রোজা ও পাতার গল্প

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৩, ১০:৫১ পিএম

রোজা সাত-এ পা দিয়েছে। এখনো ওর স্কুলে যাওয়া হয়নি। হবেইবা কেমন করে। মুখে অ, আ, ক, খ বুলি আওড়ানোর আগেই এক রাতে ওর মা ওকে একা করে চিরতরে চলে গেছেন। কত স্বপ্ন ছিল তার! অভাবের সংসারে খেয়ে না খেয়ে হলেও রোজাকে পড়াশোনা শিখিয়ে মানুষ করবেন। স্বামীর রোজগার কম। কিন্তু মানুষের ঘরে কাজ করে হলেও রোজার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু হলো না।

মা হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে রোজা নতুন একটা মা পেয়েছে। নতুন মা প্রথমে ওকে খুব আদর করত। নিজের হাতে খাইয়ে দিত। মাথার চুল আঁচড়ে দিত। ওর বাবার সামনে ওকে নিয়ে মেতে থাকত। রোজার মুখে হাসি দেখে তখন বাবার মন ভরে যেত। তিনি আনমনে ভাবতেন মা-মরা মেয়ে আমার মা পেয়েছে। ওর নতুন মা ওকে কত আদর-যত্ন করে!

রোজার বাবা একজন দিনমজুর। সারাদিন বাইরে কাজ করেন। যখন ঘরে ফেরেন তখন বাবা নিজ হাতে ওকে খাইয়ে দেন। দিনের শেষে বাবা যখন বালিশে মাথা রাখেন তখন রোজা আস্তে করে বাবার বুকের ভেতর লুকিয়ে যায়। আর অমনি বাবার জাদুর পরশে রোজার চোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসে।

এক বছর শেষ হতে না হতেই রোজার নতুন মায়ের আচরণে পরিবর্তন আসে। রোজাকে স্কুলে ভর্তি করানোর কথা বলতেই রোজার বাবার মুখের ওপর তিনি বলে বসেন, মেয়ে মানুষ! পড়াশোনা করিয়ে শুধু শুধু টাকা খরচ করার কী দরকার? একটু বড় হলে পরের ঘরে চলে যাবে।

‘তাই বলে রোজার পড়াশোনা হবে না!’

‘আরে স্কুলে এত এত বেতন দিয়ে কী লাভ! তার চেয়ে তুমি বাসায় কিছু চক আর একটা শ্লেট নিয়ে এসো। আমি ওকে বর্ণমালা শিখিয়ে দেব।’

রোজার নতুন মায়ের কথায় সোহেল মিয়ার আর বোঝার কিছু বাকি থাকে না। স্ত্রীর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে সোহেল মিয়া নরম গলায় বললেন, ‘ঠিক আছে, তুমি যেভাবে বলবে সেভাবেই সব চলবে।’ স্বামীর মুখের কথা শুনে রোজার নতুন মায়ের চোখেমুখে আনন্দের ছাপ স্পষ্ট দেখা যায়। সেদিন থেকে বাড়ির কাজকর্ম করাই রোজার বিধিলিপি হয়ে দাঁড়াল।

একদিন সকালে রোজা তার নতুন মায়ের পাশে রান্নাঘরের চুলার কাছে বসে আছে। শুকনো কাঠ আর পাতা দিয়ে জ¦লছে চুলা। নতুন মা ওর দিকে চেঁচিয়ে বললেন, ‘কীরে, আর কত বসে থাকবি? এবার যা। শুকনো পাতা কুড়িয়ে নিয়ে আয়। পাতা আনতে না পারলে দুপুরের খাবার পাবি না।’

নতুন মায়ের কথায় রোজা মন খারাপ করে বেরিয়ে যায়। এরপর পাতা কুড়ানোর জন্য প্লাস্টিকের থলেটা কাঁধে নিয়ে বনের দিকে যায় সে। এ বনে অনেক গাছ। এক-দুইটা করে পাতা ঝরলেও সে অনেক পাতা পাওয়ার কথা। কিন্তু অনেক পাতা তো দূরের কথা! আজ এক-দুইটাও তো দেখা যাচ্ছে না! তবে কি কেউ আগে এসে সব পাতা নিয়ে গেছে! এখন কী হবে? খালি হাতে ঘরে ফিরে গেলে মা মারবেন, খেতেও দেবেন না এসব ভাবতে ভাবতে রোজা কেঁদে ফেলে।

একাকী একটি ছোট মেয়েকে বনের মধ্যে কাঁদতে দেখে গাছের পাতাদের খুব মায়া হলো। এরপর পাতাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে বয়স্ক পাতাটি রোজাকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করল, ‘এই রোজা, তুমি এভাবে একাকী কাঁদছ কেন? তোমাকে কি কেউ বকেছে?’

