চাওয়া-পাওয়ার বৈপরীত্য, আমাদের সমাজ কাঠামোয় মোটেও নতুন বা অপ্রত্যাশিত নয়। বাঙালি সমাজে পরিবার প্রথায় প্রত্যাশা বা নির্ভরতা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। যুগ যুগ ধরে পরিবার প্রথায় চালু থাকা বিশ্বাস আর সামাজিক, সাংস্কৃতিক রীতিনীতি এটিকে একটি অনিবার্য অনুষঙ্গে পরিণত করেছে। সুদীর্ঘকাল থেকেই বিশ্বাস করা হতো, ছেলেসন্তান পারিবারিক ও বংশীয় ঐতিহ্য রক্ষার ধারক। সাংসারিক ও পারিবারিক অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালনে ছেলেই গুরুত্বপূর্ণ। তাই পিতা-মাতা ছেলেসন্তানের প্রতি যতটা যত্নশীল বা মনোযোগী হতেন, বিপরীতে মেয়েসন্তানের প্রতি ততটাই উদাসীন ছিলেন।
বংশপরম্পরায় আমাদের সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পুরুষদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিরাজমান। বিগত কয়েক দশকে শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। পরিবারের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নারী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ক্ষমতায়নে সন্তোষজনক না হলেও, উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ, শিক্ষাক্ষেত্রে জাগরণ তৈরির সঙ্গে সঙ্গে প্রাগৈতিহাসিক ধ্যান-ধারণার পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সঙ্গে, একটি মনস্তাত্ত্বিক সংঘাতও তৈরি হচ্ছে। একদিকে পিতৃতান্ত্রিক কর্র্তৃত্ববাদী মানসিকতার ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষিত সচেতন নারী সমাজের অংশগ্রহণের আগ্রহ পরিবার কাঠামোতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে।
মাইগ্রেশন বা অভিবাসনের পেছনে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানা উপাদান কাজ করে। কখনো কখনো ব্যক্তি তার নিজস্ব ইচ্ছায় অভিবাসী হয়। আবার কখনো বা পরিস্থিতি ব্যক্তিকে অভিবাসনে বাধ্য করে। দলভিত্তিক অভিবাসনের মূলে বিদ্যমান পরিস্থিতি মুখ্য ভূমিকা পালন করে, যাকে ‘ফোর্স মাইগ্রেশন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অর্থনৈতিক কারণে অভিবাসন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর একটি স্বাভাবিক চিত্র।
অস্থায়ী অভিবাসনের পাশাপাশি আজকাল স্থায়ী অভিবাসন অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মেধাবী তরুণ সমাজ, শিক্ষা-প্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তির একটি বড় অংশ আজ উত্তর আমেরিকা, ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশে স্থায়ী অভিবাসী হয়ে নাগরিকত্ব গ্রহণ করছে। অনিয়ম, অনাচারকে দায়ী করে সুখের অভিলাষে সদাচার, আর নিয়ম-নিষ্ঠার দেশে অভিবাসী হচ্ছে। সামাজিক রীতিনীতির সংস্কৃতিগুলো ধারণ করে, এই অভিবাসী শ্রেণি সত্যিই কি তাদের কাক্সিক্ষত ‘সুখ’কে খোঁজে পাচ্ছে? অভিবাসনের পেছনের গল্পগুলোই বা কেমন? সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও এটি স্পষ্ট যে, কানাডার বাংলাদেশি কমিউনিটির বৃহত্তম অংশটি যুগল জীবনে অভিবাসী হয়েছেন। মেধা আর দক্ষতায় ঈর্ষণীয় সাফল্যের প্রমাণ দিয়ে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পেয়েছেন। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার রীতিনীতি, মূল্যবোধ, কৃষ্টি, সংস্কৃতির সঙ্গে এখানকার সমাজব্যবস্থার ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। এই সমাজে নারী-পুরুষকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। পুরুষের কর্র্তৃত্ববাদী মানসিকতাকে নারীসমাজ চোখ বুঝে মেনে নেওয়ার পরিবেশও এখানে বিদ্যমান নয়। তাহলে দুটো বিপরীত কৃষ্টি ও মূল্যবোধের বৈপরীত্য কি পরিবার কাঠামোতে নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে?
আমাদের বাঙালি সমাজ কাঠামোতে যৌথ পরিবার প্রথার প্রচলন অত্যন্ত সুপ্রাচীন। সমসাময়িককালে একক পরিবারের প্রথা জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও, পিতৃতান্ত্রিক কর্র্তৃত্ববাদী মানসিকতার প্রভাব এখনো অত্যন্ত সুস্পষ্ট। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও, তাদের ওপর পিতা-মাতার নির্ভরতা বা প্রত্যাশার মাত্রাটি হ্রাস না পেয়ে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে।
আজকাল তরুণ-তরুণীদের মাঝে একক পরিবারের ধারণা জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ফলে, যৌথ পরিবার প্রথার বৈশিষ্ট্যগুলো বিশেষ চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই চ্যালেঞ্জে নারী চায় সমতাভিত্তিক সমাজ, আর পুরুষ এগিয়ে যায় কর্র্তৃত্ববাদী মানসিকতায়। এমন দুটি ভিন্নধারার মানসিকতা নিয়ে যখন কোনো পরিবার অভিবাসী হয়, তখন নতুন সমাজব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলো তাদের মাঝে আরও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে কোনো কোনো সময় আন্তঃপারিবারিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, যা বিয়েবিচ্ছেদের মতো জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি করে।
কানাডার অভিবাসী সমাজে সেপারেশন বা বিয়েবিচ্ছেদের সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কানাডার তথ্য অনুযায়ী, সমাজে বিয়েবিচ্ছেদের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ২০১০ সালে বিয়েবিচ্ছেদ প্রাপ্ত (সেপারেশন বাদে) জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ২.৩৯ মিলিয়ন, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২.৭৮ মিলিয়ন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ৭.০৭ শতাংশ। বিয়েবিচ্ছেদের এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে একটি সমাজ কাঠামোর অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ। এক সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ানদের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান থেকে আগত অভিবাসী কমিউনিটিতে বিয়েবিচ্ছেদ দৃষ্টিগোচর হলেও, বাঙালি কমিউনিটি ছিল তার ব্যতিক্রম। পরিতাপের বিষয়, আমাদের বাঙালি সমাজেও বিয়েবিচ্ছেদের সংখ্যাটি এখন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
পরিবার সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক নিমকফ তার Marriage and the Family গ্রন্থে বলেন, ‘Family is more or less durable association of husband and wife with or without children or of a man or women alone, with children’ সমাজ বিজ্ঞানী অ্যান্ডারসন ও পার্কারের মতে, ‘Family is a socially recognised unit of people related to each other by kinship, marital and legal ties’ পরিবার সম্পর্কে মার্ক্সীয় সমাজবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ কিছুটা ভিন্নতার হলেও পরিবার একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান, বৈবাহিক ও আইনানুগ সম্পর্কের মাধ্যমে তা প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং রক্ত সম্পর্কের বন্ধনে তা বিস্তৃত হয় এ বিষয়ে কারও ভিন্নমত নেই।
অভিবাসীরা একটি সমাজব্যবস্থায় বিকশিত হয়ে যখন ভিন্নধর্মী অন্য একটি সমাজব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হয়, তখন সেই সমাজব্যবস্থার রীতিনীতি ও মূল্যবোধকে ধারণ করতে গিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এই দ্বন্দ্ব থেকে তৈরি মানসিক দূরত্ব পারিবারিক আন্তঃসম্পর্কের ক্ষেত্রে কখনো কখনো চরম বৈরিতার সৃষ্টি করে।
সমতাভিত্তিক সমাজে আইনানুগভাবে সম্পত্তিতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সমানাধিকার স্বীকৃত। কানাডিয়ান সমাজে অভিবাসীদের বৃহত্তম অংশটি নানা রকম চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই তাদের জীবন পরিচালিত করে। বাড়ি ভাড়া বা বাড়ির মর্টগেজ, পরিবারের দৈনন্দিন খরচসহ আনুষঙ্গিক নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে অনেক ক্ষেত্রেই একজনের উপার্জন যথেষ্ট নয়। তাই স্বামী স্ত্রী উভয়ের উপার্জন তখন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।
সালমা ও আজমান (ছদ্মনাম) বিবাহিত জীবনে অধিক সুখের অভিলাষে কানাডার অভিবাসী জীবনকে বেঁচে নিয়েছিলেন। আজমান তার একক উপার্জন দিয়ে সংসারের খরচ চালিয়ে, ব্যাংকের মর্টগেজ চালাতে পারবেন না বিধায়, দীর্ঘদিন নিজ বাড়িতে বসবাসের স্বপ্নটিকে নিভৃত রেখেছিলেন।
কিন্তু সালমার ভাবনা ছিল ভিন্ন! সম্পত্তির অর্ধেক মালিকানার প্রতি তিনি তখন নেশাগ্রস্ত! তাই স্বামীকে একটি বাড়ি ক্রয়ের জন্য নানাভাবেই প্ররোচিত করেছিলেন। বিপত্তি বাধে, মর্টগেজসহ পারিবারিক খরচের জোগান নিয়ে। দেশসেরা বিদ্যাপীঠের এমবিএ, ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চাকরি ছেড়ে অভিবাসী হয়েছেন। সারভাইভাল চাকরিতে তার ঘোরতর আপত্তি। কথায় কথায় আজমানকে ধর্মীয় বিধান মতে, স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। গোবেচারা আজমান গায়ে গতরে খেটে চলে অবিরত। যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন স্ত্রীর সঙ্গে বাকবিত-ায় জড়িয়ে পড়ে। কয়েকবার ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের অপরাধে আরসিএমপি তথা পুলিশের মুখোমুখি হয়েছেন। পরিশেষে সহায় সম্পদ বিক্রি করে মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। বিপত্তি সেখানেও! আইনগতভাবে সম্পদের অর্ধেক মালিকানা সালমার। অবশেষে কোর্ট কাচারি হয়ে সমান সমান হিস্যায় সহায় সম্পদের ভাগাভাগি হয়। চূড়ান্ত হয় বিয়েবিচ্ছেদ।
অভিবাসনকে যারা সুখ-বিলাসের আশ্রয় মনে করেন, অনেক সময়ই তা হিতেবিপরীত হয়। অভিবাসী সমাজের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে, বেড়ে ওঠা সমাজের রীতিনীতি ও মূল্যবোধের দ্বান্দ্বিক সংঘর্ষ আন্তঃপারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে। ফলে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মেলাতে গিয়ে ব্যক্তির জীবনে তৈরি হয় হতাশা। সেই হতাশা দূরীকরণে আন্তঃপারিবারিক সম্পর্ক একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তাই পরিবর্তিত সমাজের মূল্যবোধকে ধারণ করে, একটি সুন্দর আন্তঃপারিবারিক সম্পর্ক সৃষ্টির মধ্য দিয়েই অভিবাসী জীবনে সুখের অনুসন্ধান করতে হবে, অন্যথায় ব্যক্তি জীবনের পাশাপাশি সামাজিক জীবনেও অভিবাসন একদিন মূল্যহীন হয়ে উঠবে।
লেখক: উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক
