সমীকরণে আরেক ‘কাশ্মীর’

আপডেট : ১৯ মে ২০২৩, ১১:০২ পিএম

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পেরিয়ে গেছে ১৫ মাস। হামলা-পাল্টা হামলায় রাশিয়া ও ইউক্রেনে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে। আহত আর বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যাও বেশুমার। আর বিশ্ববাসীকে ভোগ করতে হচ্ছে ‘বিশ্বযুদ্ধের’ অভিঘাত। যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব আর অজুহাতে দেশে দেশে বেড়েছে জ্বালানি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্রের দাম। অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে দিশেহারা ইউরোপ, আমেরিকা থেকে শুরু করে এশিয়া-আফ্রিকার সম্পদশালী দেশগুলোও। খোদ যুক্তরাষ্ট্রও পড়েছে ‘দেউলিয়া’ হওয়ার ঝুঁকিতে। কিন্তু এরপরও যুদ্ধ থামানোর আন্তরিক কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না কেউই। বরং যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে যে মেরুকরণের শুরু হয়েছিল তা আরও প্রকট হয়েছে। বদলেছে যুদ্ধের ক্রীড়নক রাষ্ট্রগুলোর পরিকল্পনাও। রাজনৈতিক সাময়িকী দ্য পলিটিকো বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধ আরও দীর্ঘস্থায়ী হোক এবং স্থায়ী সংঘাতে রূপ নিক তেমনটাই চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। সাময়িকীটির ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা-ইউক্রেন যুদ্ধ অন্তত এক দশক ধরে চলুক। সেটি রূপ নিক কোরীয় উপদ্বীপ বা কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের মতো।

চলতি মাসের শুরুতেই ক্রেমলিনে ড্রোন হামলার পর যুদ্ধে নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাশিয়া যেমন হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে তেমনি ইউক্রেনও প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি নতুন করে তৎপর হয়েছে ইউক্রেনের মিত্ররা। যুক্তরাষ্ট্রসহ জি-৭-ভুক্ত অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল শুক্রবার থেকে জাপানে শুরু হওয়া জি-৭ সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে ইউক্রেন ইস্যুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। ওই সম্মেলনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিরও যোগ দেওয়ার কথা। সম্মেলনের একটি সূত্রের বরাতে আল-জাজিরা বলছে, ওই সম্মেলন থেকেই আসতে পারে নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের দেশগুলো সবার আগে যে জোট গঠন করেছিল, তার নাম ছিল ‘কাউন্সিল অব ইউরোপ’। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তখনো স্বপ্নের পর্যায়েও ছিল না। সেই পরিষদের সদস্য সংখ্যা এখন ৪৬। ইউক্রেনের ওপর হামলার কারণে রাশিয়াকে বহিষ্কার করা হয় কাউন্সিল অব ইউরোপ থেকে। বেলারুশের সদস্যপদ আপাতত স্থগিত করা হয়েছে।

এদিকে গত সপ্তাহে ইউরোপ চষে বেড়ানো জেলেনস্কি গতকাল হঠাৎই সৌদি আরব সফরে গিয়েছেন। সেখানে শুরু হওয়া আরব লীগ সম্মেলনে যোগ দেওয়া আরব দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে তার। জেলেনস্কি গতকাল টুইটারে লিখেছেন, ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করতে প্রথমবারের মতো সৌদি আরব সফর শুরু করলাম। আরব বিশ্বের সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্কও এগিয়ে নিতে চাইছি।’ এ ছাড়া রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়াসহ ইউক্রেনের অন্য অঞ্চলগুলোয় আটক রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্ত করা, ইউক্রেনের নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনা, যুদ্ধ বন্ধে শান্তি আলোচনা এবং জ্বালানিসংক্রান্ত পারস্পরিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলোও নিয়েও আবর নেতাদের সঙ্গে কথা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের মধ্যস্থতায় প্রায় এক যুগ পরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে যে ‘সুসময়’ এসেছে, সৌদি আরব ও ইরানের দ্বন্দ্ব নিরসন হয়েছে তাতে করে অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান ইতিমধ্যে হারাতে বসেছে। এ ছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কয়েক দফা প্রস্তাব দেওয়া চীনও নতুন করে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেনকে। গত সপ্তাহে কিয়েভ সফর করা চীনের বিশেষ দূত বলেছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধে আলোচনা ছাড়া কোনো সমাধান নেই। সব পক্ষকেই নিজ থেকে আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। পারস্পরিক আস্থা তৈরি করতে হবে। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে, যাতে যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনা শুরু করা যায়।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমা শক্তি বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র চায় না যুদ্ধ বন্ধ করে চীন বিশ্ব দরবারে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করার পথে আরও এগিয়ে যাক। যুক্তরাষ্ট্র চায় না সংঘাত বন্ধ হয়ে একটা ফলাফল এখনই আসুক। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে সংশয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্র তাই ইউরোপেই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতময় পরিস্থিতি বজায় রাখতে চায়।

জার্মান মালিকানাধীন যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী পলিটিকোর বৃহস্পতিবার এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা করছে। এমনকি সম্ভব হলে এ যুদ্ধকে অন্তত এক দশক চালিয়ে নিতে চায় দেশটি। সাময়িকীটির দাবি, কেবল ইউক্রেন নয়, একই সঙ্গে কোরীয় উপদ্বীপ, দক্ষিণ এশিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলেও চলমান সংকট দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা রয়েছে ওয়াশিংটনের।

পলিটিকো বলছে, এ বিষয়ে বাইডেন প্রশাসনও অবগত। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা এবং হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে।

ইউক্রেন সংকট দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত এক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, আমরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছি, যাতে করে সংকটটিকে একেবারে জমিয়ে বা গলিয়ে ফেলা যায়। ওই কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে এ পরিকল্পনা বাইডেন প্রশাসনের সর্বোচ্চ মনোযোগ পেয়েছে। যেখানে বিগত মাসগুলোতে, ইউক্রেন সংকটকে কেন্দ্র করে মার্কিন তৎপরতা ছিল জরুরি ভিত্তিতে এবং স্বল্পমেয়াদি।

অন্য দুই কর্মকর্তা এবং বাইডেন প্রশাসনের সাবেক এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার একটি উদ্দেশ্য হতে পারে এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নিজে ভালোভাবে প্রস্তুত হবে। তারা জানান, মার্কিন কর্মকর্তারা কিয়েভের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সম্পর্ক, সেই সঙ্গে ন্যাটো সামরিক জোটের সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্ক কী হবে তা নিয়েও ভাবছেন।

বিশ্লেষকদের ধারণা, এ ধরনের অচলাবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুবিধাজনক। কারণ, এতে যুদ্ধ ব্যয় অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি কিয়েভ কিংবা মস্কো কাউকেই একে অপরের ওপর জয়ী হতে দেবে না। যুক্তরাষ্ট্রের এ পরিকল্পনার অর্থ হলো, যুদ্ধ অনেকাংশেই কমে যাবে; কিন্তু কোনো পক্ষই একে অপরের বিপক্ষে নিজেকে জয়ী বলে ঘোষণা করতে পারবে না। এমনকি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ শেষ বলেও ঘোষণা করতে পারবে না। এর আরও সহজ অর্থ হলো রণক্ষেত্রে যুদ্ধ অনেকটাই কমে যাবে এবং সামরিক ব্যয় হ্রাস পাবে, যেটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুবিধাজনক।

কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, মাঠের যুদ্ধে ফল আসবে না মনে করেই যুক্তরাষ্ট্র যেমন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা করছে তেমনি ইউরোপও নিয়েছে নতুন উদ্যোগ। রাশিয়ার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে রেজিস্ট্রার গঠনের উদ্যোগ নিয়ে ‘কাউন্সিল অব ইউরোপ’। গত সপ্তাহে আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকইয়াভিকে কাউন্সিল অব ইউরোপের শীর্ষ সম্মেলনে ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও তথ্যপ্রমাণ নথিভুক্ত করতে একটি ‘রেজিস্ট্রার অব ড্যামেজ’ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়ার হামলা শুরুর পর থেকে ইউক্রেনে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেগুলো নথিভুক্ত করে ভবিষ্যতে রাশিয়ার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে সেই তালিকা কাজে লাগবে বলে আশা করা হচ্ছে। ৪৬ সদস্যের মধ্যে ৪০টি দেশ এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে। শুধু আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বসনিয়া-হারজেগোভিনা, সার্বিয়া, হাঙ্গেরি ও তুরস্ক আপাতত সেই উদ্যোগে শামিল হচ্ছে না। কাউন্সিল অব ইউরোপের এই উদ্যোগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণও নিশ্চিত হয়েছে।

রাশিয়া স্বেচ্ছায় ক্ষতিপূরণ না দিলে বিদেশে থাকা দেশটির সম্পদ কাজে লাগিয়ে অর্থ সংগ্রহের একাধিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আইনি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এমন পদক্ষেপ অত্যন্ত কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে যুদ্ধাবস্থা বজায় থাকলে রাশিয়াকে নানা সময়ে নানা ধরনের চাপে ফেলা যাবে বলেই এই রেজিস্ট্রার গঠনের সিদ্ধান্ত।

তবে ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্র কী চায়, দিন শেষে সেটি খুব বেশি গুরুত্ব পাবে না ইউক্রেনের কাছে। কারণ যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে অঞ্চলটি ততই পারমাণবিক হামলার ঝুঁকির মধ্যে পড়বে দেশটি। ঠিক কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান ও কোরীয় উপদ্বীপের দুই কোরিয়ার বিরোধের মতো। দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘাতের মতো। একটা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পশ্চিমাদের ফায়দা লোটার সুযোগ দিলেও ক্রিমিয়া আর দনবাস হয়ে উঠবে আরেক কাশ্মীর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত