লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূলবর্তী সিরিয়া ও হেজাজের সীমান্তবর্তী জনপদ মাদায়েন, যা বর্তমানে পূর্ব জর্দানের সামুদ্রিক বন্দর ‘মোআন’-এর অদূরে অবস্থিত। সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাবুক থেকে মাদায়েনের দূরত্ব ১৭০ কিলোমিটার। এক সময় এই শহরে বহু মানুষের বসবাস ছিল, কিন্তু শহরের মানুষ ছিল খ্বু খারাপ ও অত্যাচারী। তাদের প্রধান অপরাধ ছিল ওজনে কম দেওয়া, তারা জিনিসের পূর্ণ মূল্য আদায় করত কিন্তু ওজনে কম দিত। তাছাড়া মাদায়েন জাতির আরও বহু অপরাধ ছিল, তারা জাল নোট তৈরি করে সমস্যা সৃষ্টি করত, চুরি ডাকাতি ও লুটপাট করত।
মাদায়েন জাতির হেদায়েতের জন্য আল্লাহতায়ালা একজন নবী পাঠান, তিনি হজরত শোয়াইব আলাইহিস সালাম। হজরত শোয়াইব (আ.)-এর ভাষা ছিল খুব সুন্দর, তিনি বহু ভাষা জানতেন, তার কণ্ঠ ছিল উচ্চ আওয়াজ বিশিষ্ট। মাদায়েন জাতির মধ্যে হজরত শোয়াইব (আ.) আল্লাহর বাণী প্রচার করতে থাকেন। তাদের বিভিন্ন অপরাধে লিপ্ত দেখে সদুপদেশ দেওয়ার পাশাপাশি সতর্ক করতে থাকেন। হজরত শোয়াইব (আ.) বললেন, তোমরা জিনিসের যে পরিমাণ মূল্য আদায় করো সেই পরিমাণ জিনিস দেবে, তোমরা যদি ওজনে কম দাও তাহলে তোমাদের ওপর আল্লাহর গজব আসবে। উপদেশ শুনে কিছু লোক আল্লাহর প্রতি ইমান আনে, বাকিরা নিজ নিজ কর্মে অটল থাকে।
কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা মাপে পূর্ণমাত্রায় দেবে, যারা মাপে কম করে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না এবং তোমরা ওজন করবে সঠিক দাঁড়িপাল্লায়। লোকদের তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দেবে না এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। তোমরা ভয় করো আল্লাহকে, যিনি তোমাদের এবং তোমাদের আগে যারা গত হয়েছেন তাদের সৃষ্টি করেছেন।’ -সুরা আশ শুআরা : ১৮১-১৮৪
হজরত শোয়াইব (আ.)-এর উপদেশ তারা কোনোভাবেই শুনতে চায় না ও মানতে চায় না, তারা উল্টো বলে, হে শোয়াইব! তোমার কথা কেন আমরা শুনব, তুমি আমাদের রাজা-বাদশা নাকি। তখন অবাধ্য মাদায়েন জাতিকে হজরত শোয়াইব (আ.) বলেন, ‘নুহ (আ:)-এর জাতি, কওমে লুত, আদ ও সামুদ জাতির ঘটনাগুলো তোমরা স্মরণ করো। অন্যায় অপরাধ করার কারণে আল্লাহ তাদের ভয়াবহ গজব দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিল। তোমরা যত অন্যায় অপরাধ করেছ এখনো সময় আছে তোমরা তওবা করে আল্লাহর প্রতি ইমান এনে খাঁটি ধর্ম গ্রহণ করো। হজরত শোয়াইব (আ.)-এর কথা শুনে তারা তাকে ভয় দেখিয়ে বলতে লাগল, তোমাকে বারবার নিষেধ করেছি, এ ধরনের বাজে কথা আমাদের কাছে বলতে আসবে না, কিন্তু তুমি কিছুতেই বিরত হচ্ছো না আবার তোমাকে সাবধান করে দিলাম, এমন কথা বললে তোমার অকালে মৃত্যু হতে পারে। তাদের এ ধরনের কথা শুনে হজরত শোয়াইব (আ.) নিরাশ হয়ে পড়েন। এমন সময় ফেরেশতা হজরত জিবরাইল (আ.) তাশরিফ এনে বললেন, হে আল্লাহর নবী! আপনার অবাধ্য কওমের প্রতি আল্লাহতায়ালা অচিরেই গজব নাজিল করবেন। আপনি আপনার অনুসারী ও মুমিন লোকজনদের নিয়ে এদেশ থেকে অন্য দেশে চলে যান। যেহেতু সময় অল্প। হজরত জিবরাইল (আ.)-এর পরামর্শ শুনে হজরত শোয়াইব (আ.) তার পরিবার ও এক হাজার সাতশ মুমিন বান্দা নিয়ে দেশত্যাগ করেন। মাদায়েন জাতিরা নবীকে বললেন, তোমরা আমাদের ভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছো? জবাবে হজরত শোয়াইব (আ.) বললেন, আমরা পালাচ্ছি না বরং আল্লাহর নির্দেশে দেশত্যাগ করছি। কেননা এদেশে আল্লাহর গজব আসবে। এ কথা শুনে তারা হাসাহাসি ও বলাবলি করতে লাগল, দেখো! সে এখনো আমাদের ফাঁকা গজবের ভয় দেখাচ্ছে! হজরত শোয়াইব (আ.) তাদের কথার কোনো জবাব না দিয়ে সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে চলে যান মাদায়েন থেকে অনেক দূরের এক দেশে।
হজরত শোয়াইব (আ.) যেদিন দেশত্যাগ করলেন, ওই দিন শেষে রাত কেটে যাওয়ার পর ভোরে আল্লাহর গজব শুরু হয়। দোজখ থেকে আগুনের কিছু উত্তাপ ফেরেশতারা মাদায়েন শহরের ওপরে পৌঁছে দেন। তাতে সারা দেশ আগুনের মতো উষ্ণ হয়ে ওঠে। ঘরবাড়ি, পথঘাট সবকিছু আগুনের উত্তাপে মানুষ দাঁড়ানোর অযোগ্য হয়ে যায়। লোকজন ঘরে টিকতে না পেরে দৌড়ে মাঠে গেল। তখন আসমান থেকে আগুন বৃষ্টি শুরু হয়, এমন অবস্থায় হজরত জিবরাইল (আ.) এসে এত জোরে হাঁক দেন যে, ওই হাঁকের গর্জনে লোকজন কেঁপে উঠে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়।
বর্তমান সময়েও মানুষ নানা ধরনের অবৈধ ও হারাম ব্যবসা করছে। ব্যবসায়ীরা ওজনে কম দেওয়াসহ নানাভাবে ঠকাচ্ছে ক্রেতাদের। সিন্ডিকেট করে মূল্যবৃদ্ধি ও নকল মাল বিক্রি করছে নানা পন্থায়। এর সবগুলো কাজই অবৈধ ও অন্যায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মন্দ পরিণাম তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে। এবং যখন তাদের জন্য মেপে অথবা ওজন করে দেয় তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে। সেই মহান দিনে। যে দিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ জগৎসমূহের রবের সম্মুখে।’ -সুরা মুতাফফিফিন : ১-৬
