গ্রামীণ সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দিতে ২০১৩ সালে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে এই কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হয়। চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে এই এজেন্টের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৪০৯ জন। আর এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ লেনদেন। আর গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় এই লেনদেনের পরিমাণ ২২ শতাংশ বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
এজেন্ট ব্যাংকিং হলো শাখা না খুলে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সেবা দেওয়ার একটি ব্যবস্থা। ব্যাংক এশিয়া প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে যুক্ত হলেও বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলে ২৬টি ব্যাংক এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। যাত্রার আট বছরেই দ্রুতগতিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এ সেবা। দেশব্যাপী ২১ হাজার ৯৯টি আউটলেটে দেওয়া হচ্ছে ব্যাংকসেবা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যয়সাশ্রয়ী এ সেবায় গ্রাহক এজেন্ট আউটলেটে সহজেই তার বায়োমেট্রিক বা হাতের আঙুলের স্পর্শে হিসাব পরিচালনা করতে পারেন। ফলে কম খরচে সহজে ব্যাংকিংসেবা পাওয়ায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ব্যাংকগুলোও এ সেবা প্রদানে আগ্রহ দেখাচ্ছে। সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারলে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে আগামীতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি ঘরে ঘরে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ হিসাব বলছে, গত মার্চ মাস শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গ্রাহক ছাড়িয়েছে ১ কোটি ৮৯ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি। এই সেবার আওতায় গ্রাহক আমানত হিসাবে জমা করেছেন ৩১ হাজার ৮৩ কোটি টাকা, যা আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৩০ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। তিন বছর আগে ২০২১ সালের মার্চে ছিল মাত্র ৩ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা।
গত মার্চ মাসে ব্যাংকগুলো তাদের এজেন্টের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করেছে ৮৫১ কোটি টাকা। আলোচিত সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ৭৭ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এ হিসাবে দৈনিক গড়ে লেনদেন হচ্ছে আড়াই হাজার কোটি টাকার ওপর। এজেন্ট ব্যাংকিং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বিতরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মার্চে ব্যাংকগুলোর এজেন্টের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া একই সময় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১০৮ কোটি টাকার বিভিন্ন বিল পরিশোধ করেছে মানুষ।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে ব্যাংকের শাখা নেই, সেখানে নগদ টাকা জমা, উত্তোলন, স্থানান্তর, বিভিন্ন পরিষেবার বিল পরিশোধ ও রেমিট্যান্সের অর্থ গ্রহণসহ সাধারণ সব সেবাই এখন পাচ্ছে গ্রামের মানুষ। এসব সেবা পেতে বাড়তি চার্জও লাগছে না। সহজে লেনদেন করাসহ বাড়ির কাছে ব্যাংকসেবা পাওয়ায় গ্রাহকের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে পুরুষ গ্রাহক দাঁড়িয়েছে ৯৩ লাখ ৫৫ হাজার ৩৫৭ জন। একই সময়ে নারী গ্রাহক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২ লাখ ৯৮ হাজার ৭৮৫ জন। এ ছাড়া ২ লাখ ৮১ হাজারের বেশি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রান্তিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অর্থ লেনদেন হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে এমন ব্যক্তি এজেন্টশিপ নিতে পারবেন। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হয় ন্যূনতম এইচএসসি বা সমমান পাস। এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে প্রত্যেক এজেন্টের একটি চলতি হিসাব থাকতে হয়। এ সেবার মাধ্যমে ছোট অঙ্কের অর্থ জমা ও উত্তোলন করা যায়। তা ছাড়া প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স স্থানীয় মুদ্রায় বিতরণ, ছোট অঙ্কের ঋণ বিতরণ ও আদায় এবং এককালীন জমার কাজও করা যায়। উপযোগ সেবা বিল পরিশোধের পাশাপাশি সরকারের অধীনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ দিতে পারছেন এজেন্টরা। এ ছাড়া নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ আবেদন, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের নথিপত্র সংগ্রহ করতে পারছেন এসব এজেন্ট।
এজেন্টরা কোনো চেক বই বা ব্যাংক কার্ড ইস্যু করতে পারেন না। তারা বৈদেশিক বাণিজ্য-সংক্রান্ত কোনো লেনদেনও করতে পারেন না। এ ছাড়া এজেন্টদের কাছ থেকে কোনো চেকও ভাঙানো যায় না। লেনদেনের ওপর পাওয়া কমিশন থেকে এজেন্টরা আয় করেন।
