দেশজুড়ে ঘটে চলা ঘটনা বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত; কিন্তু সব ঘটনাই একটা ব্যবস্থার অধীন। ব্যবস্থাটা পুঁজিবাদী। এই ব্যাপারটাকে সবাই যে দেখতে পান তা নয়; কেউ কেউ আছেন দেখেও দেখেন না। পুঁজিবাদীরা আবার জাতীয়তাবাদীও হন। জাতীয়তাবাদী হলে লুণ্ঠন, প্রতারণা, নির্যাতন ইত্যাদি পন্থায় পুঁজি সংগ্রহে অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। বৈধতাও এক রকমের থাকে; যা করছেন নিজের জন্য করছেন না, করছেন জাতির জন্য, ভাব করা যায় এই রকমের। এবং জাতি বলতে সবার কথা যদিও বলেন, কিন্তু বোঝান নিজেদের। নিজেদের শ্রেণিকে, অর্থাৎ পুঁজির মালিকদেরই। তাই দেখা যায় আধুনিক কালের ভয়ংকর ভয়ংকর সব জাতীয়তাবাদীরা সবাই পুঁজিবাদী ছিলেন; যেমন হিটলার, মুসোলিনি, ট্রাম্প, কিংবা এখনকার মোদি, পুতিন, ইত্যাদি। চীন এক সময়ে সমাজতন্ত্রী ছিল, কিন্তু সে যে পুঁজিবাদী হবে তার ইশারা নিজেই তুলে ধরেছিল, প্রথমে জাতীয়তাবাদী হয়ে এবং তারপর দ্রুতই সমাজতন্ত্রের আবরণটা গায়ে চেপে রেখে কার্যক্ষেত্রে আগ্রাসী ধরনের পুঁজিবাদী তৎপরতায় লিপ্ত হয়ে। সারা পৃথিবীর বাজার দখলে সে এখন অস্থির। সস্তায় পণ্য উৎপাদন করছে শ্রমিকদের বঞ্চিত করে, রাজনৈতিক বন্দিসহ বিভিন্ন ধরনের বন্দিদের উৎপাদনের কাজে খাটিয়ে, নানা দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য শিল্প-কারখানা গড়ে তুলে। তারা ঘুষ দিচ্ছে, প্রতারণা করছে, এবং শেষ পর্যন্ত মস্ত বড় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে ছোঁয়াচে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে দিয়ে। একদিন যে চীন সমাজবিপ্লবের আদর্শ প্রচার করে সারা বিশ্বে বিপ্লবীদের কাছে প্রশংসার এবং বুর্জোয়াদের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছিল আজ সে স্মরণীয় হয়েছে রোগ ছড়ানোর কৃতিত্বের দরুন। বোঝা যায় পুঁজিবাদ কেমন শক্তিশালী, অপ্রতিরোধ্য ও দুষ্টবুদ্ধিসম্পন্ন।
পুঁজিবাদের প্রগতিশীল ভূমিকাটা বিশ্ব-ইতিহাস ধারণ করে বৈকি। মর্যাদা দিয়েই ধারণ করে। সামন্তবাদের সঙ্কীর্ণতা, অন্ধকারাচ্ছন্নতা ও আত্মসন্তুষ্ট বেষ্টনী ভেঙে ফেলে সে একদিন বের হয়ে এসেছিল; এবং তখন বিশ্বাস করার কারণ ঘটেছিল যে তার কারণে মানুষের মুক্তি অত্যাসন্ন। কিন্তু সে মুক্তি যে এলো না তার মূল কারণ পুঁজিবাদ শ্রেণিশোষণ ব্যবস্থা না ভেঙে উল্টো তাকে আরও গভীর ও ব্যাপক করে ছাড়ল। দ্রুতই রূপ নিল সে সাম্রাজ্যবাদের। সাম্রাজ্যবাদ-কবলিত দেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যে লড়াইটা গড়ে উঠেছে তাতে জাতীয়তাবাদীরা থেকেছেন, থেকেছেন সমাজতন্ত্রীরাও। সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতার সময়ে জাতীয়তাবাদের একটা প্রগতিশীল ভূমিকা ছিল, কিন্তু যেহেতু জাতীয়তাবাদীদের আকাক্সক্ষাটা মূলত ছিল পুঁজিবাদীই, সমাজতন্ত্রী নয়, তাই ওই জাতীয়তাবাদের ভেতরে একটা দুর্বলতা ছিল অনিবার্য। যে জন্য দেখা যায় যে বিদেশিরা বিদায় হওয়ার পরে জাতীয়তাবাদী স্বদেশিরা যখন ক্ষমতায় বসেছে তখন দেশের মানুষদের সঙ্গে তারা সেই রকমের আচরণই করেছে যে-রকমের আচরণ একদিন বিদেশি শাসকরা করত। অনেক ক্ষেত্রে তাদের আচরণ বিদেশিদের চেয়েও নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে। অন্তর্নিহিত কারণটা ছিল আদর্শিক। আদর্শিকভাবে আগের শাসকগুলোর মতোই পরের শাসকগুলোও পুঁজিবাদীই।
সমাজ-পরিবর্তন তাই প্রয়োজন। এর জন্য দরকার সামাজিক-বিপ্লবের। জাতীয়তাবাদীরা নিজেদের শ্রেণিগত স্বার্থকে স্থায়ী করার প্রয়োজনে সমাজ-বিপ্লবের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ-বিপ্লবের জন্য খুব বেশি দরকার হলো জ্ঞানের। নির্মোহ জ্ঞানের চর্চাকে সাম্রাজ্যবাদী অধিপতিরা নিরুৎসাহিত করে, জাতীয়তাবাদী শাসকরাও সেটাই করে থাকে। একই কারণে। সামাজিক বিপ্লব যাতে না ঘটে। জাতীয়তাবাদীদের জ্ঞানচর্চাতে আবার এক ধরনের জাতিগত অহমিকা থাকে।
খুবই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইতিহাসের জ্ঞান। জাতীয়তাবাদীরা ইতিহাসকে সাজাতে চায় নিজেদের শ্রেণিগত সাজসজ্জায়। যেমন ট্রাম্প বলছেন আমেরিকা হচ্ছে শ্বেতাঙ্গদের দেশ; ওই পবিত্রভূমিতে অন্য সবাই বহিরাগত, যদিও সে-দেশে তিনি নিজেই একজন বহিরাগত, তার পূর্বপুরুষ এসেছে অন্যদেশ থেকে। মোদি বলছেন ভারতবর্ষ হচ্ছে হিন্দুদের দেশ, অহিন্দুরা সবাই বহিরাগত। সে জন্য তিনি নাগরিকত্ব প্রমাণের বিধি চালু করতে চাচ্ছেন। যদিও তার খেয়াল নেই যে তার নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের দলিলই তার কাছে নেই। আরেক জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক ইসরায়েলের দুর্নীতিতে-পারদর্শী প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু, যিনি মনে করেন ফিলিস্তিনের সবটা ভূমিই ইহুদিদের, আরবরা সবাই সেখানে বহিরাগত। এই তিন জাতীয়তাবাদীর মধ্যে এখন বেশ ইয়ার-বান্ধব সম্পর্ক।
জাতীয়তাবাদীরা সর্বত্র হস্তক্ষেপ করে, ইতিহাসকেও বাদ দেয় না। ইতিহাসকে তারা নিজেদের সুবিধার আলোকে রচনা করে। এবং সেই রচনা বিতরণ করতে থাকে, নিজেদের আধিপত্যকে সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে। ব্যাপারটা কখনো কখনো বেশ কৌতুককর হয়ে ওঠে। যেমন মোদি-সমর্থিত ভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা বলে যে পরবর্তী সময়ে যেসব জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে তার জ্ঞান মহাভারতেই পাওয়া যাবে। আকাশের উড়োজাহাজ? সে তো মহাভারতের কালের গরুড় পাখিরই আধুনিক সংস্করণ। সত্যটা বিজাতীয়রা এতকাল চাপা দিয়ে রেখেছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৭-এ; কিন্তু সেই রাষ্ট্রের দ্বারা উৎসাহিত ইতিহাসবিদদের দেখা যেত পাকিস্তানের জন্য চার হাজার বছরের সভ্যতার একটা ইতিহাস খুঁড়েটুরে বের করতে গলদঘর্ম হচ্ছেন। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো নাকি পাকিস্তানেরই পূর্ব-ইতিহাসের অন্তর্গত। ঘটনাক্রমে এলাকাগুলো যেহেতু পাকিস্তানে পড়েছে। তবে পশ্চিম অংশের ওই ইতিহাসের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের ইতিহাসের সংযুক্তি দেখানোর চেষ্টা অবশ্য তারা করেননি। তা জাতীয়তাবাদী কল্পনারও তো একটা সীমা আছে।
একইভাবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরও কিন্তু দেখা যাচ্ছে এই অঞ্চলের গোটা ইতিহাসের ওপরই একটা জাতীয়তাবাদী আধিপত্য (নাকি আগ্রাসন?) প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলেছে। বাংলাদেশের এশিয়াটিক সোসাইটি সম্প্রতি গবেষণা-নির্ভর একটি ইতিহাস গ্রন্থ প্রকাশ করেছে, দু’খণ্ডে। প্রকাশনাটি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে মিলে লিখেছেন, এবং সব লেখাতেই ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য উন্মোচন রয়েছে। কিন্তু মুশকিল হলো জাতীয়তাবাদের সেই আধিপত্যের ব্যাপারটা নিয়ে। প্রকাশনাটির নাম রাখা হয়েছে History of Bangladesh; কিন্তু বাংলাদেশ বলে কোনো রাষ্ট্র তো ১৯৭১-এর আগে ছিল না। যে-রাষ্ট্রের বয়স পঞ্চাশ বছরও পূর্ণ হয়নি তার ইতিহাস এই জনভূমিতে জনবাস শুরুর ইতিহাসের আদিপর্ব পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাটা তো দাঁড়ায় পাকিস্তানি ইতিহাসবিদদের সেই চার হাজার বছরের ইতিহাস খোঁজার মতোই লোমহর্ষক। প্রকাশনাটির দ্বিতীয় শিরোনামটি বরং ইতিহাসসম্মত। সেটি হচ্ছে Early Bengal in Regional Perspective up to 1200 CE. এই শিরোনামে বাস্তব সত্যটা ধরা আছে, এতে জাতীয়তাবাদ নেই। সে জন্যই এটি যথার্থ।
জাতীয়তাবাদের সমস্যাটা এশিয়াটিক সোসাইটির গবেষকরা বাংলাপিডিয়া নামে যে এনসাইক্লোপিডিয়াটি রচনা ও প্রকাশ করেছেন সেখানেও বিদ্যমান। এই এনসাইক্লোপিডিয়াটিতে তথ্যভ্রান্তির সমালোচনা আছে; এও বলা যাবে যে এত তাড়াহুড়ো করে হৈ চৈ না বাধিয়ে এই রকমের বড় মাপের ও জরুরি কাজ যে পরিমাণ মনোযোগ ও শ্রম দাবি করে তা ব্যয় করে এ বিশ্বকোষটি রচনা করলে ভালো হতো। সেসব কথা অবশ্য এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। প্রাসঙ্গিক যা তা হলো জাতীয়তাবাদী উৎসাহ এবং জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে ধারণা। উৎসাহ ও ধারণা দুটোই পাওয়া যাবে এনসাইক্লোপিডিয়ার nationalism ভুক্তিটিতে। উৎসাহটা ধরা পড়ে ভাষাতে, ধারণার ভ্রান্তি রয়েছে বক্তব্যে। জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘ইতিহাসের অভিজ্ঞতা’, ভূগোল, বর্ণ, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতিকে। ভাষা আসছে একেবারে শেষে, অথচ ভাষারই আসার কথা সবার আগে। পরাধীন ভারতবর্ষের হিন্দু ও মুসলিম জাতীয়তাবাদীরা ধর্মকেই মুখ্য বিবেচনা করত, ভাষাকে উপেক্ষা করে। এশিয়াটিক সোসাইটির বিশ্বকোষও ধর্মকে রাখা হয়েছে ভাষার আগে, এবং জাতীয়তাবাদের প্রথম উপাদান হিসেবে যে ‘ইতিহাসের অভিজ্ঞতা’র কথা বলা হয়েছে তেমন কথা পাকিস্তানিরাও বলতে পছন্দ করত। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলতে তারা সাম্প্রদায়িক অভিজ্ঞতাই বোঝাতে চাইত। বিশ্বকোষটির ‘nationalism’ ভুক্তিটির শুরুতেই Bangladesh জাতীয়তাবাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটি আসলে তথাকথিত ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদেরই ইংরেজি অনুবাদ। কিন্তু এটা তো পরিষ্কার যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ বলে বাস্তবে কিছু নেই, আছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাদেশি নাগরিকত্ব। অর্থাৎ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের যারা নাগরিক তারা সবাই বাংলাদেশি, তবে এই রাষ্ট্রের অধিকাংশ নাগরিকই জাতীয় পরিচয়ে বাঙালি, কারণ তারা বাংলাভাষী, কিন্তু এখানে ক্ষুদ্র হলেও অন্য জাতিসত্তার মানুষরাও বাস করে, যাদের মাতৃভাষা বাংলা নয়, এবং সে-কারণে যারা বাঙালি নয়। এ বিষয়ে জ্ঞানতাত্ত্বিক বিভ্রান্তি সৃষ্টিটা মোটেই কাক্সিক্ষত নয়, এবং তা সমষ্টিগত অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধকস্বরূপ।
জাতীয়তাবাদে ভাষার প্রধান গুরুত্ব সম্পর্কেও এই ভুক্তিতে এই ভ্রম এমন বক্তব্যের জন্য পরিসর তৈরি করে দিয়েছে যে পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালিদের জন্য দুঃসহ ছিল যে-ঘটনা সেটা হলো পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য। এমন কথা সাধারণ কথাবার্তায় চলে, কিন্তু বিশ্বকোষের অন্তর্ভুক্তিতে অচল। কারণ আধিপত্যটা আসলে পশ্চিম পাকিস্তানের ছিল না, ছিল পাঞ্জাবি শাসকদের; এবং পশ্চিম পাকিস্তানে একটি নয় চার চারটি জাতি বসবাস করত, তারা হলো পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচ ও পাঠান যাদের ওপর পাঞ্জাবি সামরিক আমলারা শাসন-শোষণ চালাত। বিশ্বকোষটিতে বড় রকমের ভ্রম আরও একটি আছে। সেটি হলো এই ধারণা যে, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের চিন্তা একাত্তরের যুদ্ধের সময়ে ভারত ও সোভিয়েট ইউনিয়ন থেকে import করা হয়েছিল, কারণ ওই দুটি দেশ যুদ্ধকালে বাংলাদেশের মিত্র ছিল। বিশ্বকোষটির মতে আমদানি-করা এসব চিন্তা স্থানীয় মানুষের কাছে মোটেই গ্রহণযোগ্য হয়নি। জাতীয়তাবাদীদের এইখানেই সবচেয়ে বড় অসুবিধা, সমাজতন্ত্রকে নিয়ে তাদের আতঙ্ক কিছুতেই বাগ মানে না।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
