‘‘কয়েক শতাব্দী ধরে পুঁজিবাদ অভিমুখে ‘দীর্ঘ যাত্রা’ যেদিকে অগ্রসর হয়েছিল তা হলো এই : একটি জটিল ও পরস্পরসংযুক্ত প্রক্রিয়া যা গঠন করেছিল বাণিজ্যিক ও ব্যাংক মালিক বুর্জোয়াদের, জাতির উদ্ভব ও আধুনিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, ব্যবসার প্রসার ও পৃথিবীজুড়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, উৎপাদন ও পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতি, নতুন নতুন উৎপাদন প্রবর্তন এবং নব নব দৃষ্টিভঙ্গি ও মতবাদের আবির্ভাব। এই দীর্ঘ যাত্রা তার প্রথম স্তরটি অতিক্রম করেছিল অমেরিকা বিজয় ও লুণ্ঠনের ভেতর দিয়ে (ষোড়শ শতাব্দী) এবং বুর্জোয়াদের উত্থান ও নিজেদের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করার ভেতর দিয়ে অতিক্রম করেছিল তার দ্বিতীয় স্তর। পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকদের দ্বারা অভিহিত ‘মহান আবিষ্কারগুলো’ ইতিহাসে প্রবেশ করেছিল এই দ্বৈত গতিবেগের সংযোগস্থলে। ১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন। ১৪৯৮ সালে ভাস্কো ডা গামা আফ্রিকা ঘুরে ভারতবর্ষে পৌঁছেছিলেন। ধনসম্পদ আহরণের জন্য বাণিজ্য ও লুণ্ঠনের জন্য শুরু হলো এক মহাঅভিযান।”
বিগত শতাব্দীগুলো এই আলোড়ন, তাড়না, বেদনা, সংঘর্ষ, খুন, রক্ত, বিপন্নতা, নিপীড়নে জর্জরিত লড়াই, বিদ্রোহ, মুক্তি ও নতুন করে পুঁজিবাদের কাছে বন্দি হওয়ার শতাব্দী। সেই শতাব্দীর ছায়া এসে পড়েছে এই শতাব্দীতেও। আজ পুঁজিবাদ পৃথিবীর নিষ্ঠুর ভ্রমণ শেষে নিজেদের ঘরে ঢুকে পড়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ তার মূর্ত বাস্তবতা। পৃথিবী এই শতাব্দীতে যত বড় ঝুঁকিতে পড়েছে এর আগে তা কেউ কল্পনা করেনি। আমাদের সময়, দেশ, ব্যক্তি, পরিবেশসহ কোনোকিছুই এই ঝুঁকির বাইরে নয়। হৃদয়হীন জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদী ইহুদি, পুঁজিবাদী ইসলাম, পুঁজিবাদী খ্রিস্টানিটি, পুঁজিবাদী হিন্দুইজম আজ চেপে ধরেছে সভ্যতার টুঁটি। তাদের দৃষ্টির বাইরে কোনো কিছু ঘটলেই তারা আটকে দিচ্ছে মানুষের স্বপ্ন, কল্পনা ও চিন্তার সংবেদ।
এ জটিল বিশ্বপরিক্রমার ভেতর অ্যাকাডেমিক জার্নাল মুন্সিয়ানা প্রকাশিত হয়েছে। সম্পাদকীয়তে মুন্সিয়ানা কেন প্রকাশিত হচ্ছে তার কৈফিয়ৎ দেওয়া হয়েছে। ১৬ জন নবীন-প্রবীণ দেশি-বিদেশি লেখকের গবেষণাধর্মী লেখা এই সংখ্যায় স্থান পেয়েছে। খুব যত্ন সহকারে, লেখকদের যথাযথ মর্যাদা প্রদান করে; যেভাবে অ্যাকাডেমিক জার্নালের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয় তার সব অটুট রেখে লেখাগুলো ছাপানো হয়েছে। বাংলাদেশে পুঁজিবাদের বিকাশ যত দ্রুত সংগঠিত হবে তত দ্রুত জনগণের মুক্তির সম্ভাবনা দেখা দেবে। কেননা, পুঁজির বিশ্বব্যাপী ভিশন-মিশনের ধাক্কা সামলানো অত সহজ ব্যাপার নয়। কয়েকটি প্রজন্ম চেতনে-অচেতনে এই ঘূর্ণিবলয়ের ভেতর ডুবে যায়, ঘোরের আলোড়নে, স্বপ্নের সম্ভাবনায়, বেঁচে থাকার তাগিদে আর সেই ঘোর কাটিয়ে আমাদের এগিয়ে যাওয়া সহজ হয় না। কিন্তু আমাদের এগিয়ে যেতে হবে তাইই মুন্সিয়ানার জন্ম। তৃতীয় বিশ্ব নামীয় অন্যান্য দেশের মতো আমরাও সম্প্রচারিক সাম্রাজ্যবাদের শিকার। যার কারণে সৃষ্টি ও মননশীলতার প্রশ্নে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে, সেই ভাবনার অকপট জায়গা তৈরি করে দেবে মুন্সিয়ানা। করপোরেট পৃথিবী চিন্তাকে একপেশেভাবে প্রকাশ করে। দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান দলীয় বা রানিং সরকারের মতামত ছাড়া স্বাধীন গবেষণা, স্বাধীন ইচ্ছা, স্বাধীন লেখা প্রকাশ করতে পারে না। এটি শুধু আমাদের দেশের সমস্যা নয়, তৃতীয় বিশে^রই সমস্যা। এই সমস্যা থাকবে, এর ভেতর দিয়েই সৃষ্টিসংবেদ ও দর্শনের অলোড়নে জগৎকে বদলাতে যাওয়া মানুষের চিন্তাশীলতার বিকাশ ঘটাতে হবে। যেহেতু তৃতীয় বিশে^র কোনো সরকার এ রকম গঠনমূলক কাজে বাধা প্রদান করে না, সেহেতু সরকারকে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই, দোষ দিতে হবে আমাদের চিন্তার দরিদ্র অবস্থাকে, আমাদের স্বার্থপর চিন্তাকে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের চিন্তার ইতিহাসে অনেকের চেষ্টা, স্বপ্ন, সাধনা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক-সামরিক টানাপড়েন, সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত, জাতীয়তাবাদের পরাজয়সহ মানুষের সমস্ত অর্জন আত্মসাৎ করে নেওয়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। তাই চিন্তার ব্যাপক আলোড়ন সংঘটিত হয়নি, কিন্তু কিছু যে হয়নি তা বললে ভুল হবে। মুন্সিয়ানা সেই কিছুর অংশীদার হবে ভবিষ্যতে। মুক্তবাজার অর্থনীতি শুধু প্রতিযোগিতার বাজার নয়, এটি গঠনমূলক স্বপ্ন তৈরি করারও বাজার। তাই মুন্সিয়ানা একটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে তার পথচলা শুরু করেছে। এদেশের বুদ্ধিবৃত্তিকে জাগাতে হবে, এদেশের তরুণদের গবেষণা কার্যক্রমকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে হবে। তার জন্য মুন্সিয়ানা সীমিত সামর্থ্য নিয়ে যতটুকু সম্ভব কাজ করবে, মূলত এই লক্ষ্যে মুন্সিয়ানার জন্ম হলো। মুন্সিয়ানা বুদ্ধির মুক্তি চায়, সেই সঙ্গে নতুন করে তৈরি করতে চায় বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ। দর্শন, সাহিত্য, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, মহাকাশ গবেষণা, সমুদ্র গবেষণা, প্রযুক্তিসহ বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারকে মুন্সিয়ানা স্বাগত জানাবে। সেই জ্ঞান আমাদের দেশেই উৎপন্ন হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করবে। মুন্সিয়ানা জ্ঞান আমাদানি নয় ভবিষ্যতে জ্ঞান রপ্তানি করবে এই প্রত্যয়ে বিশ্বাস করে।
মুন্সিয়ানা নিয়ে বুদ্ধিজীবী ও শিল্পজীবী মহলে একটি বড় আগ্রহ তৈরি হয়েছে প্রথম সংখ্যায় এটিই পরম পাওয়া বলে মনে করি। মুন্সিয়ানার জন্ম ও বাংলা ভাষায় উত্তর ঔপনিবেশিক চিন্তার নবযাত্রা শুরু হলো। মুন্সিয়ানার প্রথম সংখ্যায় যারা লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবুল কাসেম ফজলুল হক, দেবব্রত চক্রবর্তী, সাদাত উল্লাহ খান, ফয়েজ আলম, মোহাম্মদ আলম চৌধুরী, টোকন ঠাকুর, মুহাম্মদ তানিম নওশাদ, সরওয়ার কামাল, আমীর খসরু স্বপন, আলম তৌহিদ, মনির ইউসুফ, মোহাম্মদ আলী, শাহনেওয়াজ তাইব, হুমায়ুন ছিদ্দিকী, মুহম্মদ নুরুল ইসলাম। ১৬টি লেখার প্রত্যেকটিই গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি পাঠকের ভালো লাগবে।
‘মুন্সিয়ানা’ অ্যাকাডেমিক জার্নাল।। সম্পাদক : মিনহাজ উদ্দীন মিরান।
