নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

আপডেট : ১৭ জুন ২০২৩, ০৬:০২ এএম

সংবাদপত্রে রিপোর্টারের ‘সোর্স’ যেন এক ছায়ার পাখি। স্বাভাবিক আলোর প্রবাহে পাখিটাকে চোখে পড়ে না। আড়াল থেকে আড়ালে তার চলাচল। সেখান থেকেই সে সংকেত পাঠায়, প্রবল সংবাদের সম্ভাবনা উড়িয়ে আনে বাতাসে। খবরের এই মনুষ্য সূত্ররা ‘সূত্র অথবা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক’ হয়েই থেকে যায়। পুলিশের সোর্স থাকে। অপরাধ জগতের ছিদ্রপথ তারা। পুলিশ সেখানে কান লাগিয়ে খবর শোনে। রিপোর্টারদেরও কান লাগিয়ে খবরের সংকেত শোনার, খবর জানার ছিদ্রপথ থাকে।

বহু বছর আগে ঢাকার শাহবাগ এলাকায় এক রেস্তোরাঁয় চায়ের কাপ সামনে নিয়ে বসে আছি। হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্র সংগঠনের কর্মী এসে সামনে বসে চাপা গলায় বলে, ‘ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি গরম হয়ে উঠছে। কিছুদিনের মধ্যে খুনের ঘটনা ঘটবে। খবর নেন।’ সেই তরুণ সেদিন কথা শেষ করে আর অপেক্ষা না করে চলে গিয়েছিল। পরবর্তী কয়েক দিন তার দেওয়া সংকেতটা মাথায় প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি করায় পরিস্থিতি বুঝতে ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথাও বলেছিলাম। কিন্তু কোনো ঝামেলার আভাস না পেয়ে খাতা বন্ধ করে দিই সেখানেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ঘটনার সপ্তাহখানেক পরে সে বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাসে জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। পত্রিকায় বড় খবর ছাপা হয়Ñ অন্তর্দলীয় কোন্দলে জোড়া খুন।

দেশের একটি প্রথম সারির দৈনিকে কাজ করি তখন। পরিচিত এক নারী সাংবাদিকের সূত্রে পরিচয় হয় এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি বৈধ অস্ত্রের ব্যবসা করেন। সশস্ত্র বাহিনীর জন্য নানান ধরনের অস্ত্র সরবরাহ তার ব্যবসা। আমি তখন বিশেষ একটি ক্রয়সংক্রান্ত অনিয়মের তথ্য অনুসন্ধান করছিলাম। একদিন সেই ব্যবসায়ী অফিসে বসে কয়েকটা ফাইল আমাকে দেখতে দিলেন। তিনি সেদিন কোনো কিছু বুঝে আমাকে ফাইলগুলো দেননি। কিন্তু ফাইলের পৃষ্ঠা উল্টে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। সেই ফাইলটা ছিল আমার কাছে সোনার খনি। পরে সেখান থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে বড় ধরনের একটি রিপোর্ট করেছিলাম। রিপোর্টটি ছাপানোর আগে আমার তৎকালীন সম্পাদকও বিচলিত এবং শঙ্কিত ছিলেন। ওই রিপোর্টের জন্য আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখিও হতে হয়েছিল। সেই ব্যবসায়ী পরে আমাকে বলেছিলেন, তিনি ভাবতেই পারেননি ফাইলে পড়ে থাকা সামান্য কয়েকটি নথিতে এত বড় খবর লুকিয়ে রয়েছে।

পরে সেই ব্যবসায়ী আমার এক গুরুত্বপূর্ণ সোর্স হয়ে ওঠেন। তার সঙ্গে পারিবারিক একটা সম্পর্কও তৈরি হয়ে যায়। পত্রিকার রিপোর্ট ছাড়াও বহু বিষয়ে আমাদের মধ্যে অনেক কথা হতো। গোয়েন্দা নজরদারি এড়ানোর জন্য অনেক দিন তার বাড়ির দেয়ালে লেটারবক্স থেকে আমাকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করতে হয়েছে। কখনো ব্যাংকের কাউন্টারে তার অফিসের পিয়ন আমার হাতে ফাইল তুলে দিয়েছে। আমাদের মধ্যে গোপনীয়তার সেতু ছিল। সেই সেতুর গল্প আজও অনেক আড়াল করেই লিখে রাখলাম।

