বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা থেকে দূরে

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৩, ১১:০২ পিএম

সদ্য বিদায়ী এই অর্থবছরে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে তারল্যসহ ব্যাংকিং খাতের নানা সংকটের কারণে ২০২২-২৩ অর্থবছরের কোনো মাসেই বেসরকারি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি ব্যাংক খাত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ গত মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ১০ শতাংশে নেমেছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট, টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন, মুদ্রা পাচার এবং আমদানি কমে যাওয়ায় দেশে উৎপাদন কমেছে। ডলার সংকটে আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করায় চলতি অর্থবছরে দেশে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ৫০ শতাংশের বেশি, যা নতুন কর্মসংস্থান তৈরি ও ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া সার্বিকভাবে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ পরিবেশ না থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ১৪ লাখ ৭০ হাজার ৩২৪ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে বেসরকারি খাতে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। আগের মাস এপ্রিলে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।

সাধারণভাবে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের ঘরে থাকে। তবে ২০১৯ সালের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো তা নেমে যায় ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশে। করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরুর পর ব্যাপক হারে কমে গিয়ে ২০২০ সালের মে মাসের শেষে প্রবৃদ্ধি নামে ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশে। তবে পরের মাস জুন থেকে তা অল্প অল্প করে বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা পূরণ হয় না। ২০২১-২২ অর্থবছরেও বেসরকারি খাতের ঋণের প্রাক্কলন করেছিল ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। যদিও প্রাক্কলিত হারের চেয়ে লক্ষ্যমাত্রার অর্জন ছিল অনেক কম।

জানা গেছে, শুধু বেসরকারি খাত নয়, সরকারও ব্যাংক থেকে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ঋণ নিতে পারছে না। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে সরকারকে রেকর্ড পরিমাণের ঋণ দিচ্ছে, যা দিয়ে বাজেট ঘাটতি মেটানো হচ্ছে। তবে টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দেওয়ায় তা মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলছে। সর্বশেষ গত জুনে দেশে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশে।

মুদ্রাবাজারে এমন সংকটের মধ্যেই সরকার ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেটে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে আরও বেশি হারে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সরকারের এমন অর্থায়ন নীতির কারণে চলতি অর্থবছরে ব্যাংক খাতের তারল্য পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। যদিও চলতি অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ২১ থেকে ২৮ শতাংশে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যা বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অসম্ভব বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

চলতি অর্থবছরে ঘাটতি বাজেট দাঁড়াবে ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি অর্থায়নে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

এসব বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া মানে বাজারে টাকা ছাড়া, যা মুদ্রাস্ফীতি ও লেনদেন ভারসাম্যের (বিওপি) ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। অর্থায়ন কমে যায় বেসরকারি খাতে। ফলে কমে যেতে পারে নতুন কর্মসংস্থান। জনগণের হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকলে পণ্যের চাহিদা তৈরি হবে, যা দাম বৃদ্ধি করবে। বিপুল পরিমাণ অর্থ বাজারে ছাড়লে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক এই কর্মকর্তা। অর্থের প্রচলন বেড়ে গেলে পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা বেড়ে যায়, যার ফলে আমদানিও বাড়ে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত