রাজনীতি করতে করতে প্রবীণ, ‘বুড়ো হাড়ে’ ঘাস জমছে। দীর্ঘ সময় রাজনীতি করেছেন তারা, ২৫-৩০ বছর তো হবেই। একসময় ছাত্রদল করতেন, এখন সাবেক; তারপরও বিএনপির রাজনীতিতেই যুক্ত আছেন তারা। তাদের কয়েকশ এখনো পদবঞ্চিত।
বিএনপি বলেছিল, ছাত্রদল থেকে যারা বাদ পড়বে তাদের যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কিন্তু বঞ্চিতরা কোথাও নেই, তারা দৃশ্যমান নয়। যুবদলেও নেই, স্বেচ্ছাসেবক দলেও নেই; ছাত্রদলে তো নেই-ই। তাদের এতিম-দশাই বলতে হবে।
এই তিনটি অঙ্গসংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হওয়ার পর পদবঞ্চিত নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথমে ছাত্রদল, পরে যুবদল ও সর্বশেষ স্বেচ্ছাসেবক দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়েছে। তিনটি সংগঠনের কোথাও আমরা নেই। আমরা বাদ পড়েছি।’
উল্লিখিত সংগঠনটির তিনটির শীর্ষ নেতারা বলেছেন, সময় শেষ হয়ে যায়নি। যারা যোগ্য তাদের পদায়ন করা হবে।
পদবঞ্চিত নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দীর্ঘদিন রাজনীতি করার পরে এখন আমাদের কোথাও পদ নেই। এটা নিজের জন্য যেমন বিব্রতকর তেমনি পরিবারের কাছেও কিছু বলার থাকে না। না করেছি বিয়ে, না করেছি ব্যবসা, না করেছি চাকরির চেষ্টা। সব হারিয়ে আমরা নিঃস্ব। আমাদের এ অবস্থার জন্য দায়ী সংগঠন তিনটির শীর্ষ নেতারা।
তারা বলেন, ‘তারপরও আমরা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের (বিএনপি) রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নিচ্ছি। আশা করছি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আমাদের দিকে তাকাবেন।’
গত বছর ৪ সেপ্টেম্বর এসএম জিলানীকে সভাপতি ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রাজীব আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের পাঁচ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি (আংশিক) ঘোষণা করে বিএনপি। ছয় মাস পর ঈদের আগে আগে গত ২০ এপ্রিল ২১৩ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি অনুমোদন করে বিএনপি। ২৫১ সদস্যের মধ্যে ২১৩ সদস্যের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। বিভাগীয় পদসহ বাকি পদগুলো পরে ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়। কমিটি ঘোষণার পর পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
বাদপড়াদের মধ্যে রয়েছেন গত কমিটির সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রদল নেতা মির্জা ইয়াসিন আলী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০০ সাল থেকে ছাত্রদল করছি। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলাম একসময়। সর্বশেষ স্বেচ্ছাসেবক দলের সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক ছিলাম। ২৩ বছর ধরে রাজনীতি করে এখন পদবঞ্চিত। অথচ আমার নামে এখন ১০টি মামলা।’
বাদপড়াদের মধ্যে আরও রয়েছেন হাজি নাছির উদ্দীন মোল্লা, নেছার উদ্দিন সফি, জসিম হাওলাদার, মনিরুজ্জামান মনির, মো. রাসেল খান, শাহ আলম রনি মৃধা, আবদুল মমিন, মো. আল মামুন, অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ।
গত কমিটির ২৮৬ জনকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত কমিটিতে চারশর বেশি নেতা ছিলেন। কিন্তু মিটিং ডাকলে একশজনও উপস্থিত হতেন না। কর্মসূচিতে উপস্থিতিও কম ছিল। সে হিসেবে তিনশজনকে বাদ দেওয়ার কথা। এখনো কিছু পদ খালি আছে। যারা যোগ্য তাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
যুবদল : সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও মোনায়েম মুন্নার নেতৃত্বে যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয় চলতি বছর ২২ ফেব্রুয়ারি। কমিটি ঘোষণার পর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পদবঞ্চিত নেতারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন।
পদবঞ্চিত তারিক উজ জামান তারেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৯৯০ সালে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর পৌর শাখা ছাত্রদলের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হই। সর্বশেষ রাজীব-আকরাম কমিটির তিন নম্বর সহসভাপতি ছিলাম। সেই কমিটি বিলুপ্তির পর সাইফুল আলম নীরব ও সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর নেতৃত্বে যুবদলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে শুরু করি। কিন্তু কমিটিতে জায়গা হয়নি। ভেবেছিলাম সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও মোনায়েম মুন্নার নেতৃত্বে যুবদলের নতুন কমিটিতে জায়গা হবে। কিন্তু হয়নি।’
তারেকের মতো বাদপড়া সাবেক ছাত্রদল নেতারা হলেন শোয়াইব খন্দকার, আশরাফুর রহমান বাবু, তারিকুজ্জামান, হুমায়ুন কবির, আবুল হাসান, জাকির হোসেন খান, মনিরুজ্জামান রেজিন, আবদুল ওয়াহাব প্রমুখ।
পদবঞ্চিতদের যুবদলে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। সাধারণ সম্পাদক মোনায়েম মুন্না কারামুক্ত হলে তাদের পদায়ন করা হবে।’
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের পূর্বঘোষিত কমিটি বর্ধিত করে ৮৯ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারপরও কিছু নেতা বাদ পড়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্রদলের বিগত কমিটির মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিন (ঢাবি), এস এম হল ছাত্রদল ঢাবি শাখার আহ্বায়ক হাবিবুল বাশার, সহ-সম্পাদক মোজাহিদুল ইসলাম জাহিদ প্রমুখ।
পদবঞ্চিত নিজাম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্বিতীয় দফায় ছাত্রদলের কমিটি বর্ধিত করা হলেও আমি বাদ পড়েছি। নেতাদের সঙ্গে কথা বললে তারা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার অঙ্গীকার করেছেন। তাই অপেক্ষার প্রহর গুনছি আমরা।’
ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদবঞ্চিতদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজপথে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলমান থাকায় সময় বের করা যাচ্ছে না। জেলা ও মহানগর কমিটি করার পর বাদপড়াদের মধ্যে যারা যোগ্য তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