আরেকবার ঢাকা শহরে অবৈধ অগ্নেয়াস্ত্রের কারবার নিয়ে অনুসন্ধান করছি। সেই গল্প লিখতে গিয়ে মনে পড়ল বোমায় কবজি উড়ে যাওয়া রাজনৈতিক দলের সেই কর্মীর কথা। একটি ছাত্র সংগঠনের এক শীর্ষ নেতা তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সেই স্টোরিটির জন্য অনুসন্ধান চালানোর সময় আরেকটি দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টার আমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। ঢাকা শহরে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ এবং তা খালাসের পয়েন্টগুলো জানার জন্য সেই তরুণ রাজনৈতিক কর্মীর সঙ্গে বহু সময় কেটেছে। সেই কর্মীটি তখন রাজনীতি থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে। রাতে তার বাড়ির একটি ছোট ঘরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার কথা শুনতাম। কাজটা বেশ কঠিন ছিল। কারণ তার দেওয়া তথ্য থেকে আসল খবর আর অতিকথনকে আলাদা করতে হতো। সোর্সের বিচিত্র ব্যক্তিগত অভ্যাসের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হতো। অনুসন্ধানে চমকে ওঠার মতো প্রচুর তথ্য পাওয়ার পরেও সেই রিপোর্টটি করা সম্ভব হয়নি। আমার সঙ্গে যুক্ত থাকা দ্বিতীয় রিপোর্টারের বাড়িতে তখন এক রাতে রহস্যময় এক ব্যক্তি অনুপ্রবেশ করে। সেই সাংবাদিক নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভীত হয়ে পড়েন। আমাকে ফোন করে অন্য এক রাজনৈতিক কর্মী কাজটা নিয়ে আর অগ্রসর না হওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। পত্রিকার সম্পাদক নিজেই কাজটি স্থগিত করতে বলেন একপর্যায়ে।

কাজটা স্থগিত হয়ে গেলেও তারপর অনেক দিন সেই সোর্সের কবল থেকে আমার মুক্তি মেলেনি। তার নাকি আমার সঙ্গে কথা বলা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। হয়তো অস্ত্র, বোমা আর খুন জখমের পৃথিবীর সঙ্গে নিজের সংযুক্তির স্মৃতিচারণ করতে তারও ভালো লাগত। তারপর এক সময়ে সেই সোর্স হারিয়ে যায়। আজও হয়তো এ শহরেই আছেন। আর দেখা হয় না আমাদের।

দেখা হয় না একটি সরকারি হাসপাতালের মর্গের সেই দারোয়ানের সঙ্গেও। তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল নারিন্দায় সুইপার কলোনিতে; নেশায় আচ্ছন্ন লোকটা। এক রাতে কলোনির সামনের চত্বরে বসে থাকা সেই দারোয়ানের সঙ্গে কথা হয়। হাসপাতালের মর্গে বেওয়ারিশ লাশ অ্যাসিডে গলিয়ে কঙ্কালে পরিণত করে দেশের বাইরে পাচার করার এক গোপন নেটওয়ার্কের খবর তার কাছ থেকে জানতে পারি। মর্গের ডোমরা এই কঙ্কাল-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত।

পরদিন সকালে সেই দারোয়ানের সঙ্গে দেখা করতে ছুটলাম সেই হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে তার মুখে তালা পড়ে গেছে। সে কথা বলবে না। লোকটার একটাই কথা ছিলÑ স্যার, আমার জীবন চইলা যাইব। অনেক চেষ্টা করেও সেই লোকটার মুখের তালা খুলতে পারিনি। বুঝতে পেরেছিলাম, রাতের বেলা মর্গে অনেক ঘটনার সাক্ষী ছিল সেই দারোয়ান। কিন্তু ভয়ে নীরবতা বেছে নিয়েছে। পরে তার বিপদের কথা ভেবে আমিও হাল ছেড়ে দিই।

আমার এ রকম অসংখ্য সোর্স সেই শহরে ছড়িয়ে ছিল একদা। তাদের পৃথক জীবন, পৃথক ভাষাও। তারা একজন রিপোর্টারের কাছে ছায়ার পাখি। ঘটনার কেন্দ্রে বসেও আড়ালে থাকা মানুষগুলো ঝুঁকি নিয়েও খবর সরবরাহ করতেন। সেই শহরের হারানো গল্পের খাতায় তারা হয়ে আছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হিসেবেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত