এক বছরে দেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগী ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৪ শতাংশ হয়েছে। বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ২৪ শতাংশ বা ৪ কোটি ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৯৩৯ জন রোগটিতে ভুগছেন। সে হিসেবে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। অথচ ২০২১ সালের সরকারি সমীক্ষায় দেশে প্রতি পাঁচজনে একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারিভাবে নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা দেড় লাখের মতো, যা মোট রোগীর ১ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ আক্রান্ত মোট রোগীর মধ্যে চার কোটি সাড়ে পাঁচ লাখ রোগী সরকারি চিকিৎসার বাইরে। এসব রোগী বেসরকারিভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন কি না সে তথ্য সরকারের কাছে নেই।
এমনকি সরকার রোগটি নিয়ন্ত্রণে ‘বাংলাদেশ হাইপারটেনশন কন্ট্রোল ইনেশিয়েটিভ প্রোগ্রাম’ নামে যে কর্মসূচি নিয়েছে, গত চার বছরেরও বেশি সময় সেই কর্মসূচি লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১০ শতাংশ পূরণ করতে পেরেছে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ একটা গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ২০২২ সালে এনসিডি কর্মসূচির সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাবের হার ২৪ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ ১৮-৭০ বছরের মধ্যে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। সরকারের তরফ থেকে এই বিপুল সমস্যাকে সমাধান করার জন্য ২০১৭ সাল থেকে কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। এটার নাম হাইপারটেনশন কন্ট্রোল ইনেশিয়েটিভ প্রোগ্রাম। সরকারের প্রথম লক্ষ্য ১৮ বছরের ঊর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা করা ও আক্রান্তদের চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা।
এ কর্মকর্তা বলেন, আমাদের অর্জন বেশ ভালো। আমরা আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ অথবা ডায়াবেটিসের কারণে ৩০-৭০ বছর বয়সী যে ২২ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, সেই মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনতে চাই।
এ ব্যাপারে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের হাইপারটেনশন কন্ট্রোল প্রোগ্রামের (জাতীয় কর্মসূচির) প্রোগ্রাম ম্যানেজার এবং হাসপাতালের ডিপার্টমেন্ট অব ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চের রিসার্চ ফেলো ডা. শামীম জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা যেভাবে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালনা করছি, সেটা উন্নত দেশগুলোও করছে। আমরা রোগীর ফলোআপে যে টুলস ব্যবহার করি, সেটা দিয়ে একজন রোগীকে এসএমএস করা হয় ও কল করা যায়। আমরা রোগীদের নিয়মিত জানাতে পারছি উপজেলায় ওষুধ আছে। তাকে পরামর্শ দিতে পারছি।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশে কর্মরত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনস্বাস্থ্য সংগঠন গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) বাংলাদেশের প্রধান (কান্ট্রি লিড) মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ সরকার এ বছরের মধ্যে ২০০ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এনসিডি কর্নার করবে। সেখানে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের চিকিৎসা দেওয়া ও পরীক্ষা করা হবে। কাজ এগোচ্ছে। প্রথমে লোকজনদের জীবনাচার পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া হয়। সেটা যখন না মানে তখন তাকে ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সমস্যা হচ্ছে মানুষ ওষুধে অনিয়মিত হয়ে পড়ে। মনে করে ভালো হয়ে গেছে। এসব কারণে পুরো নিয়ন্ত্রণে আসে না। কিন্তু আশাবাদী যে নিয়ন্ত্রণ হবে।
চিকিৎসার আওতায় ১০% রোগী : যেসব উপজেলায় সরকার বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা দিচ্ছে, গত চার বছরে সেসব এলাকার মাত্র ১০ শতাংশ রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনতে পেরেছে সরকার। এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা বলেন, গত চার বছরের বেশি সময়ে একেকটা উপজেলায় যে পরিমাণ জনসংখ্যা আছে, তাদের মধ্যে মোট রোগীর অনুপাত অনুযায়ী যে পরিমাণ রোগী থাকার কথা, তাদের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশকে কর্মসূচিতে আনতে পেরেছি। উপজেলাপর্যায়ে সরকার পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির মধ্যে ৭-১০ শতাংশ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এখনো ৯০ শতাংশ বাকি আছে। এদের পারছি না কারণ এসব জনসংখ্যার একটা অংশ এখানে আসছে, বাকিদের মধ্যে কিছু অংশ বেসরকারি চিকিৎসা নিচ্ছে। উচ্চ রক্তচাপ যাদের হয় তাদের ৮০ শতাংশ জানে না তার রোগটি রয়েছে। তারা উচ্চ রক্তচাপ মাপে না।
৬২% এলাকা এখনো চিকিৎসার বাইরে : বাংলাদেশ হাইপারটেনশন কন্ট্রোল ইনেশিয়েটিভ প্রোগ্রাম নামে ২০১৮ সালের ১৮ নভেম্বর থেকে ঢাকা, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের ২৩ জেলার ১৮২ উপজেলার ১৮৬টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচি নিয়েছে সরকার। সে হিসেবে দেশের মোট উপজেলার মাত্র ৩৮ শতাংশে মানুষকে চিকিৎসা দিতে পারছে সরকার। বাকি ৬২ শতাংশ উপজেলায় রোগটি নিয়ন্ত্রণে সরকারিভাবে এখনো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
কর্মসূচির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের মোট ৪৯২টি উপজেলার মধ্যে মাত্র ১৮৬টি উপজেলায় সরকার বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপ রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসা দিচ্ছে। এসব উপজেলায় উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এনএসডি (অসংক্রামক রোগ) কর্নার থেকে মানুষ এই চিকিৎসা পাচ্ছে।
চিকিৎসকরা আরও জানান, গত বছরও জনসংখ্যার ২১ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ছিল, অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনে একজন রোগী। কিন্তু প্রকোপ বাড়ছে। নতুন পরিসংখ্যানে আক্রান্ত প্রায় ২৪ শতাংশ। সরকার নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা দেড় লাখের ওপরে। বাকিরা সরকারি চিকিৎসার বাইরে।
ওষুধের অভাবে কমছে নিয়ন্ত্রণ হার : উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ রোগ নিয়ন্ত্রণের হার ১০-১২ শতাংশ। অথচ যেসব উপজেলায় নিয়মিত ওষুধ পাচ্ছে মানুষ, সেখানে এই হার ৫৪ শতাংশ। তবে নিয়মিতভাবে ওষুধ না পাওয়ায় ৫৪ উপজেলায় গত ছয় মাসে নিয়ন্ত্রণ হার ৪ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ যেসব এলাকায় ছয় মাস আগে নিয়ন্ত্রণ হার ছিল ৬৪ শতাংশ, তা এখন কমে ৬০ শতাংশ হয়েছে।
কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকরা জানান, এসব কেন্দ্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) থেকে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। কিন্তু তাদের বিতরণ ও বিপণন পদ্ধতি জটিল। তারা ঢালাওভাবে ওষুধ বিতরণ করে। ফলে এক জায়গায় ওষুধের সংকট দেখা দেয়, আরেক জায়গায় ওষুধ নষ্ট হয়। আবার ধারণা করা হয়েছিল, একটা উপজেলায় দুই হাজার রোগী হবে। কিন্তু এখন সেখানে ৭-৮ হাজার রোগী।
এই ওষুধের সমন্বয়হীনতার কারণে নিয়ন্ত্রণ হার কমছে বলেও জানান কর্মকর্তারা। তারা বলেন, ছয় মাস আগে প্রত্যেকটা উপজেলায় নিয়ন্ত্রণ হার ছিল ৬০ শতাংশ। এখন সেটা কমে ৫৪ শতাংশ হয়েছে। দেড় লাখ রোগী নিবন্ধিত। এরা নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছে। আগামী ছয়-সাত মাসের মধ্যে তিন-চার লাখ যদি একসঙ্গে ওষুধ খাওয়া শুরু করে ও তখন যদি নিয়মিত ওষুধ দেওয়া না যায়, তাহলে নিয়ন্ত্রণ হার আরও কমে যাবে। এখনই ইডিসিএল একটা উপজেলায় সর্বোচ্চ ৮-৯ মাস ওষুধ দিতে পারে। বাকি তিন মাস দিতেই পারে না।
যেভাবে দেওয়া হচ্ছে সরকারি চিকিৎসা : ডা. শামীম জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৪৯২টা উপজেলার মধ্যে ১৮৬ উপজেলায় নিয়মিত এনসিডি কর্নার থেকে নিয়মিত ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে। একটা প্রটোকলে তিনটি ওষুধ দেওয়া হয়। সঙ্গে ডায়াবেটিসের দুটি ওষুধ। এই চিকিৎসা পদ্ধতি ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ব্যবহার করা হয়। বেসরকারি পর্যায়ে এই চিকিৎসায় মাসে একজনের খরচ পড়বে সাড়ে ৭০০ টাকার মতো।
নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপ : ডা. শামীম জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০২২ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে যত লোক মারা যায়, তার ৭০ শতাংশ মারা যায় অসংক্রামক রোগে। এই ৭০ শতাংশের মধ্যে ৩৪ শতাংশ মারা যায় হৃদরোগজনিত কারণে। এই ৩৪ শতাংশের মৃত্যুর প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ। তার মানে মৃত্যুর একটা বিশাল অংশ মারা যাচ্ছে উচ্চ রক্তচাপের কারণে। উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয় না করার কারণে এরা জানতেও পারছে না তারা রোগটিতে আক্রান্ত।
এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও বলেন, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, ক্যানসারসহ যত ধরনের সংক্রামক রোগ আছে, সেসব রোগের প্রাদুর্ভাব ৮ দশমিক ৪ শতাংশ; অথচ এককভাবে উচ্চ রক্তচাপের প্রাদুর্ভাব ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে বর্তমানে চারজনের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ সরাসরি কোনো মৃত্যুর কারণ নয়। এর কারণে যেসব রোগ দেখা দেয়, সেসব রোগে মানুষের মৃত্যু হয়।
এই চিকিৎসক আরও বলেন, বাংলাদেশে পুরুষের চেয়ে নারী রোগী ২ শতাংশ কম। নারীদের ৫০ বছর পর্যন্ত এক ধরনের হরমোনের কারণে রোগটি দেখা দেয় না। কিন্তু ৫০ বছরের পর নারী-পুরুষের ব্যবধান কমে আসে।
পাঁচ গ্রামের বেশি লবণ নয় : রোগটি নিয়ন্ত্রণে পরামর্শ দিয়ে ডা. শামীম জুবায়ের বলেন, ‘১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী মানুষকে অবশ্যই রক্তচাপ পরিমাপ করতে হবে। যদি রক্তচাপ নরমাল থাকে, তাহলে আবার ছয় মাস পর মাপতে হবে। আর যদি রক্তচাপের রোগী হিসেবে চিহ্নিত হন, তাহলে অবশ্যই নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। ওষুধ নিয়মিত খেলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি হবে না।’
এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও বলেন, ‘শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কারণ যেহেতু শরীর হার্ট পাম্প করে, অতিরিক্ত ওজন হলে হার্ট সঠিকভাবে পাম্প করতে পারে না। এর ফলে রক্ত গোটা শরীরে প্রবাহিত হতে পারে না। তেল-চর্বিজাতীয় খাবার, অর্থাৎ কোলেস্টেরল বৃদ্ধি করে বা যার সঙ্গে সরাসরি ফ্যাটি অ্যাসিডের সম্পর্ক, সে জাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে। কারণ এসব খাদ্যের কারণে রক্তনালি ব্লক হয়ে যেতে পারে।’
আজ বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস : বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘সঠিকভাবে রক্তচাপ মাপুন, নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং দীর্ঘজীবী হোন’। ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন লিগের সদস্য হিসেবে হাইপারটেনশন কমিটি অব ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ ২০০৬ সাল থেকে ১৭ মে দিবসটি পালন করে আসছে।
