দাম না কমালে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারিতেও কোনো প্রভাব পড়ছে না চট্টগ্রামের বাজারে। এখানো পাইকারি ও খুচরা উভয় বাজারেই পেঁয়াজের ঝাঁজে ক্রেতাদের চোখে পানি ঝরছে। চট্টগ্রাম নগরীর খুচরা বাজারে রবিবার প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৯০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, দ্রুত আমদানির পদক্ষেপ না নিলে কোরবানির আগেই পেঁয়াজের দাম সেঞ্চুরি ছুঁতে পারে।
বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, পেঁয়াজের বাজার এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে একাধিক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ থাকার সুযোগে ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে মুনাফা লুটছে তারা।
কৃষকদের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখা হলেও এখন পেঁয়াজের মুনাফা ভোগ করছে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।
কৃষকদের কাছ থেকে পেঁয়াজ কিনে গুদামজাত করে তারা দুই মাসে ধাপে ধাপে প্রতি কেজি পেঁয়াজের ওপর ৫০ টাকা দাম বাড়িয়েছে। এখন কৃষকের কাছে আর পেঁয়াজ নেই। সব পেঁয়াজ তাদেরই হাতে।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের আড়তদাররা বলছেন, পেঁয়াজের মোকামগুলোতেই এখন পেঁয়াজের দাম বেশি। সেখান থেকে প্রতি মণ পেঁয়াজ ২৭০০-২৭৫০ টাকা দাম পড়ছে; যা পুরোপুরি অস্বাভাবিক। এর বাইরে পরিবহন ব্যয়সহ অন্যান্য খরচ যুক্ত হচ্ছে। তাদের মতে, এসব দেশীয় পেঁয়াজ দুই মাস আগে সব খরচ যুক্ত করার পরও পাইকারিতে ২৮-৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও এখন ৭০-৭৫ টাকায় উঠেছে। এখানে তো উৎপাদন খরচ যা ছিল তাই রয়েছে। তারপরও লাগামহীনভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে।
চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের আড়তগুলো ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি আড়তেই পর্যাপ্ত পরিমাণ পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে খাতুনগঞ্জের আড়তদার মাহবুবুর রহমান বলেন, ভারতীয় পেঁয়াজ না থাকলেও দেশীয় পেঁয়াজের কোনো সংকট নেই। কিন্তু দুই মাসে প্রতি কেজি পেঁয়াজে ৪০ টাকা দাম বেড়েছে। ভারতীয় পেঁয়াজ না থাকার সুযোগে
কৃত্রিমভাবে এই দাম বাড়ানো হয়েছে। এর নেপথ্যে কারা রয়েছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা গেলে পেঁয়াজের দাম এমনিতেই কমে যেত।
খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজের মার্কেট খ্যাত হামিদুল্লাহ মিয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইদ্রিস মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, শনি ও রবিবার দুই দিন আড়তে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৭০-৭২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আড়তে যেসব মোকাম থেকে পেঁয়াজ আসছে সেখানেই বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। যে কারণে পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হওয়ার পর আমাদের এই দাম নিতে হচ্ছে।’ তিনি জানান, দেশীয় পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি পুনরায় অনুমতির বিষয়ে নানা আলোচনার পর খুচরা ব্যবসায়ীরা এখন পেঁয়াজ কেনার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছে। তারা একসঙ্গে বেশি পেঁয়াজ কিনছে না।
পাইকারি বাজারে ৭০-৭২ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকায়। ফিরিঙ্গি বাজারের গ্রোসারি শপ আমিন স্টোরের স্বত্বাধিকার আহমদুর রহমান বলেন, আড়ত থেকে পেঁয়াজ কেনার পর আড়তদারি, পরিবহন ব্যয় সব মিলিয়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ৮০-৮৫ টাকা পড়ছে। এর মধ্যে আবার নষ্ট পেঁয়াজও থাকছে। তাই ৯০ টাকার কমে বিক্রি করলে লোকসান দিতে হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছিল কৃষকদের লাভবান করার জন্য। কিন্তু সেই লাভের গুড় এখন খাচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। আর পকেট খালি হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার করে অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর মনিটরিংয়ের দাবি তুলেছি। কিন্তু প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় তারা অনেকটা বেপরোয়াভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে নিয়েছে। এ অবস্থার অবসান না হলে সাধারণ ক্রেতাদের সব সময় তাদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকতে হবে।’
গত ১৫ মার্চ হতে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যেই প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ৩০ থেকে বেড়ে ৯০ টাকায় উঠেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এই দাম বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, যদি দাম কমানো না হয় তাহলে ভারত থেকে ফের পেঁয়াজ আমদানির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামের বাজারে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।