গাছের পাতার মুখে কথা শুনে রোজা থ বনে যায়। সে চারদিকে ভালোভাবে লক্ষ্য করে। কিন্তু কোথাও কাউকে না দেখে আবার গাছের পাতাদের দিকে লক্ষ্য করে। বয়স্ক পাতাটি আবার বলে উঠল, রোজা, তুমি কোনো চিন্তা করো না। আমরা তোমার সঙ্গে আছি। এখন বলো আজ তোমার কী হয়েছে? প্রতিদিন হাসিখুশি থাকো। আজ কান্না করছ কেন?

রোজা কাঁদো গলায় বলল, ‘আমার মা নেই। নতুন মা বলেছেন শুকনো পাতা কুড়িয়ে নিতে। কিন্তু আজ কোনো শুকনো পাতা পাচ্ছি না। এখন আমি কী নিয়ে মায়ের কাছে যাব? আসার সময় নতুন মা বলেছেন, আজ যদি পাতা নিয়ে না যাই, তবে আমার নাকি বিপদ হবে। আমায় দুপুরের খাবারও দেবেন না।’

এ কথা বলে রোজা কেঁদে ওঠে।

ছোট্ট রোজার দুঃখের কথা শুনে পাতাদের মুখও এক মুহূর্তে ভার হয়ে গেল। বয়স্ক পাতাটি রোজাকে বলল, ‘তোমার দুঃখে আমরা সবাই খুব ব্যথিত হয়েছি। আজ কয়েকদিন ধরে খুব শীত পড়ছে। সঙ্গে কুয়াশাও। সূর্যও উঠছে খুব বেলা করে। সে জন্য পাতারা দ্রুত শুকোয়নি। তাই শুকনো পাতা নেই। কিন্তু তোমার উপকার হবে এমন একটা বুদ্ধি আছে।’

রোজাসহ সব পাতা একসঙ্গে জিজ্ঞেস করল, ‘কী বুদ্ধি?’

বয়স্ক পাতাটি পত পত করে বলতে লাগল, ‘রোজা আমাদের ছোটগাছ থেকে ছোট ছোট পাতাযুক্ত ডাল ছিঁড়ে ওর নতুন মায়ের কাছে নিয়ে যাবে।’

অন্য পাতারা বলল, ‘এতে কী রোজার সমস্যার সমাধান হবে?’

‘হ্যাঁ, হবে।’

‘কীভাবে?’

‘রোজা গিয়ে ওর নতুন মাকে বলবে, আজ বনে কোনো শুকনো পাতা পাওয়া যায়নি। তাই গাছের কাঁচা পাতা নিয়ে এসেছে সে। খালি হাতে তো ফেরেনি।’

‘তোমার কথায় যুক্তি আছে।’

এরপর সবার অনুরোধে রোজা ছোটগাছের পাতাযুক্ত বেশ কিছু ডাল ছিঁড়ে নিল।

দূর থেকে মায়ের ডাক শুনে রোজা পাতাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘরের দিকে ফিরে আসে।

রোজার হাতে কাঁচা পাতার ডাল দেখে আকলিমা বেগম তেড়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এতক্ষণ ধরে কোথায় ছিলি?’

‘মা, আমি ওই বনে পাতা খুঁজেছি। কিন্তু আজ কোনো শুকনো পাতা পাইনি। তাই এগুলো নিয়ে এসেছি।’

রোজার মুখের কথা শেষ হতে না হতেই নতুন মা বললেন, ‘একটু পাতা কুড়িয়ে আনতে বলেছি। তাও পারে না। আমার জন্য কাঁচা পাতা নিয়ে এসেছে। আমার লাগবে না পাতা। কাঁচা পাতা না, ছাই।’

এ কথা বলে নতুন মা ঘরের ভেতরে চলে গেলেন। রোজা পাতাযুক্ত ডালগুলোর দিকে তাকিয়ে কাঁদতে লাগল। রোজার হাতে থাকা একটি পাতা হঠাৎ বলে উঠল, ‘কেঁদো না, রোজা। আমরা তোমার সঙ্গে আছি।’

রোজা বিস্মিত হয়ে বলল, ‘তোমরা আমার সঙ্গে থাকলে কী হবে? তোমরা তো কাঁচা পাতা।’

‘আরে কাঁচা হয়েছি তো কী হয়েছে! আমরা শুকনো পাতা হয়ে যাব।’

‘কীভাবে?’

‘ওই দেখো আকাশের পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠছে। তুমি এক কাজ করো, আমাদের সবাইকে সূর্যের আলোর দিকে মুখ করে রেখে দাও। আমরা দুপুরের প্রখর তাপে শুকিয়ে শুকনো পাতা হয়ে যাব।’

‘তাতে তোমরা তো কষ্ট পাবে।’

‘আমরা কষ্ট পেলে কিচ্ছু হবে না। অন্তত তোমার নতুন মায়ের হাত থেকে আগামীকাল তো বাঁচতে পারবে। আর কথা বাড়িও না, রোজা। আমাদের রোদের দিকে রেখে দাও।’

রোজা হাতের পাতাযুক্ত ডালগুলো রোদের দিকে মুখ করে রেখে দিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত