বিএনপির সমাবেশ

৩ জেলায় হামলা সংঘর্ষ, নোমানের গাড়ি ভাঙচুর

আপডেট : ২৭ মে ২০২৩, ০৬:১৩ এএম

নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবিতে কেন্দ্র ঘোষিত সমাবেশ কর্মসূচি পালন ঘিরে গতকাল শুক্রবার বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিন জেলায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ঢাকার কেরানীগঞ্জে বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা জেলার সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায়সহ দুপক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। খাগড়াছড়িতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

এ সময় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানকে বহনকারী গাড়ি ভাঙচুর এবং অন্তত আটজন আহত হন। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে দল দুটির নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে পুলিশসহ উভয়পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।

কেরানীগঞ্জের জিনজিরায় গতকাল বেলা ১১টার দিকে দলীয় কার্যালয়ের সামনে ঢাকা জেলা বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। সেখানে বিএনপির সমাবেশের আগে সকাল পৌনে ১১টার দিকে যুবদলের একটি মিছিল ছাটগাঁও থেকে দলীয় কার্যালয়ের সামনে আসছিল। মিছিলটি জিনজিরায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সামনে পৌঁছলে দল দুটির নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে দুপক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। পরে বিএনপির উত্তেজিত নেতাকর্মীরা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেন। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সংঘর্ষের জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের কেন্দ্রীয় জেলাভিত্তিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ (গতকাল শুক্রবার) কেরানীগঞ্জে সমাবেশ হচ্ছিল। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ওদের অফিস থেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে ইট মারতে মারতে আমাদের সমাবেশের দিকে আসছিল। এ সময় আমাদের ছেলেরা বাঁচার জন্য ওদের হামলা প্রতিহত করে। হামলা প্রতিহত করতে আমাদের ছেলেরা নিপুণ রায়কে সামনে নিয়ে প্রতিবাদ করে। তখন আওয়ামী লীগ কর্মীদের ছোড়া ঢিলের আঘাতে নিপুণ রায়ের মাথা ফেটে যায়। নিপুণ ছাড়াও আমাদের আরও ৫০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছে।’ ইটের আঘাতে আহত নিপুণ রায়কে চিকিৎসার জন্য ঢাকার ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তবে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ম ই মামুন গয়েশ্বরের অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘বিএনপি নেত্রী নিপুণ রায়ের নেতৃত্বে জিনজিরা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগের ২০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছে।’

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সংঘর্ষে ও ইটের আঘাতে দুপক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।’

এদিকে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে বেলা সাড়ে ১১টায় পূর্বনির্ধারিত স্থানেই বিএনপি সমাবেশ করে। ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু আশফাকের সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আজ (গতকাল) কেরানীগঞ্জের শান্তি সমাবেশকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে আমাদের দলের নেতাকর্মীর ওপর হামলা করেছে। হামলা মামলা করে আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না। সারা দেশেই আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হচ্ছে, মামলা হচ্ছে। এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। এদের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে।’

এর আগে গতকাল বিকেলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি আয়োজিত সমাবেশে রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগ আগুন নিয়ে খেলছে। এ আগুনেই পুড়ে ছারখার হবে আওয়ামী লীগ। তিনি আরও বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কেরানীগঞ্জে নাকি বিএনপি আক্রমণ করেছে? তাহলে নিপুণ হাসপাতালে কেন?’

খাগড়াছড়িতে নোমানের গাড়ি ভাঙচুর : খাগড়াছড়ি শহরের কলেজ রোড এলাকায় গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানকে বহনকারী প্রাইভেট কারের পেছনের কাচ ভাঙচুর হয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এ ঘটনার জন্য পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমএন আফছার অভিযোগ করে বলেন, ‘পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে যোগ দিতে আসা কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল্লাহ আল নোমানকে গাড়িবহর নিয়ে সমাবেশস্থলে নিয়ে আসার সময় জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে পরিকল্পিতভাবে হামলা করা হয়েছে। এ সময় কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যানের গাড়িতেও হামলা চালানো হয়। হামলায় তিনি রক্ষা পেলেও জেলা বিএনপির সহসভাপতি ক্ষেত্রমোহন রোয়াজাসহ আমাদের পাঁচজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।’

অন্যদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্মলেন্দু চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের দেশব্যাপী সন্ত্রাস-নৈরাজ্যের প্রতিবাদে পূর্বনির্ধারিত শান্তি সমাবেশে যোগ দিতে আসা নেতাকর্মীরা অফিসে বিশ্রাম নেওয়ার সময় বিএনপির গাড়িবহর থেকে আমাদের কার্যালয়ের দিকে বিএনপির উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীরা উসকানিমূলকভাবে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চারজন আহত হয়েছে।’

জেলার পুলিশ সুপার নাইমুল হক বলেন, ‘পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে উভয়পক্ষের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।’

বিএনপির কর্মসূচি ঘিরে গত কয়েক দিন ধরেই শহরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। উভয়পক্ষ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করছে।

লক্ষ্মীপুরে পাল্টা পাল্টা কর্মসূচি : লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে পাল্টা পাল্টা কর্মসূচি ঘিরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে পুলিশসহ উভয়পক্ষের ১৫ জন আহত হয়েছেন। গতকাল বেলা ৩টার দিকে রামগঞ্জ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাতারপাড়া চৌরাস্তায় এ ঘটনা ঘটে। দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় আবদুর রহমান, কবির ভাট, আবদুর রহমান মিলন, শেখ কামরুল ও নজরুল ইসলাম পিন্টুসহ তাদের ১০ নেতাকর্মী আহত হন বলে বিএনপি নেতাদের দাবি। আহতদের উদ্ধার করে রামগঞ্জ উজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

দুপক্ষের এ সংঘাতের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ইটপাটকেলের আঘাতে আহত হয়েছেন দৈনিক কালবেলার রামগঞ্জ প্রতিনিধি ইকবাল হোসেন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৬-৭ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। উভয়পক্ষ সংঘর্ষের সময় ১০টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, খাগড়াছড়ি ও কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধির পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত