বিদেশিদের সঙ্গে পাল্লা দেশের প্রকৌশলীদের

আপডেট : ০৭ মে ২০২৩, ০২:৩৬ এএম

দেশের সরকারি ও বেসরকারি সেক্টরে বড় বড় উন্নয়ন কাজ হচ্ছে। ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে সড়ক, সেতু, ফ্লাইওভার, টানেল, স্যাটেলাইটের মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। খরস্রোতা পদ্মার বুকে সেতু নির্মাণ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজ চলছে। এসব কাজে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশীয় প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এসব পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে অল্প সংখ্যক বিদেশি প্রকৌশলীর সঙ্গে দেশের প্রকৌশলীরাও দক্ষতা দেখাচ্ছেন। 

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ‘উন্নত জগৎ গঠন করুন’ এই সুমহান আদর্শকে সামনে রেখে বাংলাদেশ অঞ্চলে ১৯৪৮ সালের ৭ মে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট গঠন করা হয়। স্বাধীনতার পর এই সংগঠনটির নাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ (আইইবি) করা হয়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনটিকে তারা প্রকৌশল দিবস হিসেবে পালন করেন। সংগঠনটির আজ ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এই সংগঠনের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৭৮ হাজার। তবে এর বাইরেও অনেক প্রকৌশলী রয়েছেন। সেসব হিসাব করলে ডিগ্রি প্রকৌশলীর সংখ্যা লক্ষাধিক। পাশাপাশি দেশে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী রয়েছেন প্রায় ৫ লাখ। মাঠ পর্যায়ের উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নে তারাও ডিগ্রি প্রকৌশলীদের কার্যকর সহযোগিতা দিয়ে চলেছেন। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেল, পেট্রোবাংলা, বাপেক্সে’র মতো প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন আমাদের দেশের প্রকৌশলীরা। প্রকৌশলগত কাজে বিদেশিদের ভূমিকা সর্বোচ্চ ১০ ভাগ। আর ৯০ ভাগ দেশীয় প্রকৌশলীদের। দেশের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়াররা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) তৈরি করেছেন। ২০১৬ সালে ইভিএম তৈরির কাজ শুরু হয়। আর এটা সফলতা পায় ২০১৯ সালে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হকের ব্যক্তিগত উদ্যোগে বদলে গেছে দেশের ট্রাকের আকার। দেড় দশকের প্রচেষ্টায় সফলতা পেয়েছে তার উদ্যোগ। নিয়ম ভেঙে ট্রাক মালিকরা আকার পরিবর্তন করে দু’পাশে শোল্ডার ও অ্যাঙ্গেল তৈরি করায় দুর্ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল। তার দুর্ঘটনা গবেষণায় কারণ পাওয়ার পর সরকারকে বুঝিয়ে তিনি সেটা বদলে দেওয়ায় ট্রাকের সঙ্গে অন্যান্য পরিবহনের দুর্ঘটনা কমেছে। 

তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা যায়, দেশের মোট প্রকৌশলীর ৬৫ ভাগ প্রকৌশলী বেসরকারি খাতে এবং ৩৫ ভাগ সরকারি খাতে কাজ করছেন। বিদেশেও কর্মরত রয়েছেন বিপুল সংখ্যক প্রকৌশলী। দুবাইয়ের বিদ্যুৎ সরবরাহে জড়িত প্রকৌশলীদের ৫০ ভাগের বেশি বাংলাদেশি। হাতিরঝিল প্রকল্প, কুড়িল ফ্লাইওভার প্রকল্পের সব কাজ দেশীয় প্রকৌশলীরা বাস্তবায়ন করেছেন। এ দুটি প্রকল্পের পরামর্শকও ছিলেন বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা। জিপিএইচ ইস্পাত, সেভেন রিং সিমেন্ট, বসুন্ধরা সিমেন্ট, ক্রাউন সিমেন্ট এই প্রতিষ্ঠানগুলোও পরিচালনা করছেন দেশীয় প্রকৌশলীরা। স্বাধীনের পর দেশে তিনটি প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ছিল। ডিডিসি, বিসিএল ও শহীদুল্লা অ্যাসোসিয়েশন। এখন দেশে প্রায় ৬০টির মতো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দেশের দক্ষ প্রকৌশলীরা এসব পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সফলতার সঙ্গে পরিচালনা করছেন।

দেশের উন্নয়নে প্রকৌশলীদের অবদান বিষয়ে আইইবি’র প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী মো. নুরুল হুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যোগাযোগ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ সরকারি ও বেসরকারি খাতে প্রকৌশলীরা অনন্য অবদান রাখছেন। তার বিনিময়ে দেশে টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে। সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশ যে উন্নয়নের রোড মডেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে তার নেপথ্যের মূল ভূমিকা প্রকৌশলীদের। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণনিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা সমুদ্র বন্দর, মহেশখালীতে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে বিদেশি প্রকৌশলীদের পাশাপাশি দেশের প্রকৌশলীদেরও অসামান্য অবদান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকারি নির্মাণকাজে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। সেখানে অনেক ধরনের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। এজন্য সেখানে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ঢুকে পড়ে। তবে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথভাবে কাজ করছে। দেশের উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতে কর্মরত প্রকৌশলীরা সমানতালে এগিয়ে চলেছেন।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইভিএম তৈরির উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। নকশা প্রণয়নে আমার সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীরা ছিলেন। পরে ২০ জন প্রকৌশলীর একটি কমিটি গঠন করা হয়। তারা সবাই কম্পিউন্টার ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। এই কমিটির সবাই দেশের ছিলেন। ইভিএম তৈরিতে বিদেশি কোনো প্রকৌশলীর সহযোগিতা নেওয়া হয়নি।

জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক  এবং ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ড. গোলাম মোস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রকৌশলীদের চেয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা দেশ গঠনে বড় ভূমিকা পালন করছেন। দেশে এখন বড় বড় ভবন নির্মিত হচ্ছে। এসব ভবনের নকশা দেশের প্রকৌশলীরাই করছেন। এছাড়া বেসরকারি অন্যান্য বিভাগেও বড় ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু, তাদের তেমন মূল্যায়ন করা হয় না। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বড় বড় প্রকৌশলগত কাজে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জড়িত রয়েছে। তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন দেশের প্রকৌশলীরা। ব্যতিক্রমও রয়েছে কিছু। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হাতিরঝিল ও কুড়িল ফ্লাইওভার। এই দুটি প্রকল্পের নকশা চমৎকার হয়েছে। কুড়িলের একটি ফ্লাইওভার কয়েকটি রুটের যানজটের সমাধান করেছে। এ দুটি প্রকল্পের সবকিছু দেশের প্রকৌশলীরা করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রকৌশল বিদ্যায় যারা পড়েন তারা সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র। সরকারি চাকরির কাঠামোগত ত্রুটির কারণে এই মেধাবী শ্রেণি তাদের মেধার সর্বোচ্চটুকু দিতে পারেন না। কারণ, তাদের ওপরে সব প্রতিষ্ঠানে অকারিগরি নেতৃত্ব থাকে। বিদ্যমান এসব ত্রুটি নিরসনে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত