আগামীকাল বৃহস্পতিবার ঈদুল আজহায় খুলনার ব্যবসায়ীরা দেড় কোটি টাকার চামড়া কেনার টার্গেট নিয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। ইতিমধ্যেই খুলনার চামড়াপট্রিখ্যাত শেখপাড়ায় চলছে ঘর তৈরিসহ অন্যান্য কাজকর্ম। তবে, বাস্তবতার ওপরই নির্ভর করছে- তাদের এ টার্গেট।
অপরদিকে, ট্যানারি মালিকদের কাছে বিগত বছরগুলোতে তাদের পাওনা দেড় কোটি টাকা এখনও বকেয়া রয়েছে। সেই টাকা হাতে না পাওয়া এবং এবার লবণসহ চামড়া সংরক্ষণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পুঁজি সংকটে পড়েছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। ফলে অনেকেই এ ব্যবসা থেকে সিটকে পড়েছেন। আর যারা দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্য হিসেবে এ ব্যবসায় টিকে রয়েছেন- তারাও এবার ধার-দেনা করে চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
খুলনায় গরু-ছাগলের চামড়া বেচা-কেনার জন্য দীর্ঘদিনেও গড়ে ওঠেনি কোনো মার্কেট। মার্কেট তৈরির জন্য কোনো প্রকল্পও নেই সিটি করপোরেশনের। আগে নগরীর শেখপাড়া ও শেরেবাংলা রোডে চামড়া ব্যবসায়ীদের ১৫/২০টি দোকান থাকলেও তা তিন বছর আগে বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে এবারের ঈদেও কোরবানির পশুর চামড়া বেচাকেনা হবে রাস্তায়। এ ছাড়া লবণ লাগিয়ে চামড়াগুলো সংরক্ষণ করা হবে রাস্তার ওপরেই। এর ফলে সড়কে দুর্গন্ধ ও যানজটের আশঙ্কা রয়েছে।
খুলনা কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কার্তিক ঘোষ বলেন, গেল ঈদে খুলনার ব্যবসায়ীরা প্রায় ৮-১০ হাজার চামড়া কিনেছিলেন। যার আনুমানিক মূল্য কোটি টাকার মতো। কিন্তু এবার দাম কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় দেড় কোটি টাকার চামড়া বিকিকিনি হতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি। এবার ১৫/২০ জন ব্যবসায়ী ঈদের সময় শেরেবাংলা রোডে চামড়া কেনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, খুলনার বাজারে ঈদের সময় প্রায় ৮/১০ হাজার চামড়া বেচাকেনা হয়। কিন্তু কোনো মার্কেট না থাকায় তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ ছাড়া গত বছর ঈদের সময় খুলনার ব্যবসায়ীরা ট্যানারি মালিকদের কাছে যে চামড়া বিক্রি করেছিলেন তার সব টাকা এখনও পাননি। এর ফলে কেউ কেউ পুঁজি সংকটে রয়েছে।
সমিতির ক্যাশিয়ার মো. বাবর বলেন, ঢাকা, কুষ্টিয়া, নাটোর, যশোরের রাজারহাটসহ কয়েকটি ট্যানারি মালিকের কাছে খুলনার ৩০-৩৫ জন ব্যবসায়ীর প্রায় দেড় কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। তারা সে টাকা পরিশোধ না করায় তারা পুঁজি সংকটে রয়েছেন। তারপরও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ধারদেনা করে চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি আরও জানান, গত বছর বস্তাপ্রতি (৬৫ কেজি) লবণের মূল্য ছিল ১১ থেকে ১২ শ টাকা, এবার সেই লবণ বস্তাপ্রতি বেড়ে ১৪ থেকে ১৫ শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে তাদের চামড়া সংরক্ষণে ব্যয়ও বেড়ে যাবে।
এদিকে শেখপাড়া বাজারের চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, স্বাধীনতাপরবর্তী সময় থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নগরীর শেখপাড়া বাজার ও পার্শ্ববর্তী শেরেবাংলা রোডে চামড়া বেচাকেনার জন্য কমপক্ষে ১৫/২০টি দোকান ছিল। ওই দোকানগুলোতে বেচা-কেনার পাশাপাশি লবণ লাগিয়ে চামড়াগুলো অনেক দিন সংরক্ষণ করা হতো। পরে ট্যানারি মালিকরা কিনে নিয়ে যেত। কিন্তু চামড়ায় লবণ লাগানোর সময় তা দোকান ঘরের মেঝে ও দেয়ালে লেগে যেত। এতে দেয়ালের রঙ এমনকি পলেস্তারা খসে খসে পড়ত। চামড়ার দুর্গন্ধে আশপাশের দোকানিরাও বিরক্ত হতেন। এ অবস্থায় একে একে দোকান মালিকরা চামড়া ব্যবসায়ীদের দোকান ছাড়তে বাধ্য করেন। অন্যদের ভাড়া দিলেও তুলনামূলক ভাড়াও বেশি পাওয়া যায়। এ অবস্থায় ২০২০ সালের পর শেখপাড়া ও শেরেবাংলা রোডের চামড়াপট্টিতে চামড়া ব্যবসার আর কোনো দোকান নেই।
ব্যবসায়ীরা জানান, তাদের কয়েকজন সারাবছর জবাই হওয়া গরু-ছাগলের চামড়া কিনে নগরীর জিরো পয়েন্ট ও গল্লামারী এলাকায় তাদের গোডাউনে নিয়ে লবণ লাগিয়ে সংরক্ষণ করেন। তবে ঈদের ৩ দিন সড়কের ওপরই সব কার্যক্রম চলে।
খুলনা কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুস সালাম ঢালী জানান, খুলনার শেখপাড়া বাজারে আগে ৫০-৬০ জন ব্যবসায়ী ছিল। কিন্তু ক্রমাগত লোকসানের কারণে বর্তমানে ১৫-২০ জন কোনোরকম টিকে আছেন। ব্যবসায়ীরা একপ্রকার দেউলিয়া হয়ে গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, এখন আর শেখপাড়া এলাকায় চামড়ার কোনো দোকান নেই। ঈদের সময় তারা পাওয়ার হাউজ মোড় থেকে ময়লাপোতা মোড় পর্যন্ত শেরেবাংলা রোডের ওপর চামড়া বেচাকেনা করেন। রাস্তার ওপরই চামড়ায় লবণ লাগানো হয়। কেউ কেউ ২/৩ দিন এখানে চামড়া রেখে বিক্রি করে। আবার ২/৪ জন যার জিরো পয়েন্ট বা অন্য এলাকায় গোডাউন আছে সে সেখানে নিয়ে রাখে। পরে ট্যানারির লোকজন এসে কিনে নিয়ে যায়।
তিনি আরও জানান, এবারও রাস্তার ওপর চামড়া বেচা-কেনা ও সংরক্ষণ করার জন্য অনুমতি চেয়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের কাছে আবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার জন্য খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে চামড়া ব্যবসার জন্য পৃথক মার্কেট তৈরি করে দেওয়ার জন্য সিটি করপোরেশনের কাছে লিখিত ও মৌখিক আবেদন করে আসছেন কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি।