দীর্ঘদিন ফ্লোর প্রাইসে থাকার পর হঠাৎ করেই খাদ্য ও অনুষঙ্গ খাতের কোম্পানি ফু-ওয়াং ফুডসের শেয়ার দর অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করেছে। কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য না থাকলেও মাত্র তিন কার্য দিবসেই শেয়ারটির দর প্রায় ২৪ শতাংশ বেড়েছে, যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গুজব ছড়িয়ে ফু-ওয়াং ফুডসের শেয়ার দর বাড়ানো হয়েছে, যাতে ব্যক্তিশ্রেণির কয়েকজন বড় বিনিয়োগকারীর সঙ্গে দুটি ব্রোকারেজ হাউজের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা যায়, ফ্লোর প্রাইস আরোপের পর গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ২ জুলাই পর্যন্ত ফু-ওয়াং ফুডসের শেয়ার দর ২৩ টাকা ৫০ পয়সায় আটকে ছিল। ক্রেতার অভাবে এ সময়ে লেনদেনও হয়নি। ফলে শেয়ারটিতে অনেক বিনিয়োগকারী আটকা পড়েন। মূলত আটকে পড়া কয়েকজন ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীদের বের করতেই শেয়ারটি নিয়ে কারসাজির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে গুজব ছড়ানো হয়েছে, যেসব কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার নেই, তাদের আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে তা পূরণ করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের উল্লিখিত সময়ের মধ্যে বাজার থেকে শেয়ার কিনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা পূরণ করতে হবে।
অন্য অনেক কোম্পানির মতো ফু-ওয়াং ফুডসের মালিকানায় আসা মিনোরী বাংলাদেশেরও ৩০ শতাংশ শেয়ার নেই। তবে ফু-ওয়াং ফুডসে মিনোরীর বিনিয়োগের বিপরীতে শেয়ার ইস্যু করার কথা। মিনোরী নির্ধারিত সময়ে এ প্রক্রিয়া শুরুও করবে। তবে ফু-ওয়াং ফুডসে বিনিয়োগের বিপরীতে এখন পর্যন্ত কোনো শেয়ার মানি ডিপোজিট দেখানো হয়নি।
এ বিষয়ে ফু-ওয়াং ফুডসের চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, গুজবের বিষয়টি আমরাও জেনেছি। এর কোনো ভিত্তি নেই। তবে শেয়ারের দর বাড়ার নেপথ্যে কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য আমাদের হাতে নেই। এছাড়া ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারনের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা পূরণে মিনোরীর বাজার থেকে শেয়ার কেনার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ শেয়ার মানি ডিপোজিটের বিপরীতে মিনোরী যে শেয়ার পাবে তা দিয়েই উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারনের বাধ্যবাধকতা পূরণ হবে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, গুজব ছড়িয়ে গত সোমবার থেকে ফু-ওয়াং ফুডসের বিপুল পরিমাণের শেয়ার হাতবদল হতে দেখা যায়। সেদিনই ৫৬ কোটি টাকারও বেশি শেয়ার লেনদেন হয় ফু-ওয়াং ফুডসের। ফ্লোর প্রাইসের সীমা ভেঙে ৬০ পয়সা বেশি দরে কেনা বেচা হয় শেয়ারটির। পরের দিন শেয়ারটির দর সর্বোচ্চ বেড়ে ২৬ টাকা ৫০ পয়সায় উন্নীত হয়। লেনদেন হয় ৪১ কোটি টাকারও বেশি। বড় বিনিয়োগকারীদের সংশ্লিষ্টরা থাকায় আজ বুধবারও শেয়ারটি সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বেড়ে লেনদেন হয়েছে। কেনা বেচা হয়েছে ৫৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার শেয়ার।
এর ফলে টানা তিন দিনে ফু-ওয়াং ফুডসের ১৫৪ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। হঠাৎ করেই শেয়ারটির দর ও লেনদেন বাড়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও এতে যুক্ত হয়েছেন।
প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের ২০ জানুয়ারি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার সম্মতিতে ফু-ওয়াং ফুডস অধিগ্রহণ করে জাপানি প্রতিষ্ঠান মিনোরী বাংলাদেশ। ফু-ওয়াং ফুডসের শেয়ার অধিগ্রহণে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে মিনোরি বাংলাদেশ । এর বাইরে কোম্পানির উন্নয়নে আরও অন্তত ২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে, যা শেয়ার মানি ডিপোজিট অথবা ‘পরিচালক ঋণ’ হিসেবে দেখানো হবে। শেয়ার মানি ডিপোজিট মিনোরির নামে শেয়ারে রূপান্তর করা হবে, যা দিয়ে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের শর্ত পূরণ করা হবে।
এর আগে ২০২১ সালে বন্ধ থাকা কোম্পানি এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি অধিগ্রহণ করে মিনোরী। জাপানী প্রতিষ্ঠান মিনোরী বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে উৎপাদনে ফেরে মৃতপ্রায় এমারেল্ড। প্রায় ৪৫ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগ ও নতুন ব্যবস্থাপনার ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ।
ইতিমধ্যেই কোম্পানিটি অন্তবর্তীকালীন লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। বকেয়া এজিএম সম্পন্ন করতে আদালতের অনুমোদনও পেয়েছে। নিয়মিত উৎপাদনে ফেরা ও জাপানে তেল রপ্তানির সম্ভাবনায় এমারেল্ডের শেয়ার দরও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এমারেল্ডের সফলতা দেখিয়ে কারসাজিকারকরা এখন ফু-ওয়াং ফুডস নিয়ে গুজব ছড়িয়ে শেয়ারের দাম বাড়াচ্ছে।
প্রসঙ্গত মিনোরীর নতুন বিনিয়োগের বিপরীতে গত ১০ এপ্রিল এমারেল্ড অয়েলের ৩ কোটি ১৫ লাখ ৫৮ হাজার নতুন শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন দিয়েছে এসইসি, যা মিনোরি বাংলাদেশের নামে ইস্যু করা হবে। একই প্রক্রিয়ায় মিনোরীর নামে ফু-ওয়াং ফুডসেরও নতুন শেয়ার ইস্যু করা হবে।
