বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক বয়স্কদের ঠিকানা

আপডেট : ২৪ মে ২০২৩, ১০:১৮ পিএম

আধুনিক জমানায় বৃদ্ধাশ্রম একটি জনপ্রিয় কনসেপ্ট। উন্নত দেশে ডে-কেয়ার সেন্টারের পাশাপাশি ওল্ড হোমও জনপ্রিয়। পাশ্চাত্য ধারণায় তাড়িত হয়ে আমাদের দেশেও প্রবীণ নিবাস, ওল্ড হোম বা বৃদ্ধাশ্রম ক্রমেই আলোচিত হয়ে উঠছে।

যদিও আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক রীতি-নীতি অনুযায়ী, বয়স্কদের জন্য আলাদা নিবাস অনেকটা ‘বনবাসে’ যাওয়া বা পাঠানোর মতোই ঘটনা। কেননা, যুগ যুগ ধরে আমাদের সমাজে বয়স্করা পরিবারের অপরিহার্য সদস্য হিসেবে নিজ বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। দু-চার দশক আগে পরিবারের বয়স্ক সদস্যকে আলাদা জায়গায় পাঠানোর কথা আমাদের সমাজে কেউ কখনো কল্পনাও করেনি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ক্রমেই বদলে যাচ্ছে। ‘প্রীতি প্রেমের পুণ্য বাঁধনে’র চিরায়ত ভাবনার বদলে তৈরি হচ্ছে ‘বৃদ্ধাশ্রম’! ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ‘স্বর্গ-সুখের’ ধারণা।

নতুন যুগের মানুষেরা বৃদ্ধাশ্রমের পক্ষে উঠেপড়ে লেগেছে। যেন ওই বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে পারলেই সব দায়দায়িত্ব থেকে মুক্তি! পাশ্চাত্য দেশগুলোতে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে সমাজের মূল চালিকাশক্তি। তাই ১৮ বছর পার হলেই সেখানে পরিবারের বন্ধন ছিন্ন করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তাড়া থাকে, তেমনি শেষ বয়সে কীভাবে চলবে, তা নিজেরই ভেবে বের করার দায়িত্ব থাকে। সেখানে উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। আবার উপার্জনের টাকা বাবা-মাকে দিতে হয় না। কেউ তা আশাও করে না। অন্যের গলগ্রহ হয়ে না থেকে ওল্ড হোমের আশ্রয় তাই সেখানে জীবনের স্বীকৃত সমাধান। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক গতিশীল জীবনচর্চার অনুশীলন শুরু হয়ে গেলেও পারিবারিক নির্ভরশীলতা এখানে মোটেও কমে যায়নি। এখানে যেমন ১৮ হলেই পিতা-মাতার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, তেমনি বাবা-মায়ের ভার নেওয়াটাও সন্তানের কর্তব্য হিসেবেই বিবেচিত হয়। আমাদের বাবা-মায়েরা এখনো সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এমনকি বিয়ে দেওয়ার জন্য নিজেদের সব সঞ্চয় ব্যয় করেন। আবার দেখা যায়, সন্তান চাকরি পাওয়ার পর নিজের বেতন থেকে প্রতি মাসে বাবা-মাকে টাকা পাঠায়। এই টাকায় শুধু পিতা-মাতাই নয়, বরং ছোট ভাইবোনের খরচও চলে। এই পারস্পরিক সহযোগিতা, একত্রে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা আমাদের সমাজব্যবস্থার অনন্য সৌন্দর্য। তাহলে বৃদ্ধাশ্রমের আমদানি কেন?

আমাদের দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বৃদ্ধাশ্রম হয়ে উঠছে কিছু আত্মকেন্দ্রিক আধুনিক মানুষের দায়িত্ব এড়ানোর হাতিয়ার। আর্থিকভাবে সচ্ছল সন্তান নৈতিকতার অবক্ষয়ের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে পিতা-মাতাকে এক অর্থে পরিত্যাগ করে ফেলে যাচ্ছে এসব আশ্রমে। এককালের একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। আর তাতে স্থান হচ্ছে না বৃদ্ধ পিতা-মাতার। বাবা-মায়ের সেবা-যতœ আর ভরণপোষণকে কেন্দ্র করে শুরু হচ্ছে দাম্পত্য কলহ, আর এর পরিণতিতে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। সন্তান নিজের পরিবার নিয়ে আরামেই দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু বৃদ্ধ পিতা-মাতার খরচ দেওয়া দূরে থাক, একবার গিয়ে খবরও নিচ্ছে না। আঁস্তাকুড়ে আবর্জনা ফেলার মতো করে একবার বৃদ্ধাশ্রমে তাদের দিয়ে এসেই দায়িত্ব শেষ করছে। নিজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগ পর্যন্ত বাবা-মাকে নিংড়ে নিয়ে শেষ বয়সে তাদের ছুড়ে ফেলার জন্য এমন একটি জায়গাই যেন তাদের দরকার ছিল!

আসলে আধুনিক জীবনে একদিকে ভোগবাদের বিপুল আয়োজন, অন্যদিকে ক্রয়ক্ষমতার ক্রমহ্রাস জীবনকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক সংকটে ফেলেছে। আধুনিক প্রজন্ম এই দুষ্টচক্রে পড়ে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছে। বেকারত্ব ও ছদ্মবেকারত্ব বাড়ছে, সৃষ্টি করছে মনের অসুখ। এই মনের অসুখেরই একটা বহির্প্রকাশ হচ্ছে পরিবারের বয়স্ক সদস্যকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া।

কিন্তু কোনো মানুষের জন্য বৃদ্ধাশ্রম মোটেও কাক্সিক্ষত ঠিকানা নয়। যে বয়সে মানুষ পরিবারের সদস্যদের সান্নিধ্য কামনা করেন, ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদের কাছে পেতে চান, তখন তাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিলে মানুষটি আসলে মরার আগেই মরে যায়। কারণ প্রবীণরা খুবই অসহায়, বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়াটা নিষ্ঠুর অমানবিকতা।

তার মানে এই নয় যে, দেশে বৃদ্ধাশ্রম থাকবে না। যাদের সন্তানসন্ততি নেই, দেখভাল করার মতো তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য স্বজন নেই, কিংবা যাদের ছেলেমেয়ে বাইরের দেশে থাকেন, তাদের জন্য উন্নতমানের বৃদ্ধাশ্রম বা প্রবীণ নিবাস তৈরি করাই যেতে পারে। কেননা একটা সময়ে গিয়ে তাদের পক্ষে একা থাকা, শরীরের যত্ন নেওয়া, বাজার করা, রান্না করা সম্ভব হয় না। তাদের জন্য অবশ্যই প্রবীণ নিবাসের কথা ভাবা যেতে পারে।

আবার যেসব মানুষ নিজেরাই আধুনিক ব্যবস্থাসম্পন্ন বৃদ্ধাশ্রম বেছে নিচ্ছেন, তাদের কথাও আলাদা। হ্যাঁ, ইদানীং স্বেচ্ছায় সমবয়স্ক মানুষদের সঙ্গে আনন্দে শেষ জীবনটা কাটানোর আকাক্সক্ষা থেকে কেউ কেউ বৃদ্ধাশ্রমকে বেছে নিচ্ছেন। এর মধ্যে কোনো গ্লানি নেই। নিজের ইচ্ছামতো, স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার সবারই আছে। একটি বৃদ্ধাশ্রমে যদি নিজেদের মতো করে নানান অনুষ্ঠান পালন, বেড়াতে যাওয়া, সান্ধ্য বৈঠক, ধর্মপালন, বিনোদন ইত্যাদির সুযোগ থাকে, নিঃসঙ্গ জীবনের নিরাপত্তা থাকে, তাহলে সেই বৃদ্ধাশ্রমের বিরোধিতা করার কোনো কারণ নেই। বরং এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যেতে পারে।

হয়তো বিত্তবান একজন বয়স্ক মানুষ নিজ গৃহেই কাজের লোক রেখে দিন কাটাতে পারতেন, কিন্তু একাকিত্ব তাতে কাটত না। ছেলেমেয়েদের ব্যস্ত জীবনে সময় সত্যি নেই। দূর দেশে থাকার কারণেই অনেক সময় সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে বাড়িতে বৃদ্ধ পিতা-মাতার নিরাপত্তাও একটা সমস্যা হয়। বাড়ির কর্ম সহায়করাই অনেক সময় বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদের খুন করে সব লুটে নিতে চায়। অনেক সময় একাকী মরে পড়ে থাকতে হয়। বেশ কয়েকদিন পর দরজা ভেঙে মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এটা আরও বেদনাদায়ক। এই পরিণতি কারও কাম্য নয়। তার থেকে তিনি যদি বৃদ্ধাশ্রমে থাকতেন, তবে অন্তত তার দেখাশোনা হতো, সময়মতো ডাক্তার, সেবা পেতেন। উপরন্তু সমবয়সী মানুষের সঙ্গ তাকে করত সমৃদ্ধ। বৃদ্ধ বয়সে এটাই প্রাপ্য সবার। এসব সুযোগ যদি কোথাও মেলে এবং সেখানে যদি কেউ স্বেচ্ছায় যেতে চায়, তবে সেটা অবশ্যই ইতিবাচক।

কিন্তু সন্তানসন্ততি, আত্মীয়পরিজন যাদের আছে, তাদের বৃদ্ধাশ্রমে ঠেলে পাঠানো তো অবশ্যই নিষ্ঠুরতা। বয়স্ক পিতা-মাতার ঠাঁই কেন হবে না পরিবারে? ছোট ছোট শিশুরা কেন তাদের শৈশবে দাদা-দাদি, নানা-নানির স্নেহ থেকে বঞ্চিত হবে? রূপকথার ঝুলি নিয়ে কেন তারা গৃহের পরিবেশ করবেন না আমোদিত? নিঃসন্দেহে এটা একটা সামাজিক সমস্যা।

আর বৃদ্ধাশ্রম এই সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমস্যাকে এড়িয়ে চলার একটি উপায় মাত্র। নিজের জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য নিরন্তর ছুটে চলা আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনের যে দ্বন্দ্ব দুয়ের মাঝে এ যেন এক চাতুর্যপূর্ণ সমঝোতা। বাবা-মা কোনো আইন বা সামাজিকতার জন্য নয়, বরং সন্তানের প্রতি অকৃত্রিম স্নেহ আর ভালোবাসার কারণেই শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তাদের জন্য কাজ করে যান। এর বিপরীতে বাবা-মায়ের প্রতিও সন্তানদের দায়িত্ব রয়েছে। মনে রাখা দরকার যে, প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে একদিন সবাই বৃদ্ধ হবেন। আজ যে টগবগে তরুণ, সেও এক সময় ন্যুব্জ হবে বয়সের ভারে। নির্মম পরিহাস হলো, এই কথাটি কেউ মনে রাখে না। তাই বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তোলার চেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানরা যেন দায়িত্বশীল হন, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাবা-মাকে সন্তান মনে করে, সেবা-যত্ন, শুশ্রুষা দিয়ে তাদের বাকি জীবনটাকে যতটুকু সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে রাখা যায়, তা করে যেতে হবে। অবহেলা, অযতœ আর দায়মুক্তির মনমানসিকতা নিয়ে কোনো সন্তানই যেন তার মাতা-পিতাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে না দেন।

কোনো প্রবীণকেই যেন অবহেলা আর অনাদরে জীবনযাপন করতে না হয়, তা সুনিশ্চিত করতে সমাজের সচেতন ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যমসহ সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। বৃদ্ধাশ্রম নয়, প্রত্যেকের আশ্রয় হোক নিজের পরিবারে, সন্তানেরই ঘরে। প্রতিটি পরিবার যেন প্রবীণদের জন্য সুখ আর স্বস্তির নিবাস হিসেবে গড়ে উঠে, সেই চেষ্টা করতে হবে।

প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় সংসদে পিতা-মাতার ভরণপোষণ বিল-২০১৩ পাস করা হয়। যেখানে বলা হয়েছে, সন্তানকে পিতা-মাতার সঙ্গে থাকতে হবে এবং পিতা-মাতার প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবাসহ সব ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হবে। কিন্তু আইন পাস করে ভালোবাসা, কর্তব্য, শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভম নয়। এর জন্য প্রয়োজন নৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

লেখক:  কলামিস্ট

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত