ইমরান খানের ভেতর-বাহির

আপডেট : ২৯ মে ২০২৩, ০৭:২৬ পিএম

পাকিস্তান শুধু নয় উপমহাদেশে এখন অন্যতম আলোচিত চরিত্র পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। গুলির মুখ থেকে ফিরে আসা, গ্রেপ্তার হওয়া, পরে আবার জামিন পাওয়া-সাম্প্রতিক সময়ে এত ঘটনার মুখোমুখি আর কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়েছেন কি না খোঁজ নিতে হয়।

ইমরান খান সব সময় যেন প্রধান চরিত্র হয়ে থাকতে চান। ক্রিকেট মাঠে যেমন ছিলেন আলোচিত, একের পর এক বিয়ে আর ভাঙনের খেলায়ও তিনি নায়ক। এরপর পাকিস্তানের মতো অনিশ্চিত ও বিদসংকুল দেশের রাজনীতিতে নেমে হয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রীও। সেটাও টিকল না তিন বছরের বেশি। প্রধানমন্ত্রিত্ব হারিয়ে হয়ে গেলেন বিরোধী শিবিরের প্রধান সেনাপতি। বলতে গেলে পাকিস্তানের রাজনীতি এখন ঘুরছে তাকে কেন্দ্র করে।

কিন্তু যাকে নিয়ে এত কিছু তিনি নাকি একটা ডিমও সেদ্ধ করে খেতে জানেন না, অতিথি আপ্যায়ন কাকে বলে জানেন না সেটাও।

আর এসব তথ্য জানিয়েছেন আতিকা রেহমান। তিনি পাকিস্তানের বহুল প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডন’-এর কূটনীতি প্রতিবেদক।

বিভিন্ন সময়ে ইমরান খানের সাক্ষাৎকার নিতে যান তিনি। সেখানে ব্যক্তি ইমরানকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা হয় তার।

যেমন তিনি ২০১৩ সালে ইমরান খানের সাক্ষাৎকার নিতে যান তার লাহোরের বাসায়। সেদিন সকালবেলা ছিল। ইমরান তার সামনেই ডোবা তেলে ভাজা পুরি খাচ্ছিলেন। তবে তাকে সামান্য পানীয় ছাড়া আর কিছু খাওয়ার অনুরোধ জানাননি।

আতিকা ইমরানের এক বন্ধুর বরাত দিয়ে আরো জানান, ইমরান যখন জেমিমার (খান) সঙ্গে ছিলেন, তখন কেউ তাদের বাসায় গেলে আতিথ্য পেতেন। আর ইমরান, তিনি জানেনও না কীভাবে একটা ডিম সেদ্ধ করতে হয়, তিনি কখনো কাউকে এক গ্লাস পানিও পান করার অনুরোধ জানাবেন না, আর এটাই তার স্বভাব।

প্রসপেক্ট ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আতিকা লিখেছেন, একজন সাংবাদিক যখন কোনো রাজনীতিবিদের কাছে যাবেন, তাকে বিস্কুট থেকে শুরু করে খামে ভরা টাকা পর্যন্ত সাধা হবে। কিন্তু ইমরান এসবের ধার ধারেন না। তার কাছে গেলে শুধু তাকেই পাওয়া যাবে।

আতিকার সঙ্গে ইমরান খানের কথা হয় তার তৃতীয় স্ত্রী বুশরা বিবিকে নিয়েও। যিনি পাঞ্জাব শহরের একটি রক্ষণশীল জমিদার পরিবারের মেয়ে। সুফি সাধকদের প্রভাবাধীন এলাকায় বুশরা বিবির বেড়ে ওঠা। যিনি ‘পিরনি’ হিসাবে এলাকায় বিখ্যাত। সুফি ঐতিহ্যে আধ্যাত্মিক গুরুদের দেওয়া উপাধি ‘পিরনি’।

৪৮ বছর বয়সী বুশরা বিবি প্রার্থনার মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত আত্মাদের সাহায্য করে থাকেন বলে জানা যায়।

২০১৪ প্রথম স্ত্রী জেমিমার সঙ্গে ইমরানের বিচ্ছেদ হয়। এর এক দশক পর তিনি রেহাম খানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রেহাম খান ছিলেন একজন ব্রিটিশ-পাকিস্তানি। তিনি সংবাদমাধ্যম বিবিসির আবহাওয়া উপস্থাপক হিসেবে কাজ করতেন। তবে বিচ্ছেদের পর তিনি ইমরান খানের যৌনতা ও মাদক গ্রহণ নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান।

নিজের বিয়ে ও সংসারজীবন নিয়ে ইমরান খান বলেন, ‘সহজভাবে বলতে আমি আসলে কখনো ‘আত্মার সঙ্গী’ (সোলমেট) পাব সেটা বিশ্বাস করিনি। কিন্তু আমি এখন জানি একজন আত্মার সঙ্গী কী। আমি আমার জীবনের বেশির ভাগ সময় একা ছিলাম, অনেক বিয়ে ভেঙে যেতে দেখেছি… আমি বিয়ে করতে চাইনি আর, কারণ আমি ভেবেছিলাম এ কাজ আর করব না। মাঝে মাঝে, আমি এই শব্দটি 'আত্মার সঙ্গী' শুনতাম... এবং আমি ভাবতাম, আমি কি কখনো সেই সৌভাগ্য পাব?"

তিনি জানান, নেলসন ম্যান্ডেলা একবার তাকে এবং জেমিমাকে তহবিল সংগ্রহের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে ম্যান্ডেলা এবং তার শেষ স্ত্রী গ্রাসা মিশেলকে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখেন। তাদের ভেতরের প্রেম ওই অবস্থায়ও বোঝা যাচ্ছিল। ইমরান তখন মনে মনে ভাবছিলেন, ‘আমার কি কখনো একজন ‘আত্মার সঙ্গী’ হবে? তবে এখন আমার একজন (বুশরা বিবি) আছে’।

জানা যায়, আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনার জন্য খান যখন বুশরার কাছে ‘গোপনে’ যেতে শুরু করেন তখন মিডিয়া এ সম্পর্ক নিয়ে কথা তোলে। তখন প্রচার করা হয় যে, বুশরা ইমরানকে প্রধানমন্ত্রী হতে সাহায্য করতে পারেন। পরে তাকে বিয়ে করে ইমরান নিজেকে নতুন রাজনৈতিক উচ্চতায় নিয়ে যাবেন। অবশেষে বুশরা তার তার পাঁচ সন্তানের জনক স্বামীকে তালাক দেন এবং ২০১৮ সালে ইমরান খানকে বিয়ে করেন।

বুশরাকে নিয়ে প্রচলিত গুজব হলো, যে তিনি জাদু জানতেন এবং মাংস খাওয়া জিনদের একটি বাহিনীকে পালতেন।

বুশরাকে বিয়ের পর ইমরান খান দাফনে যোগ দেওয়া করা বন্ধ করে দেস। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা সহযোগী হলেও দাফনে উপস্থিত হতেন না। অনেকের সন্দেহ, ইমরান খান বিশ্বাস করছেন যে, মৃত ব্যক্তির সঙ্গে একই ঘরে থাকলে দুর্ভাগ্য বাড়বে তার। এমনকি ২০২১ সালে তিনি বেলুচিস্তানে ইসলামিক স্টেটের হাতে নিহত সংখ্যালঘু হাজারা জাতির খনি শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিতর্কিত হন।

এমনকি এটাও শোনা যায় যে, ইমরান খানের এসব ‘কুসংস্কার’ সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্কে প্রথম ফাটলের জন্ম দেয়। আর সেটি ছিল গোয়েন্দা প্রধান নিয়োগে তার অতিরিক্ত সময় নেয়া। একজন মন্ত্রীর দাবি, জনৈক নারী (বুশরা বিবি) তাকে উপযুক্ত সময়ে গোয়েন্দা প্রধান নিয়োগের ঘোষণা দিতে বলেছিলেন। যার কারণে বিলম্ব ঘটে।

ইমরান খান যদিও বর্তমানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন, তবে অনেকে মনে করেন তাদের সঙ্গে যোগসাজশেই ইমরান ক্ষমতায় আসেন। কারণ পাকিস্তান পিপলস পার্টি জুলফিকার আলি ও বেনজির ভুট্টো) ও পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ শরিফ) দুর্নীতিতে পর্যুদস্ত। তাদের বাইরে ইমরান খানকে দিয়ে দুর্নীতি যদি কমানো যায়। তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী খুশি হয় যখন ইমরান ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রয়োজনীয় ১৩৭ আসন না পেয়ে ১১৫ আসন পায়। ঘাটতি আসনগুলোর মাধ্যমে সেনাবাহিনী ইমরানের কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপের সুযোগ পায়। তবে উচ্চ শ্রেণির দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ইমরান খান সরকারকে ব্যবস্থা নিতে দেখা গেল না। পরে তিনি ক্ষমতাচ্যুতও হন।

ইমরান সব সময়ে বলে আসছেন, পাকিস্তান হবে ধনী-গরিব সবার। তিনি ‘ভিআইপি’ কালচারকে অপছন্দ করতেন, চাইতেন এসব উঠে যাক। কিন্তু নিজে যখন চলাচল করতেন তখন আবার ‘ভিআইপি’ সুবিধা পেতে অস্থির হয়ে উঠতেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত