বিএনপি ও তার রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়গুলো আপাতদৃষ্টিতে অভাবনীয়। পঁচিশে বৈশাখ উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তারেক রহমানের ফেসবুক পোস্টে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল; যদিও ওই পোস্টটি নিয়ে পোস্ট-ডিপোস্ট-রিপোস্টের ঘটনা ঘটেছে। তারপরও তা আলোচিত বিষয়। কারণ তা বিএনপির অতিপরিচিত আচরণের সঙ্গে খাপ খায় না।
এবার বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, চলমান যুগপৎ আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে শরিকদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। শিগগির আন্দোলনের যৌথ ঘোষণাপত্র ঘোষিত হবে। আর যৌথ ঘোষণার ভিত্তি হবে কল্যাণরাষ্ট্র। ভাবনাগুলো ভাবনারই বিষয়! কোন পথে হাঁটছে বিএনপি? নানা জন-জোটের সঙ্গে মিলে তাদের সুরই বদলে যাচ্ছে।
যুগপৎ আন্দোলনে থাকা সব শরিক দলকে নিয়ে একটি ঘোষণাপত্র দিতে শেষ মুহূর্তের কাজ সারছে বিএনপি। এত দিন গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে যৌথভাবে ঘোষণাপত্র দেওয়ার কাজটি এগিয়ে নিয়েছিল দলটি। কিন্তু অন্য শরিক দলগুলো এতে আপত্তি তোলায় সেই রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ায় জোটের নেতৃত্বে থাকা বিএনপি।
দলটির নেতারা বলছেন, সবগুলো জোটের মতামত নিয়ে একটি সমন্বিত ঘোষণাপত্রের খসড়া ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। ৯ মে মঙ্গলবার রাতে অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনাও হয়েছে। বৈঠক থেকে কিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এখন সেগুলো ঠিক করা নিয়ে কাজ চলছে। এটি স্থায়ী কমিটির আগামী বৈঠকে চূড়ান্ত হতে পারে। পরে তা ঘোষণা করা হবে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘চলমান আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে শরিকদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। শিগগিরই যুগপৎ আন্দোলনের যৌথ ঘোষণাপত্র দেওয়া হবে। এই ঘোষণার ভিত্তি হবে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।’
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ওপর দায়িত্ব যেটুকু দেওয়া হয়েছিল, সেটুকু সম্পন্ন হয়েছে। এখন দলের নীতিনির্ধারণী বোর্ড বসে সিদ্ধান্ত নেবে। কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। সেগুলো আমলে নিয়ে দ্রুতই ঘোষণা দেওয়া হতে পারে।’
এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, ‘সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্বে গণতন্ত্র মঞ্চ, ‘জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট’ নামে ১১-দলীয় জোট, ১২-দলীয় জোট, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য ছাড়াও এলডিপি (অলি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, গণফোরামের দুই অংশ আন্দোলনে রয়েছে। শুধু গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বিএনপি যৌথ ঘোষণাপত্র দিক, তা চায় না অন্য শরিকরা।
জোট শরিকরা বলছে, সরকারবিরোধী আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। শরিকদের মধ্যে যাতে প্রশ্ন না ওঠে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। শরিকরা যাতে মনে না করে, কোনো জোট বা দলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেমন ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে দেওয়া হয়েছিল। জোটের নেতাদের মতে, যুগপৎ আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে একটি ঘোষণাপত্রের প্রয়োজন।
পুরনো ও নতুন মিত্রদের মধ্যে দ্বন্দ্ব যাতে না বাড়ে তার জন্য বিএনপি যৌথ ঘোষণাপত্রের বিষয়ে পুরনো শরিকদের কথাও শুনেছে। শরিক সব দল ও জোটকে নিয়েই ঘোষণাপত্রের খসড়া তৈরি করেছে বিএনপি। বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের লিয়াজোঁ কমিটি এ নিয়ে চার মাস কাজ করেছে।
বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, ‘এই দফা নিয়ে কেন রফা হচ্ছে না, তারা তা বুঝতে পারছেন না। ছোট ছোট বিষয়ে জোট নেতারা মতভিন্নতা দেখাচ্ছেন। যেমন গণতন্ত্র মঞ্চ তাদের দফায় বলেছে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ গঠন করতে হবে। এই ইউনিট মজদুরদের জুলুম-অত্যাচার বন্ধে কাজ করবে। আমরা বলেছি, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় আলাদা ইউনিট খোলা হবে। এ কথাতেই পুরো বিষয়টি চলে আসে। কিন্তু তারা আরও স্পষ্ট করতে চায়। এমন কয়েকটি ছোট ইস্যু নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। ভাষাগত ভিন্নতা থাকলেও উদ্দেশ্য কিন্তু একই।’
ঘোষণাপত্রের খসড়ার সঙ্গে যুক্ত বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা ও চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার “ভিশন-২০৩০”-এর আলোকে ২৭ দফার রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়। ক্ষমতায় গেলে কী কী করা হবে রূপরেখায় তা স্পষ্ট। মানুষ রূপরেখাকে গ্রহণ করেছে। এর থেকে বিএনপি সরবে না। প্রয়োজনে মিত্রদের দাবিগুলো ২৭ দফা রূপরেখায় উপ-দফা হিসেবে রাখা হবে। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিএনপির দফাগুলো ঠিক রেখে কীভাবে উপদফাসহ যৌথ ঘোষণাপত্র দেওয়া যায় তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। এখন গণতন্ত্র মঞ্চসহ যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানে পৌঁছানো হবে।’
গত ৩০ ডিসেম্বর গণমিছিলের কর্মসূচি দিয়ে জোটের যুগপৎ কর্মসূচি শুরু হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে না বিএনপি। অনেকটা এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাকিদের জানিয়ে দেয় দলটি। এ কারণে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক কয়েকটি দল বিএনপি-ঘোষিত কর্মসূচি পালনে শিথিলতা দেখায়।
গত ৭ ডিসেম্বর তোপখানা রোডে নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গণতন্ত্র মঞ্চ ১৪ দফা তুলে ধরেছিল। পরে বিএনপির ১০ দফা ও গণতন্ত্র মঞ্চের ১৪ দফা মিলিয়ে যৌথ দাবি হিসেবে ৭ দফার খসড়া তৈরি হয়। সেটিসহ গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের ১৩ দফা ও শরিক অন্য দলের নেতাদের মতামত নিয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়। সর্বশেষ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদের সঙ্গে গুলশানের কার্যালয়ে এ বিষয়ে বৈঠক করে বিএনপি।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী দিনে আন্দোলন বেগবান করতে আমরা কিছু দফা দিয়েছি। যতটুকু জানি, বিএনপির স্থায়ী কমিটি বৈঠক করেছে। বিষয়গুলো নিয়ে তারা আরও আলোচনা করবে। দফাগুলো নিয়ে তারা আমাদের সঙ্গে বসবে বলে জানিয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য সঠিক দিনক্ষণ ঠিক হয়নি।’
বাম ঐক্যর শীর্ষ নেতা ও সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমরা জোটের পক্ষ থেকে ১৩ দফা দিয়েছি। এখন পর্যন্ত এসব বিষয়ে আলোচনা হয়নি। বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে আরও অনেক দল বা জোটের পক্ষ থেকে দাবি রয়েছে। আমরা চাই অবিলম্বে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হোক। নির্দিষ্ট দাবি-দফা নিয়ে আমরা যেন এক হয়ে মাঠে নামতে পারি।’
‘জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট’ নামে ১১-দলীয় জোটে রয়েছে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), জাগপা (খন্দকার লুৎফুর), ডেমোক্রেটিক লীগ (ডিএল), বাংলাদেশ ন্যাপ, বিকল্প ধারা (নুরুল আমিন), সাম্যবাদী দল, গণদল, ন্যাপ-ভাসানী, ইসলামী ঐক্যজোট, পিপলস লীগ ও বাংলাদেশ সংখ্যালঘু জনতা পার্টি।
১২-দলীয় জোটে আছে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), কল্যাণ পার্টি, জাতীয় দল, বাংলাদেশ এলডিপি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা, তাসমিয়া প্রধান), এনডিপি, এলডিপি (সেলিম), মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী দল ও সাম্যবাদী দল। লেবার পার্টি আলাদাভাবে বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে রয়েছে। ইসলামী ঐক্যজোট ও সাম্যবাদী দল নতুন দুটি জোটেই আছে।
এ ছাড়া গণতন্ত্র মঞ্চের দলগুলো হলো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, ভাষানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। গণ অধিকার পরিষদ জোট থেকে বেরিয়ে গেলেও তারা বিএনপির নেতৃত্বে আন্দোলনে থাকবে। তারা বেরিয়ে যাওয়ায় গণতন্ত্র মঞ্চে ছয়টি দল রয়েছে।
সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, সমাজতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (মার্কসবাদী-লেলিনবাদী) ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল মিলে ২০১৭ সালে গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য নামে জোট গঠন করে। এ ছাড়া কর্নেল (অব.) অলির নেতৃত্বাধীন এলডিপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও গণফোরামের দুই অংশ (ড. কামাল ও মোস্তফা মহসিন মন্টু) বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে রয়েছে।
