আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, প্রধান নির্বাচন কমিশন (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালও বক্তব্য দিয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মেট্রোপলিটন কমিশনার (ডিএমপি) খন্দকার গোলাম ফারুক ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু হওয়ার গ্যারান্টি দিয়েছেন। তবে তাদের এ আশ্বাসকে আমলেই নিচ্ছে না রাজপথে সরকারবিরোধী আন্দোলনে থাকা দলগুলো। আন্দোলনরত দলগুলোর নেতারা বলছেন, ২০১৪ ও ’১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের মতো তাদের বুলি আরেকটি ফাঁদ। ক্ষমতাসীনদের মতো তারা তিনটি দাবিতে অনড় অবস্থানে। সেগুলো হচ্ছে বিলম্বে সরকারের পদত্যাগ এবং সংসদ বিলুপ্ত, তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ সরকার যে নামেই হোক, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর, সর্বশেষ সবার মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন এবং তাদের অধীনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ অনুষ্ঠিত করা। বিএনপির নেতৃত্বে আন্দোলনে থাকা ৩৬টি দল এক দফার ঘোষণার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। সেখানেও এ তিনটি দাবিকে প্রধান এজেন্ডা হিসেবে তুলে ধরবেন তাদের ঘোষণায়।
এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক দল ও নেতাদেরই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। সেটি সম্ভব না হলেও বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি বছর ২৫ মে কাতার ইকোনমিক ফোরামে (কিউইএফ) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের সরকারের অধীনে অবশ্যই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে।’ একই কথা পুনরাবৃত্তি করেন ৩ জুলাই নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের শপথ অনুষ্ঠানে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা প্রমাণ করেছি আওয়ামী লীগ সরকার আমলে নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু হয়। এর আগে ২৯ মে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে দলের সম্পাদকমণ্ডলীর সঙ্গে বৈঠকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, সরকার অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে এবং তা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আর ১৫ মে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরও বর্তায়।
সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচন নিরপেক্ষ করা নিয়ে বিদেশিদের নানা কূটনৈতিক চাপ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতির পর সেটি আরও প্রকাশ্যে আসে। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আসছেন বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া। তৃতীয় সপ্তাহ বা কাছাকাছি সময়ে আসার কথা রয়েছে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি হোসে ফার্নান্দেজের। কাছাকাছি সময়েই আসার সম্ভাবনা রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দুটি প্রতিনিধিদল। উজরা জেয়ার চার দিনের সফরে সফরসঙ্গী হিসেবে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর আসার কথা রয়েছে। উজরা জেয়া ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি রাজনীতিবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন বলে জানা গেছে। মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি জোসে ফার্নান্দেজের ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র ব্যবসায়ী পরিষদের বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর বিষয়টি মূল্যায়নের জন্য ৯ জুলাই চার সদস্যের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল আসবে ইউরোপ থেকে। আর ২৪ জুলাই আসছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ইমোন গিলমোর। তিনি আইনমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন বলে সূত্র জানায়।
এ অবস্থায় আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা আরও পরিষ্কার হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একাধিক সূত্রের দাবি, বর্তমান সংবিধানের আলোকেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে অনুষ্ঠানের যৌক্তিকতা সরকারের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার বিষয়টিও তারা সামনে আনবেন। গত পাঁচটি সিটি নির্বাচনসহ একাধিক উপনির্বাচনের উদাহরণের চিত্র উঠে আসবে এতে। ক্ষেত্র তৈরির জন্যই সরকারের পক্ষ থেকে আগেভাগে এ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, ইস্যুটি সামনে আনা হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কূটনৈতিকদের সঙ্গে বৈঠকে আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়, তার পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রমাণাদি প্রভাবশালী দেশগুলোর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের একটি সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও কূটনৈতিকপাড়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে তাদের কাছে খবর রয়েছে। ওই তথ্যে বলা হয়েছে, গাইবান্ধা উপনির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা ছিলেন নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তা। কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করায় ওই নির্বাচনে অনিয়মের বিষয়গুলো বেশ সক্রিয়ভাবে উঠে এসেছে। ফলে পুরো নির্বাচনের ভোটই বন্ধ হয়ে যায়। নিজস্ব কর্মকর্তা না থাকলে সেটি হতো না। ওই নির্বাচনে যেসব প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ এসেছে। পরে তদন্ত করে জড়িতদের শাস্তির সুপারিশ করা হলেও তা কার্যকর হয়নি। এতে কমিশনের ওপর ক্ষমতাসীনদের পুরোপুরি প্রভাব রয়েছে বলে প্রমাণ হয়। এজন্য দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ইসি পুনর্গঠনেরও দাবি করছে বিরোধী দলগুলো।
বিএনপি বলছে, ২০১৪ সালের নির্বাচন বিরোধী দলগুলো বর্জন করায় প্রশ্ন উঠেছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিরোধী দলগুলো প্রমাণ করে, আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। তাই এবার তারা আগে থেকেই জনগণের কাছে বিষয়গুলো তুলে ধরছে। ফলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর তরফ থেকে নানা বার্তা আসছে। তাদের এসব তৎপরতা ক্ষমতাসীনদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। যদিও সরকার কখনো এ ধরনের চাপের কথা স্বীকার করেনি। বরং তারা পাশ কাটিয়ে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে আশ্বস্ত করতে চাইছে।
গত সোমবার মিছিল-পূর্ব এক সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘কথা খুব পরিষ্কার। অবিলম্বে সরকাকে পদত্যাগ ও সংসদ বিলুপ্ত করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ সরকার যে নামেই হোক, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করে তাদের হাতে ক্ষমতা দিতে হবে। নতুন নির্বাচন কমিশন করে নির্বাচন গঠন করে তারা একটি নির্বাচন দেবে।’
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদেশিদের সঙ্গে একটা বোঝাপোড়া করতে হবে সরকারকে। তাই ক্ষেত্র তৈরির জন্য সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা বলে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এ আশ্বাস আমলে নেওয়ার কোনো কারণ আমরা দেখছি না।’
জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক দল ও নেতাদেরই চলমান সমস্যার সমাধান করতে হবে। সরকারপ্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করতে পারেন। কীভাবে নির্বাচন মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে সেটি তুলে ধরতে পারেন। তাহলেই সবকিছু জনগণের কাছে পরিষ্কার হবে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সমস্যার সমাধান করতে না পারে, সেটি দেশের জন্য বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা থাকবে।’
