বিভেদেও ‘ইন্ডিয়ার’ তালে তৃণমূল

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৩, ১০:৪৩ পিএম

ভারতে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) রুখে দিতে ২৬টি সমমনা দলের জোট ‘ইন্ডিয়া’ গঠিত হয়েছে। বিরোধীদের এ জোট গঠনে পাটনা, বেঙ্গালুরু বৈঠকগুলোতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। জোট গঠনের পর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর পর বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সবচেয়ে সোচ্চার কণ্ঠটি ছিল মমতার। এরপর গতকাল শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার ধর্মতলায় তৃণমূলের শহীদ দিবসের জনসভাতেও মমতা ইন্ডিয়া জোটের পক্ষে জোর আওয়াজ তোলেন। পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম আজকালের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সভায় ইন্ডিয়া জোটে তৃণমূলের অবস্থান স্পষ্ট করতে মমতা বলেন, ‘আমরা চেয়ার চাই না। দেশকে রক্ষা করতে চাই।’ সেইসঙ্গে জানিয়ে দিলেন, আগামী দিনে ভারতে বিজেপির বিরুদ্ধে সব লড়াই ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স বা ‘ইন্ডিয়া’র ব্যানারে হবে। জোটের জন্য কর্মীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে তিনি বলেন, ‘জয় বাংলা স্লোগানের সঙ্গে জয় ইন্ডিয়া স্লোগানও সব জায়গায় বলতে হবে।’

সংবাদমাধ্যমটি বলছে, লক্ষণীয়ভাবে এদিন তিনি সদ্যসমাপ্ত পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে রাজ্যে তৃণমূলের চিরবৈরী সিপিএমকে আক্রমণ করলেও কংগ্রেস প্রসঙ্গে একেবারেই নীরব ছিলেন।

ইন্ডিয়া জোট গঠনের পর তৃণমূলের রাজ্য রাজনীতি এবং কেন্দ্র থেকে বিজেপিকে হটানোর আকাক্সক্ষা নিয়ে বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি এবং ডয়েচে ভেলে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম দুটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া সিপিআইএম বা সিপিএম এবং কংগ্রেসের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের বাস্তবতা তুলে ধরেছে। অন্যদিকে আবার নবগঠিত জোটে এই তিন দলের পাশাপাশি থাকার বিষয়টিকেও সামনে এনেছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে শিরোনামই করা হয়েছে, “বিজেপি-বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট পশ্চিমবঙ্গে যে কারণে কাজ করবে না।” এ প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজেপি-বিরোধী দলগুলো ‘ইন্ডিয়া’ নাম দিয়ে যে জোটের ঘোষণা দিয়েছে, তা পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়িত করা সম্ভব নয় বলেই জোটের দুই অংশগ্রহণকারী দল জানিয়েছে। রাজ্যের বাস্তবতা মেনেই সেখানে এই জোট গড়া সম্ভব হবে না বলে তারা মনে করছে।

বিবিসি বলছে, পাটনা আর বেঙ্গালুরুতে বিজেপি-বিরোধী দলগুলোর যে দুটি জোট বৈঠক হয়েছে, সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখা গেছে সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী আর কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলতে। আবার সেই বৈঠক দুটিতেই হাজির ছিলেন সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিও। ওই বৈঠকগুলোতে ঘনিষ্ঠতার ছবি উঠে এলেও রাজ্য রাজনীতির বাস্তব অবস্থাটা একেবারেই বিপরীত। রাজ্যে সম্প্রতি যে পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়ে গেল, তার আগে-পরে

তৃণমূল কংগ্রেস আর বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোটের মধ্যে তীব্র এবং রক্তাক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। ওই ভোট প্রক্রিয়ার মধ্যে ৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। মৃতদের মধ্যে সব দলের কর্মী-সমর্থকরাই আছেন।

সিপিআই (এম) নেতা শতরূপ ঘোষ বিবিসিকে বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে যাদের একসঙ্গে থাকার কথা, তারা তো জোটবদ্ধ আগে থেকেই রয়েছে। কংগ্রেস, বাম আর আইএসএফের জোট তো আছেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো এই জোটের অংশ নন, তিনি এই জোটে কখনই থাকতে পারবেনও না।’ 

এছাড়া জাতীয় স্তরে মমতার সঙ্গে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠতা দেখা গেলেও রাজ্যে দুটি দল চরম বিরোধী অবস্থানে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতা কৌস্তভ বাগচী বিবিসিকে বলেন, ‘পাটনা বা বেঙ্গালুরুতে যা হচ্ছে, তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের কোনো সম্পর্ক নেই। যেভাবে তৃণমূল কংগ্রেস আমাদের কর্মীদের ওপরে অত্যাচার করেছে, দল ভেঙেছে, বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তারপরে ওই দলের সঙ্গে কোনো কংগ্রেস কর্মীর সম্পর্ক রাখার প্রশ্নই নেই, জোট তো দূরের কথা।’

দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে বিরোধিতা তুলে ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম মুখপাত্র অধ্যাপক মনোজিত মণ্ডল বিবিসিকে বলেন, ‘আমাদের দলের জন্মই হয়েছিল সিপিআইএমের কুশাসন আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষকে বাঁচানোর লক্ষ্য নিয়ে। অন্যদিকে কংগ্রেসও কিছু নেই এখানে, প্রায় ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।

তৃণমূল কংগ্রেস তো কংগ্রেসের ওপরে নির্ভর করে চলে না এ রাজ্যে। ওই দুটো দলের নেতাদের বক্তব্য বা তাদের কাজকর্মে তো দেখাই যাচ্ছে যে তারা বিজেপিকেই সুবিধা করে দিচ্ছে।’ 

এটা সত্য যে, তৃণমূল, সিপিএম এবং কংগ্রেসের দ্বন্দ্বে পশ্চিমবঙ্গে ক্রমে শক্তিশালী হয়েছে বিজেপি।  ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে দেখা গিয়েছিল যে তৃণমূল কংগ্রেসের ওপরে বিদ্বেষ থেকে কংগ্রেস আর বামফ্রন্ট সমর্থকদের একটা বড় অংশ, যারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী, তারা বিজেপিকে সমর্থন দিয়েছিলেন। বাম ভোটারদের বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়ার সেই প্রবণতাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘বামের ভোট রামে’ বলে অভিহিত করতেন। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের পর থেকে রাজ্যে যতগুলো নির্বাচন, উপনির্বাচন হয়েছে, তাতে দেখা গেছে শতাংশের হিসাবে বিজেপির প্রাপ্ত ভোট কমেছে আর বাম-কংগ্রেস জোটে প্রায় ততটাই ভোট বেড়েছে। এই প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষকরা ব্যাখ্যা করেন ‘রামের ভোট বামে ফিরছে’ বলে। 

পশ্চিমবঙ্গে এই তিন দলের এরকম পরস্পরবিরোধী অবস্থানের পরও কীভাবে বিজেপি বিরোধী জোট হলো এমন প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক। তবে বৃহত্তর স্বার্থে রাজ্যের কোন্দলের হিসাব-নিকাশ কেন্দ্রের রাজনীতির চেয়ে ভিন্ন  বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিবিসিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জী বলেন, ‘জাতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী যে জোট হয়েছে, তাদের কথা শুনে বোঝা যাচ্ছে যে তারা সবাই একটা বিষয়ে একমত যে বিজেপিকে তারা হারাতে চায়। আবার পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতা যা, তাতে

তৃণমূল কংগ্রেস, জাতীয় কংগ্রেস আর বামফ্রন্ট এক জায়গায় আসা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে তারা যদি একে অপরের বিরুদ্ধে ভোটে লড়ে আর তারপরে জাতীয় স্তরে যদি তৃণমূল কংগ্রেস, জাতীয় কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোটের সব আসনগুলো যদি এক জায়গায় আসে, অর্থাৎ ইন্ডিয়া জোটের পক্ষে দাঁড়ায় তাহলে তো সেই বিজেপি-বিরোধী অবস্থানকেই মজবুত করা হবে।’

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলে বাংলার এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনেও বলা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও কেন্দ্রে বিজেপির বিরুদ্ধে তিন দলের ঐকমত্যের কথা। পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম, কংগ্রেস নেতাদের

তৃণমূল-বিরোধী এমন মন্তব্যের আগে বেঙ্গালুরুতে তৃণমূল নেত্রীর উপস্থিতিকে কটাক্ষ করে নরেন্দ্র মোদি পঞ্চায়েত সহিংসতা টেনে এনেছিলেন। মোদি বলেছিলেন, ‘বাম ও কংগ্রেস কর্মীরা আক্রান্ত হলেও দলের নেতৃত্ব নীরব রয়েছেন। তারাই কর্মীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।’ পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সভাপতি শুভেন্দু অধিকারীও জোটকে কটাক্ষ করতে রাজ্যের রাজনীতি টেনে বলেছেন, ‘দিল্লিতে দোস্তি, বাংলায় কুস্তি’।

বিজেপির এই প্রচার যাতে কর্মীদের প্রভাবিত করতে না পারে, তা নিয়ে সতর্ক এ রাজ্যের বাম ও কংগ্রেস নেতৃত্ব। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বলেন, ‘বেঙ্গালুরুতে যা হচ্ছে, তার সঙ্গে বাংলার রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। কংগ্রেস নেতৃত্ব বলেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে জয়ধ্বনি করতে। বিজেপিকে এত চিন্তা করতে হবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত