দেখতে দেখতে কেটে গেছে ২৭ বছর। তবুও চোখের পলক ফেললে ১৯৯৬ সালের ১৩ মের টর্নেডোর ভয়ার্ত স্মৃতি ভেসে ওঠে মানসপটে।
এ দিনটি টাঙ্গাইলবাসীর জন্য শোক ও আতঙ্কের দিন। ২৭ বছরেও কাটেনি সেই আতঙ্ক। এখনও স্মৃতি রোমন্থন বা ঘুমের ঘোরে আঁতকে ওঠেন জেলার পাঁচ উপজেলার মানুষ।
১৯৯৬ সালের আজকের দিনে মাত্র পাঁচ মিনিট স্থায়ী টর্নেডোর ধ্বংসাত্মক তাণ্ডব লীলায় জেলার ৫২৩ জন নারী-পুরুষ নিহত ও ৩০ হাজার আহত হন। টর্নেডোর ছোবলে ৮৫ হাজার ঘরবাড়ি, ৮৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ১৭টি মসজিদ এবং ১৪টি মন্দির লন্ডভন্ড হয়ে যায়।
সেদিন বিকেলে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে মুহূর্তের মধ্যে জেলার গোপালপুর, কালীহাতি, বাসাইল, ঘাটাইল ও সখীপুর এ পাঁচটি উপজেলার ৪০টি গ্রাম লন্ডভন্ড হয়ে যায়। ঘরবাড়ি, গাছপালা, গবাধিপশু নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অনেক নারী-পুরুষকে সম্পূর্ণ বস্ত্রহীন ক্ষত বিক্ষত দেহে বিভিন্ন কৃষি জমি, জঙ্গল, পুকুর-ডোবা থেকে উদ্ধার করা হয়।
জানা যায়, ১৯৯৬ সালের ১৩ মে (সোমবার) বিকেল ৪টা ১৭ মিনিটের দিকে আকস্মিকভাবে গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের বেলুয়া গ্রাম থেকে শুরু হওয়া প্রায় পাঁচ মিনিট স্থায়ী প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় (টর্নেডো) আলমনগর ইউনিয়ন হয়ে মির্জাপুর ইউনিয়নের পশ্চিম নুঠুরচর গ্রামে হানা দেয়।
মাত্র দুই মিনিটের ছোবলে গোপালপুর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের ১৬টি গ্রাম নিশ্চিন্ন হয়ে যায়। এতে নিহত হন ১০৪ জন এবং আহত হন প্রায় চার হাজারেরও বেশি মানুষ। পাশাপাশি ঝড়ে ২০০ একর বোরো জমির পাকা ধান বিনষ্ট হয়ে যায়। ১০ হাজার গৃহপালিত পশু-পাখি মারা যায়।
ওই দিনই কালিহাতী উপজেলার তাঁতসমৃদ্ধ এলাকা রামপুর-কুকরাইল গ্রামে টর্নেডো আঘাত হানে। রামপুর ও কুকরাইল গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে ওই দুই গ্রামের একই পরিবারের ৭ জন সহ ১০৫ জন নিহত এবং চার শতাধিক মানুষ আহত হন। রামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে গণকবরে একত্রে দাফন করা হয় ৭৭ জনের মরদেহ।
বাসাইলের মিরিকপুরে ধান কাটার মৌসুম থাকায় উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলার ধান কাটা শ্রমিক সমবেত হয়েছিলেন এ অঞ্চলে। ঝড় থেকে রক্ষা পেতে আতঙ্কগ্রস্ত বহু শ্রমিক মিরিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবনে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্ত উত্তর দিক থেকে ধেয়ে আসা টর্নেডোতে ভবনটি বিধ্বস্ত হয়ে শ্রমিককরা সেখানেই চাপা পড়ে মারা যান।
ঘূর্ণিঝড়ে বাসাইল উপজেলার ১৭ গ্রামের পাঁচ হাজার পরিবারের প্রায় সাড়ে ২৫ হাজার লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিন হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৫-৬টি কাঁচা বাজার, প্রায় দুই হাজার গবাদিপশু, ১০ হাজার হাঁস-মুরগি, সাড়ে ৩০০ টিউবওয়েল ও ২৫ হাজার গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ২৩৭ জনে দাঁড়ায়। তবে বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ছিল আরও অনেক বেশি। আজও কালো মেঘের আনাগোনা দেখলে বাসাইলের মানুষের মনে ভেসে ওঠে মিরিকপুরের সেই ঘূর্ণিঝড়ের আতঙ্কিত স্মৃতি।
টাঙ্গাইলের ৪০টি গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সেদিনের টর্নেডোর আঘাতে মারা যায় অসংখ্য গবাদি পশু, দুমরে-মুচড়ে যায় ঘরবাড়ি, বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয় ফসলের মাঠ। সেই পাঁচ মিনিটের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় (টর্নেডো) টাঙ্গাইল জেলার বৃহদাংশের সবকিছু ধ্বংস করে দেয়।
টর্নেডোয় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের স্মরণে স্ব স্ব এলাকায় স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে প্রতিবছর দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়ে থাকে। এই দিনটিকে স্মরণ করে কালিহাতীর রামপুর-কুকরাইল গ্রামের স্বজন হারানো পরিবারগুলো প্রতি বছর কাঙালি ভোজ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে থাকে। মসজিদে মসজিদে করা হয় বিশেষ মোনাজাত। এবারও দিনব্যাপী অনুরূপ আয়োজন করা হয়েছে।
