কেসিসির গত পাঁচটি নির্বাচনের তিনটিতেই জয়ী হয় জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। এবার মেয়র পদে বিএনপির কোনো প্রার্থী না থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই। সাধারণ ভোটারদেরও আগ্রহ কম। তবুও থেমে নেই প্রচারণা। তীব্র গরমের মধ্যে কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেকের বিজয় অনেকটা সুনিশ্চিত জেনেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা নানা কৌশল অবলম্বন করে এগোচ্ছেন।
জানা গেছে, নির্বাচনে মেয়র পদ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে তেমন আগ্রহ না থাকলেও বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগকালে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা তালুকদার আব্দুল খালেকের বিগত দিনের কাজ নিয়ে সমালোচনা করছেন। ভোটারদের নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছেন উপস্থিত হয়ে তাদের পক্ষে ভোট প্রদানের জন্য। বলছেন, তালুকদারের সময়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করলেও জনদুর্ভোগ কমেনি। প্রকল্পের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হয়নি। পরিকল্পনার অভাবে শুধু অর্থের অপচয় হয়েছে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক গড়ার মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীদের আকৃষ্টের চেষ্টা, সরকারের সমালোচনা করা, উন্নয়ন-সমস্যা নিরসন বিষয়ে নানা প্রতিশ্রুতি, তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব অবস্থান, তীব্র তাপপ্রবাহ উপেক্ষা করে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়াসহ বেশ কিছু কৌশল অবলম্বন করে ভোট বাড়ানোর চেষ্টা করছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। কেউ কেউ বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে গোপনে অর্থের বিনিময়ে আঁতাত করার চেষ্টা করছেন বলেও জানা গেছে। আর বিগত সময়ের উন্নয়ন কর্মকান্ডের তথ্য প্রচারের পাশাপাশি অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তালুকদার আব্দুল খালেক। গতকাল ফেরিঘাট এলাকায় গণসংযোগকালে বিগত দিনের উন্নয়নকাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলে জাতীয় পার্টির মো. শফিকুল ইসলাম মধু বলেন, বিদেশিদের হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে উন্নয়নকাজ করলেও কাজে চরম ধীরগতি রয়েছে। মানও যথাযথ নয়। ফলে জনদুর্ভোগ বেড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় মানুষের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পানিনিষ্কাশনে খাল খনন ও ড্রেনেজব্যবস্থার নামে অর্থের অপচয় হয়েছে।
গতকাল নিউ মার্কেট, মিনাবাজার এলাকায় গণসংযোগকালে স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম শফিকুল ইসলাম মুশফিক বলেন, পাঁচ বছর ধরে রাস্তাঘাট খুঁড়ে রেখেছে। তার পছন্দের নির্দিষ্ট ঠিকাদার দিয়ে তিনি কাজ করাচ্ছেন, ফলে কাজে ধীরগতি হলেও ব্যবস্থা নিচ্ছেন না, মান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। এ সময় তিনি গণমাধ্যমের কাছে নির্বাচনে কালোটাকা ছড়িয়ে জনপ্রতি ৩০০-৫০০ টাকায় শ্রমিক ভাড়া করে মাঠে নামানোর অভিযোগও করেন।
৩১ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগকালে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী মাওলানা আব্দুল আউয়াল বলেন, এলাকার মানুষ আওয়ামী লীগ দেখছে, বিএনপিকে দেখেছে। এখন মানুষ চায় ইসলামী শাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা। জনগণ ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে নীরব বিপ্লব ঘটবে ইনশাআল্লাহ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, কালোটাকার ছড়াছড়ি চলছে। কালোটাকা মানুষের ভোটের ওপর প্রভাব ফেলে। টাকা ছড়ানো বন্ধের জন্য কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
অপরদিকে অপপ্রচারে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, খুলনা সিটির সব দৃশ্যমান উন্নয়ন আমার সময়ে হয়েছে। আগামীতে খুলনা সিটিকে স্মার্ট নগরীতে পরিণত করা হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনে পরিকল্পিতভাবে খালগুলোর পাশাপাশি রূপসা এবং ভৈরব নদ খনন করার পরিকল্পনা রয়েছে। অসমাপ্ত কাজগুলো এগিয়ে নিতে তিনি জনগণের কাছে ভোট প্রত্যাশা করেন এবং নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদানের আহ্বান করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা জানান, তালুকদারের প্রতিপক্ষ প্রার্থীরা তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। তবে কাউকে এখনো কথা দেননি বলে তিনি জানান।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার বিভাগীয় ও জেলার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিগত দিনের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেখা গেছে। এবার বিএনপি বর্জন করায় নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়ার চিন্তা করার সুযোগ নেই। নির্বাচনে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ভোট পড়তে পারে।
বিগত দিনের ফলাফল বিশ্লেষণে জানা যায়, খুলনা নগরী ১৯৯০ সালের ৬ আগস্ট খুলনা সিটি করপোরেশনে রূপান্তরিত হয়। সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৯৪ সালে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মাহাবুবুল আলম হিরণকে পরাজিত করে মেয়র হন বিএনপির প্রয়াত নেতা শেখ তৈয়েবুর রহমান। তিনি ২০০২ সালের নির্বাচনেও বিজয়ী হন। বিএনপি ২০০৮ সালের নির্বাচন বর্জন করলেও দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন মহানগর বিএনপির তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি। ওই নির্বাচনে তালুকদার আব্দুল খালেক ১ লাখ ৫৭ হাজার ৮১২ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মো. মনিরুজ্জামান ১ লাখ ৩১ হাজার ৯৭৬ ভোট পান। ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিএনপির মো. মনিরুজ্জামান প্রায় ৬০ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। তিনি পান ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক পান ১ লাখ ১৯ হাজার ৪২২ ভোট।
২০১৮ সালের নির্বাচনে দ্বিতীয় মেয়াদে বিজয়ী হন তালুকদার আব্দুল খালেক। ফলাফলে নৌকা প্রতীকের তালুকদার আব্দুল খালেক পান ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯০২ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতীকের নজরুল ইসলাম মঞ্জু পান ১ লাখ ৮ হাজার ৯৫৬ ভোট। সব মিলে খুলনা সিটি করপোরেশনে ২২ বছরই নগর পিতার চেয়ারে ছিলেন স্থানীয় বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা।
