়, চিন্তার ভিন্ন লোকে। লালঘর এক টানটান সার্থক ছোট উপন্যাস বা বড় গল্প। ৬২ পৃষ্ঠার এ বইটি প্রকাশ করেছে বাংলায়ন, বইটি কেনা যাবে মাত্র একশ টাকায়।
