দামের ফাঁদ আমদানিকারকদের হাতে

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৩, ০৬:২৪ এএম

অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার। কোনো কোনো পণ্যের দর রেকর্ড গড়েছে; বিশেষ করে আমদানিনির্ভর অনেক পণ্যের দাম ছাড়িয়ে যায় অতীতের সব রেকর্ড। গত মাসের শেষের দিকে প্রতি কেজি মরিচের দাম ছাড়িয়ে যায় হাজার টাকা। এর আগে থেকেই পেঁয়াজ, আদার দামেও অস্থিরতা চলছিল। মাঝে বাজার স্বাভাবিক রাখতে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। সে সময় হঠাৎ করেই নেমে আসে পেঁয়াজের দাম। পরে কাঁচা মরিচের ক্ষেত্রেও একই দৃশ্য দেখা যায়। তবে দাম কমার সেই সুফল পাননি ক্রেতারা। কারণ আমদানি শুরু হওয়ার পর বাজারে পণ্যের দর কমলে আমদানিকারকরা আমদানি বন্ধ করে দিচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার তদারকি সংস্থার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের চাহিদা বাড়ান ব্যবসায়ীরা। সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে যথাযথ আমদানি না করে স্বেচ্ছাচারিতা চালান আমদানিকারকরা। ফলে ভোক্তার কোনো লাভ হয় না, বাজারেও খুব একটা প্রভাব পড়ে না। 

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার পণ্য আমদানির অনুমতি দিয়ে থাকে বাজারব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখার জন্য। স্বভাবতই আমদানির অনুমতি নিয়ে ব্যবসায়ী তার লভ্যাংশের কথা চিন্তা করে আমদানি করবেন। কাউকে দিয়ে জোর করে আমদানি করানো ঠিক হবে না। তবে পণ্য আমদানির অনুমতি নিয়ে দাম কমলে আমদানি বন্ধ রাখা অন্যায়। 

তিনি বলেন, বছরে পণ্যের চাহিদা কতটা রয়েছে, এর মধ্যে কৃষক কতটা উৎপাদন করতে পারছেন, কতটা ঘাটতি রয়েছে, সেই ঘাটতি কোন সময়ে শুরু হতে পারে, সে সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ঘাটতি থাকা পণ্য আমদানির অনুমোদন দিতে হবে। এর জন্য সরকারের মাঠপর্যায়ে গবেষণা করা উচিত। গবেষণা না থাকার কারণে কৃষক ও ভোক্তা সব সময় ঠকছেন। মাঝখান থেকে সুবিধা নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের তদারকির জন্য সংশ্লিষ্ট যে সংস্থ্যাগুলো রয়েছে তাদের জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেই। ফলে বাজারব্যবস্থা নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ১৫৫টি আমদানি অনুমতির বিপরীতে ৫৩ হাজার ৮০ মেট্রিকটন কাঁচা মরিচ আমদানির অনুমতি দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। বিপরীতে মাত্র ১ হাজার ৪২ টন মরিচ আমদানি করেছেন আমদানিকারকরা। একইভাবে পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ৮৬১টি আমদানি অনুমতির বিপরীতে ৯ লাখ ৪৫ হাজার ১৭৩ মেট্রিকটন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আমদানি অনুমতির পরিপ্রেক্ষিতে মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৭৩ মেট্রিকটন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের পরিচালক ড. মো. রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোগ্যপণ্যের বাজার স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীদের পণ্য আমদানির জন্য আমরা আমদানিন অনুমোদন দিচ্ছি। দেখা যাচ্ছে কোনো অজানা কারণে আমদানির অনুমোদনের বিপরীতে খুবই কম আমদানি হচ্ছে। আইপি নিয়ে ব্যবসায়ীরা কেন পণ্য আমদানি করছেন তা ক্ষতিয়ে দেখার জন্য আমাদের এখতিয়ার নেই। যদি সেই অনুমোদন থাকত নিশ্চয়ই আমরা তা ক্ষতিয়ে দেখতাম। বাজারে পণ্যের দাম কমলে কেন ব্যবসায়ীরা আমদানি কমিয়ে বা বন্ধ করে দিচ্ছেন। তবে বাজার সমন্বয় করার জন্য আমাদের আলাদা বিভাগ রয়েছে। এ বিষয়ে তারা ভালো বলতে পারবেন।’

অবশ্য আনোয়ার হোসেন নামের এক আমদানিকারক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার ভারতের স্থানীয় বাজারে কাঁচা মরিচের দাম একটু বেশি। কাঁচা মরিচের তুলনায় পেঁয়াজের দাম অনেক কম। প্রতি কেজি মরিচ ১৪৫-১৫০ টাকায় আমদানি করে আমরা বিক্রি করি ১৭০ টাকায়। এর মধ্যে ২০ টন মরিচ আনলে পথেই ২-৩ টন নষ্ট হয়ে যায়। যার কারণে আমরা ১৫০ টাকার মরিচ ১৭০ টাকায় বিক্রি করি। এ ছাড়া আমদানি করা প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করছি ২১-২২ টাকায়। তবে এই দুটি পণ্য খুচরা বাজারে ডাবল দামে বিক্রি হচ্ছে কেন সেই বিষয়ে আমাদের ধারণা নেই। সম্ভবত খুচরা ব্যবসায়ীরাই দাম বাড়িয়ে বিক্রি করেন।’ এই ব্যবসায়ী অবশ্য দাম কমার পর আমদানি কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। 

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বাজার সংযোগ সহকারী পরিচালক প্রণব কুমার সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা পাইকারি মূল্যের ওপর যৌক্তিক মূল্য প্রদর্শন করে থাকি। সেই অনুযায়ী যেন বাজারে পণ্য বিক্রি হয় আমরা তার জন্য বাজারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে থাকি। বছরজুড়ে আমরা মাঠপর্যায়ে ভোক্তা অধিকারসহ আমাদের জেলা শহরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হয়।’

তিনি বলেন, ‘যেকোনো কৃষিপণ্য আমদানি বিন্যাস বছরজুড়ে থাকে। এটি এমন নয় যে তারা সব পণ্য একবারে আমদানি করবেন। তবে যেসব ব্যবসায়ী আইপি অনুমোদন নিয়ে পণ্য আমদানি করছেন না, তাদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করেছি। বাজারে যেসব ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন তাদের বিষয় আমরা খুবই সতর্ক রয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাবে অধিদপ্তর।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত