নকশায় উঁকি দেওয়া স্বপ্ন এখন বাস্তব রুবিনার

আপডেট : ০৭ জুন ২০২৩, ০২:৪০ এএম

জমানো ৪০ হাজার টাকা দিয়ে ২০১০ সালে পাটপণ্যের ব্যবসা শুরু করেছিলেন রুবিনা আক্তার মুন্নী। স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় শুরু করা সেই ব্যবসায় এখন আয় কোটি টাকা। মাত্র দুজন থেকে কর্মী সংখ্যা এখন শতাধিক। আর পণ্যের সংখ্যা অন্তত ১৪ গুণ বেড়েছে। পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব কারখানা।

নতুন নতুন নকশার ব্যতিক্রমী পাটপণ্য তৈরির এই কারিগর নিজের প্রতিষ্ঠানের নামকরণেও খানিকটা ভিন্নতার পরিচয় দিয়েছেন। নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছেন ‘ডিজাইন বাই রুবিনা’। তার ব্যবসার মুনাফার অনেকটাই তিনি ব্যয় করেন মানবকল্যাণে।

রুবিনার সাফল্যের গল্প শুনতে সম্প্রতি রাজধানীর মনিপুরীপাড়ায় তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে যান দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদক। তার সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল পাটপণ্যের সম্ভাবনা, প্রতিবন্ধকতাসহ নানা বিষয়।

শুরুটা কীভাবে হয়েছিল? জবাবে তিনি জানান, “দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় একদিন বাবার গাড়িতে, মায়ের সঙ্গে ঢাকার নিউমার্কেটে গিয়ে কিছু পাটপণ্যের ওপর চোখ আটকে যায়। মুহূর্তেই মনে হলো আরে, এগুলো তৈরি করতে তো আমিও পারি। দোকানিকে এসব পণ্য সরবরাহের প্রস্তাব দিলে তিনি রাজি হয়ে যান। এসব দেখে খানিকটা অপ্রস্তুত আমার মা বলছিলেন, ‘আরে তুই কী করছিস? তোর কী মাথা খারাপ’? আমি দোকানির সঙ্গে দরদাম ঠিক করে ২ হাজার ৮শ টাকার পণ্য সরবরাহের অর্ডার নিয়ে বাসায় ফিরলাম। সময়মতো তা সরবরাহও করি। এভাবেই শুরু।”

রুবিনার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। পেশায় প্রকৌশলী হওয়ায় মেয়েকেও প্রকৌশলী অথবা বিসিএস ক্যাডার হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু রুবিনার ঝোঁক ছিল নকশা করার প্রতি। ছোটবেলা থেকেই নানা নকশার পণ্য তৈরি করে বন্ধু কিংবা আত্মীয়স্বজনকে উপহার দিতেন। একসময় তার ভেতর উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন উঁকি দিতে শুরু করে। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে পড়ালেখার পাশাপাশি হস্তশিল্পের নানারকম কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন রুবিনা।

২০১০ সালে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তার প্রতিষ্ঠানের নামে ট্রেড লাইসেন্স করেন। এর আগে ডিজাইনার ও মার্চেন্ডাইজার হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তিনি। দুই মাসের বেতন থেকে ৪০ হাজার টাকা জমিয়ে আর দুজন কর্মী নিয়ে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে যাত্রা শুরু হয় রুবিনার।

প্রথম দিকে পাট থেকে ২৪ রকমের পণ্য তৈরি করলেও পরবর্তী সময় পণ্যের দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং বাজারে চাহিদা বিবেচনায় পাটের সঙ্গে চামড়া ও অন্যান্য উপাদানের মিশ্রণ ঘটিয়ে পণ্য তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তার তৈরি তিন শতাধিক রকমের হস্তজাত পণ্য রয়েছে, যার মধ্যে শুধু পাটপণ্যের সংখ্যা ১৪৭। ফার্মগেট ও মনিপুরীপাড়া এলাকায় দুটি কার্যালয় কাম প্রদর্শনী কেন্দ্রের পাশাপাশি পূবাইল এলাকায় গড়ে তুলেছেন কারখানা। স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে একশরও বেশি কর্মী রয়েছেন (যাদের ৮০ শতাংশই নারী) যারা রুবিনার স্বপ্নের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করছেন নিজের মনে করে।

কেবল বাহারি পণ্য তৈরিতেই নয়, পড়ালেখা আর প্রশিক্ষণ নেওয়ার ব্যাপারেও প্রবল ঝোঁক রুবিনার। জানা গেল, দুটি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি দেশে-বিদেশে অন্তত ৬টি বিষয়ে ডিপ্লোমা করেছেন তিনি।

রুবিনা বলছিলেন, ভালো উদ্যোক্তা হতে প্রচুর জানতে ও শিখতে হয়। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ নেওয়া খুবই জরুরি। এই উপলব্ধি থেকেই এখনো পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছেন আনন্দের সঙ্গে।

পাটপণ্য নিয়ে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মেলায় বাংলাদেশ থেকে ১৪ জন নারী উদ্যোক্তার সঙ্গে রুবিনাও অংশ নেন। তার এই অংশগ্রহণে সহায়তা করার জন্য ইউএসএআইডি-অর্থায়নকৃত ফিড দ্য ফিউচার বাংলাদেশ হর্টিকালচার অ্যাক্টিভিটি, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অফিস (টিএফও) কানাডা এবং এসএমই ফাউন্ডেশন বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

মেলার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে রুবিনা বলছিলেন, ‘এর আগে ১৪টি দেশে নিজের টাকায় মেলায় অংশ নিয়েছি। এই প্রথম কোনো সংস্থার সহায়তায় আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। এটা খুবই আনন্দের। আমার প্রতিষ্ঠানটি এই মেলায় Artisan Resource’ ক্যাটাগরিতে ‘Best New Product’ এওয়ার্ড-এর জন্য মনোনীত হয়। এখান থেকে অনেক কিছু শিখেছি, যা আমার ব্যবসা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

তিনি বলেন, ‘ব্র্যান্ডিং, অ্যাডভার্টাইজমেন্ট থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে ইউএসএআইডি গাইড করেছে। মেলায় যাওয়ার তিন মাস আগে থেকে একজন একজন করে গ্রুমিং করার পাশাপাশি আমাদের নানান বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছে ইউএসএআইডি। স্টলে কীভাবে পণ্য প্রদর্শন করতে হবে, কীভাবে ক্রেতার সঙ্গে কথা বলতে হবে, পণ্যের বিজ্ঞাপন কেমন হবে এমন খুঁটিনাটি দরকারি নানা বিষয়ে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি তাদের কাছ থেকে। এ জন্য তাদের কাছে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ।’

‘আমার কোনো ব্যাংক ঋণ নেই। ভবিষ্যতেও নেওয়ার ইচ্ছা নেই। কোনো ধরনের প্রণোদনা কখনো নেইনি। ইচ্ছাও নেই। তারপরও অর্থের অভাবে কখনই আমরা কাজ থেমে থাকেনি। করোনা মহামারীর সময়ে টানা ১৭ মাস উৎপাদন বন্ধ ছিল। কয়েক কোটি টাকার পণ্য রপ্তানির কার্যাদেশ বাতিল হয়। তবুও কর্মীদের সবাইকে বেতন দিয়েছি,’ বলছিলেন রুবিনা।

তার ভাষায়, দেশে-বিদেশে পাটজাত পণ্যের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু দেশেই এই পণ্যের হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে। বিদেশের বাজার তো আরও বিশাল। প্রতিনিয়ত বাজার বড় হচ্ছে কারণ পরিবেশবান্ধব ও শৌখিন এই পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘অনেকেই প্রণোদনার আশা নিয়ে এই পেশায় আসেন। আমি এটা কখনো চিন্তা করি না। কারণ প্রণোদনার আশা করলে কখনই স্বাবলম্বী হওয়া যায় না, ভালো উদ্যোক্তা হওয়া যায় না।’

রুবিনা বলছিলেন, বর্তমানে পাটজাত পণ্যের বিশ^বাজার সবচেয়ে বেশি দখল ভারতের। এরপর রয়েছে চীন ও ভিয়েতনাম। বাংলাদেশ একটু চেষ্টা করলেই এই বাজারের প্রায় অর্ধেক দখলে নিতে পারে। এ জন্য নতুন ধারায় আরও বেশি ব্র্যান্ডিং করতে হবে। উদ্যোক্তাদের দক্ষ করার পাশাপাশি তাদের কাজগুলো কত সহজ করা যায় সে ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগ আরও বাড়াতে হবে। এবং এই সুবিধা যেন প্রকৃত উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছায় তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাকেও সৎ, পরিশ্রমী এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার মাধ্যমে ক্রেতার আস্থা অর্জন করতে হবে। নিজের কাজকে ভালোবাসতে হবে। প্রচুর পড়ালেখা করতে হবে ভালোভাবে জানা বোঝার জন্য। শুধু আয়ের চিন্তা না করে প্যাশন ও মিশন এক হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের বাইরে বিভিন্ন ধরনের মেলায় অংশ নিলে অনেক অভিজ্ঞতা হয়। নতুন নতুন ক্রেতা তৈরির সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ উদ্যোক্তার বিদেশে যাওয়ার সামর্থ্য নেই। এ জন্য দেশে আন্তর্জাতিক মেলার আয়োজন করতে হবে। যাতে উদ্যোক্তারা সহজেই এই সুবিধা নিতে পারেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত